এবি ব্যাংকের এমডি মসিউর রহমানের দুর্নীতি: ৩

ব্যাগ বিক্রেতার ছেলে কিভাবে কোটিপতি জানেন না এলাকাবাসী

এবি ব্যাংকের এমডি মসিউর রহমান চৌধুরীর একের পর এক ঘুষ ও দুর্নীতির খবর মানবকণ্ঠে প্রকাশিত হওয়ার পর রাজধানীর ব্যাংক পাড়ায় শুরু হয়েছে মুখরোচক আলোচনা। গতকাল বুধবার নরসিংদীর বেলাবো থানার ইব্রাহিমপুর গ্রামে গিয়ে পাওয়া গেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। এলাকাবাসী জানেন না ব্যাগ বিক্রেতার ছেলে মসিউর রহমান চৌধুরী অল্পসময়ে কিভাবে কোটিপতি।

এদিকে মসিউরের দুর্নীতির খবর জানতে পাঠকরা প্রতিদিন চোখ রাখছেন মানবকণ্ঠে। অনেকে বিভিন্ন পত্রিকার স্টলে গিয়ে পত্রিকা না পেয়ে পত্রিকা সংগ্রহ করে ফটোকপি করে পড়ছেন মসিউরের দুর্নীতির খবর। এমনটি জানিয়েছেন এবি ব্যাংকের কয়েক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অতীতে বিভিন্ন সময়ে মসিউরের একক ক্ষমতার হস্তক্ষেপে পদোন্নতি হয়নি অনেকের।

এমন কয়েক কর্মকর্তা মানবকণ্ঠকে জানান, গত দু’দিন এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ রাজধানীর প্রতিটি শাখা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্রাঞ্চগুলোতে এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেক কর্মকর্তা তার দুর্নীতির খবরের বিষয়ে মোবাইল ফোনে কলিগদের কাছ থেকে সরাসরি না জেনে ভাইভার, ইমো ও ফেসবুকে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে সঠিক ঘটনা জানতে চেষ্টা করেন। সবার মধ্যে যেন এক ধরনের গুমোটভাব দেখা গেছে।

অপরদিকে তার অপকর্মের কোনো তথ্য না জানাতে নির্দেশও দেয়া হয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। এজন্য সতর্ক থাকতে কর্মকর্তাদের নির্দেশও দেয়া হচ্ছে মসিউরের পক্ষে। গতকাল বুধবার দুপুরে এমন তথ্য জানিয়েছেন ব্যাংকের কয়েক সিনিয়র কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। আমাদের এমডি মসিউরের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। বেশি পাপ করলে বাপকেও ছাড়ে না, এটাই তার প্রমাণ। অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বড় বড় কোম্পানি ও ব্যক্তি বিশেষকে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে যাদেরকে লোন নিয়ে দিয়েছেন, নির্ধারিত সময় পার হলেও অধিকাংশ কোম্পানি এখন পর্যন্ত শোধ করেনি লোন। এমন তথ্য দিয়েছেন এবি ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা। মসিউরের দুর্নীতির খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে অতীতে ব্যাংকের যেসব পরিচালক ও শীর্ষ কর্মতার সঙ্গে তার মতবিরোধ ছিল তাদের সঙ্গে বিনয়ী ও নম্রভাবে কথা বলছেন আপাতত।

এদিকে নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার নিজ গ্রাম ইব্রাহিমপুরের প্রতিটি চায়ের স্টল আর পাড়া মহল্লার মানুষের মুখে মুখে একটাই প্রশ্ন ব্যাগ বিক্রেতার ছেলে এত টাকা পেলেন কোথায়?

