‘ব্ল– হোয়েল’ গেম নয় বিষণ্নতা থেকে স্বর্ণার আত্মহনন!

রাজধানীর ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডে অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার আত্মহনন ইন্টারনেট ভিত্তিক সুইসাইড গেম ‘ব্ল– হোয়েল’ এর কারণে নয়! ওই কিশোরীর শরীরে তেমন কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক কোনো কারণে মেয়েটি হয়তো বিষণœতায় ভুগতো। আর সে কারণে মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে- এমনটিই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। অযথা এখানে ব্ল– হোয়েলের ‘গুজব’ ছড়িয়ে সারাদেশে তরুণ-তরুণীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।

ওই কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে স্কুলছাত্রী স্বর্ণা তার মায়ের যে এনড্রয়েড মোবাইলটি ব্যবহার করতো তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। এ জন্য ওই মোবাইলটি মেয়েটির বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধনের কাছে চাওয়া হয়েছে। তিনি যদি সেটি দেন, তাহলে শিগগিরই তা পরীক্ষা করা হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে বা সন্দেহ করা হয়েছে- ব্ল– হোয়েল গেমের কারণে ওই ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে এবং সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তাই মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখবে পুলিশ। যদিও মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। উল্টো কোনো অভিযোগ নেই মর্মে পুলিশের কাছে লিখিত দিয়েছেন মেয়েটির বাবা ও মা।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের ৪৪ নম্বর অ্যপার্টমেন্টের ৫বি ফ্ল্যাটের বাসা থেকে ১৩ বছর বয়সী কিশোরী স্বর্ণার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফার্মগেটে অবস্থিত হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল স্বর্ণা। মৃত্যুর আগে সে সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর সুইসাইড গেম ‘ব্লু হোয়েল’-এ আসক্ত ছিল মেয়েটির বাবাসহ অনেকের মনে সন্দেহের দানা বাধতে শুরু করে।

বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমরা মনে করছি, সেন্টাল রোডে অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার আত্মহত্যার পেছনে ব্ল– হোয়েল গেম দায়ী নয়। কারণ অনলাইনভিত্তিক এই সুইসাইড গেমটি খেলার তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ধাপে- ব্লেড দিয়ে শরীরে নীল তিমি এঁকে গেমটির অ্যাডমিনের কাছে ছবি পাঠাতে বলা হয়। পরবর্তী সময়ে আরো কিছু চ্যালেঞ্জিং নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু স্বর্ণার মৃতদেহে এমন কোনো দাগ কিংবা আলামত পাওয়া যায়নি।

তারা আরো বলেন, এ ছাড়া ব্ল– হোয়েল গেমে একা একা ছাদের কিনারায় ঘুরতে ও ভূতের ছবি দেখতে নির্দেশনা দেয়া হয়। পরিবারটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে স্বর্ণার ক্ষেত্রে এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, তাছাড়া মেয়েটি সব সময় মোবাইল চালাতো না। কারণ তার নিজের কোনো মোবাইল ছিল না। মাঝে মাঝে সে তার মায়ের ব্যবহৃত একটি এনড্রয়েড মোবাইল চালাতো।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, স্বর্ণার আত্মহত্যার পর ওই বাড়িতে ছুটে যাওয়া লোকজনের মধ্যে কেউ একজন ব্ল– হোয়েল গেমের কথা বলেছিলেন। সেটি শুনে মেয়েটির বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধন প্রথমে এটি সন্দেহ করেছিলেন। মূলত সেখান থেকেই এটি ছড়িয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়। কিন্তু আমাদের ধারণা- এটি নিছক গুজব। এর কোনো ভিত্তি নেই। মেয়েটির বাবা-মাও এখন সেটি বিশ্বাস করেন না।

সংশ্লিষ্ট বলছেন, পরিবারটি স্বচ্ছল ও কিশোরী মেয়েটি অত্যন্ত মেধাবী ছিল। তারপরও কোনো কারণে মেয়েটি বিষণ্নতা কিংবা হতাশায় ভুগছিল। সেখান থেকেই তার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এর পেছনে প্রেম কিংবা বিরহের কারণ ছিল কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জাতীয় ঘটনার পেছনে অনেক সময় এমন কারণও থাকে।

জানতে চাইলে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আলিমুজ্জামান বলেন, কিশোরী স্বর্ণার আত্মহত্যার কারণ নিশ্চিত হতে তার ব্যবহƒত মোবাইল ফোনটি কিংবা অন্য কোনো ডিভাইস থাকলে সেগুলো পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এডিসি নাজমুল হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মেয়েটির পরিবার যদি মোবাইল আমাদের কাছে সরবরাহ করে, তাহলে সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে।
একই বিষয়ে নিউমার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, স্কুলছাত্রী স্বর্ণার পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি। বরং কোনো অভিযোগ নেই মর্মে থানায় লিখিত দিয়েছেন মেয়েটির বাবা-মা। তিনি বলেন, ওই ছাত্রীর নিজের কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। মাঝে মাঝে সে তার মায়ের একটি এনড্রয়েড মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করতো। ঘটনার পর আমরা প্রাথমিকভাবে সেটি পরীক্ষা করে তেমন কিছু পাইনি।

ওসি বলেন, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে আমাদের ধারণা-ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে হতাশা কিংবা বিষণœতা থেকে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। এখানে ব্ল– হোয়েল গেমের বিষয়টি নিসক গুজব বলে এখন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এ গেমের কারণে কেউ আত্মহত্যা করলে তার নানা উপসর্গ থাকার কথা। কিন্তু সেগুলো স্বর্ণার ক্ষেত্রে কোনোটিই পাওয়া যায়নি।

নিহত স্কুলছাত্রী স্বর্ণার বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধন বলেন, আমার মেয়ের মুখে কোনোদিন আমি ব্ল– হোয়েল গেমটির নাম শুনি নাই। কিন্তু মারা যাওয়ার দিন আমি এ সম্পর্কে শুনি। বাসায় ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলে, মনে হয় স্বর্ণা ব্লু হোয়েল গেমসে আসক্ত ছিল।

তিনি বলেন, আমার তো কোনো কিছুর অভাব নেই, যখন যেটা চাচ্ছে তখন সেটাই পাচ্ছিল। আমি তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখি নাই। কেবল লক্ষ করতাম যে রাত জেগে সে ফোন ব্যবহার করতো। আর কিছুদিন থেকে ও শুধু ছাদে যেতে চাইত। সুব্রত বর্ধন আরো বলেন, আমার স্ত্রী সানি বর্ধন একটু পর পর মেয়ের কথা বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তাকে কোনোভাবেই থামিয়ে রাখা বা সান্ত¡না দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার আত্মহত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি। যেহেতু এখানে সুইসাইড গেম ব্ল– হোয়েলের বিষয়টি সন্দেহে এসেছে, তাই ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তবে এর সত্যতা নেই বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.