মানবকণ্ঠের অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা গতকাল হাজির হন দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর মসিউরের নিজ গ্রামে। জানা গেছে অনেক অজানা তথ্য। বেরিয়ে এসেছে কিভাবে ছোটকাল থেকে বেড়ে উঠেছেন মসিউর। এলাকাবাসী জানিয়েছেন পিতা আব্দুল হাই চৌধুরী পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য স্বাধীনতার পূর্বেই গ্রাম ছেড়ে চলে যান ঢাকায়। সেখানে গিয়ে রাজধানীর নিউমার্কেটের সামনে ব্যাগ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তার ছোট ছেলে আজ কিভাবে এত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন জানেন না এলাকাবাসী। তারা জানান, ঢাকার ধানমণ্ডির ৭০/৪ জিগাতলায় রয়েছে তার একটি বাড়ি। অভাব অনটনের সংসারে তার রয়েছে দুই ছেলে ও চার মেয়ে। তার বড় ছেলে ডা. মাহাবুবুর রহমান বাংলাদেশ আই হাসপাতালের চেয়ারম্যান। থাকেন ঢাকার ধানমণ্ডি-১/এ, ছোট ছেলে মসিউর রহমান চৌধুরী এবি ব্যাংকের এমডি। চার মেয়ের সবাই বিবাহিত। মেয়ে কানিজ ফাতেমা স্বপরিবারে থাকেন আমেরিকায়।

সরজমিনে গিয়ে আরো জানা যায়, নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামে পঁচাত্তর (৭৫) শতাংশ জমির ওপর মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ৬ তলা বিশিষ্ট সুফিয়া হাই চৌধুরী আদর্শ বিদ্যালয়। একই গ্রামে আঠার (১৮) শতাংশ জমির ওপর পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আব্দুল হাই চৌধুরী চক্ষু হাসপাতাল।

সুফিয়া হাই চৌধুরী আদর্শ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক মো. আবু হানিফা বলেন, এই এলাকার মানুষের জন্যই মসিউর রহমান চৌধুরী মায়ের নামে ৬ তলা বিশিষ্ট সুফিয়া হাই চৌধুরী আদর্শ বিদ্যালয় ও একই গ্রামে পিতার নামে চক্ষু হাসপাতাল। তার বড় ভাই ডা. মাহাবুবুর রহমান এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। স্কুল ভবনটি এখনো নির্মাণাধীন। এবি ব্যাংকের এমডি মসিউর রহমান চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি, স্কুল ও হাসপাতাল দেখাশুনা করেন তার চাচাত ভাই ফজলুর রহমান মিষ্টার। তিনি বলেন, তারা সবাই ফ্ল্যাট বাসা নিয়ে ঢাকায় থাকেন। আমার চাচা আব্দুল হাই চৌধুরী স্বাধীনতার পূর্বেই গ্রাম ছেড়ে চলে যান। চক্ষু হাসপাতালে প্রতিসপ্তাহের শুক্রবার ঢাকা থেকে দু’জন চক্ষু চিকিৎসক এখানে এসে রোগী দেখেন ।

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের বৃদ্ধ সোলেমান মিয়া বলেন, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য এবি ব্যাংকের এমডি মসিউর রহমান চৌধুরীর পিতা আব্দুল হাই চৌধুরী স্বাধীনতার পূর্বেই গ্রাম ছেড়ে চলে যান ঢাকায়। সেখানে গিয়ে ঢাকার নিউমার্কেটের সামনে ব্যাগ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তার ছোট ছেলে এবি ব্যাংকের এমডি মসিউর রহমান চৌধুরী আজ কিভাবে এত কোটি টাকার মালিক আমার জানা নেই। একই গ্রামের আব্দুল হাই সিদ্দিকি বলেন, তার বাবা পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্যই এই গ্রাম ছেড়ে ঢাকা চলে গেছেন। তার ছোট ছেলে কিভাবে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন? বৈধ পথে কি এটা সম্ভব? আজকাল কোটিপতিরা তাদের অবৈধ উপায়ে আয় করা কালো টাকা সাদা করতেই তাদের নিজ গ্রামে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল নির্মাণ করে সমাজসেবী উপাধি লাভ করেন।

মানবকণ্ঠ/এএএম