ব্যাংকিং খাত: সন্তুষ্টি শুধু মুনাফায়

বিশ্বজুড়ে ব্যাংক পরিচালকদের অন্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মতো ভাবা হয় না। কিন্তু বাংলদেশে পরিস্থিতিটা অন্যরকম। পরিচালকরা বরাবরই মালিকের মতো আচরণ করে। প্রভাব বলয় তৈরি করে সমাজের বিভিন্ন অংশে। সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে ব্যাংকের অর্থে, পরিচালকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, হাসপাতালসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাধর্মী উদ্যোগে।

একটি ব্যাংকে থাকা সব পরিচালক সম-মর্যাদায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন, তা নয়। এখানেও আছে গোষ্ঠীতন্ত্র। ফোরামের ভেতরে যেমন কোরাম প্রতিষ্ঠা পায়, ঠিক তেমনই। প্রায় ৬ কোটি গ্রাহকের বিপরীতে এক হাজার পরিচালক ৫৭টি ব্যাংকের অধিনায়ক হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংক মালিকরা এখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। বিভিন্নভাবে চাপ তৈরিতে ব্যাংক পরিচালকদের জুড়ি নেই। সিআরআর কমিয়ে বাজেটের আগেই তারা আদায় করে নেয় সুবিধা। আর বাজেটে তাদের জন্যে রয়েছে কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর ঘোষণা।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সব বিষয়ে সায় দেয়, তা নয়। ব্যাংক লুটেরাদের মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা সর্বজনবিদিত। নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে বাধ্য হয়েছিলে রাজনৈতিক বিবেচনায়- এটা তো অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অমতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া নয়টি ব্যাংক ভাবিয়ে তুলছে নীতি নির্ধারকদের। এসব ব্যাংক আগ্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। অনুমোদন দেয়ার প্রেক্ষাপট থেকে যে বিতর্কের শুরু তা পিছু ছাড়ছে না। নতুন ব্যাংকের মধ্যে দুই-তিনটির অবস্থা খুবই নাজুক; পর্যবেক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ আরো ১৩টি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছিল। তখনো দলীয় বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। এরশাদ আমলে প্রথম বেসরকারি খাতে ব্যাংক দেয়া হয়।

ওই সময়ে ৯টি ব্যাংক এবং এরপর খালেদা জিয়ার প্রথম দফায় দেয়া হয় ৮টি ব্যাংক। দেশে বর্তমানে ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এসব ব্যাংকে বাড়ছে খেলাপিদের আনাগোনা। রাজনৈতিকভাবে এসব ব্যাংক ধরে রাখতে চায় বলে, অর্থবছরের শুরুতেই মূলধন জোগান দেয়া হয়ে থাকে।

অন্য যে কোনো ব্যবসার চেয়ে ব্যাংকিং ব্যবসায় নৈতিকতা বেশি প্রয়োজন। ব্যাংকের দায়িত্ব আইন ও বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে মুনাফা অর্জনও প্রয়োজন। মিল্টন ফ্রিডম্যানের মতে, জালিয়াতি না করে মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসার মুনাফা বাড়াতে সম্পদ নিয়োজিত করা যেতে পারে। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষার আইনে দুর্বলের জন্য বিশেষ সুযোগ নেই। পণ্ডিতদের একটা অংশ মনে করে, নৈতিকতা হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের ভিত্তি।

সি জে কাউটনের মতে, ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব হলো তিনটি। সততার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা; ঋণদানে দায়িত্বশীল থাকা এবং সমমনাদের আদর্শ বাস্তবায়ন করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানেও রয়েছে বিভাজন। সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই শেষ কথা। সরকারি ব্যাংকগুলো তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা নিয়ে তেমন ভাবে না।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা রাজিনৈতিকভাবে এতই শক্তিশালী যে, নিজেদের মতো করে সুবিধা আদায়ে আইনি কাঠামো বা বিধি তৈরি করছে। তাদের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাতেই যোগাযোগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তৃত করছে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে অতিমাত্রার সম্পর্ক নিয়ে এখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এতে অবশ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠছে। ব্যাংক পরিচালকদের স্বার্থ রক্ষায় অভিজাত হোটেল ছুটে যেতে হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে।

এখন ব্যাংকিং খাতে বছরে লেনদেন হয় ৩৭০ কোটি বার। এর মধ্যে অনলাইনে লেনদেন হচ্ছে ২শ’ কোটি বারের বেশি। প্রযুক্তির সাহায্যে একজন ব্যাংকারকে বছরে গড়ে ১০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন করতে হচ্ছে। কিন্তু সে হারে প্রযুক্তি নিরাপত্তায় নেই শক্ত অবস্থান। এক লাখ ৭৩ হাজার ব্যাংক কর্মীর মধ্যে আইটিতে আছে সাড়ে ৪ হাজার। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যাংকিং কার্যক্রমে ৮ থেকে ১০ শতাংশ বিশেষজ্ঞ কর্মী থাকার কথা।

কিন্তু বাংলাদেশে আছে ২ শতাংশের কম। ২০১১ সালে তথ্য প্রযুক্তি নিরাপত্তায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়। ২০১৪ সালে এ খাতে বরাদ্দ বেড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালকরা বরাবরই উদাসীন। ব্যাংক পরিচালকরা মুনাফা পেতে বেশি আগ্রহী। সেবার মান উন্নয়ন, কর্মীর দক্ষতা বাড়ানো, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে বেশ উদাসীন। বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই তারা চায় অধিক মুনাফা। আর এই মুনাফামুখী পরিচালকদের জন্যে বাজেটে দেয়া হলো করের ছাড়।

ব্যাংকিং সেবায় অসন্তুষ্ট গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে। ২০১৪ সালে মোট গ্রাহকের ৮.৬০ শতাংশ অসন্তুষ্ট হয়ে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেয়। ২০১৫ সালে এ ধরনের গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৪২ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৬৪ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৮৮১টি ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়েছে অসন্তুষ্টিজনিত কারণে, যা দেশের মোট ব্যাংক হিসাবের সাড়ে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন গ্রাহক কেন হিসাব বন্ধ করল, তা অনেকক্ষেত্রে জানার আগ্রহ নেই বিভিন্ন ব্যাংকের।

বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব ব্যাংক হিসাবধারীর কোনো রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয় না। অর্থনীতিতে গ্রাহক সন্তুষ্টি সাফল্য অর্জনের অন্যতম নিয়ামক। ব্যাংকিং খাতেও ভালো পণ্যের সঙ্গে ভালো সেবা প্রদান করা জরুরি। কর্মক্ষেত্রের অসন্তুষ্টির ছাপ পড়ছে গ্রাহক সেবায়। গ্রাহকদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেন না অনেকে। একজন ভালো ব্যাংকার অবশ্যই ভালো জনসংযোগ কর্মকর্তা। গ্রাহক চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে। এ বিষয়ে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। গ্রাহকদের মধ্যে ক্যাটাগরি করে পরিকল্পনা করলে সেটি ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে। ব্যাংক অবশ্যই সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে-এমন প্রত্যাশা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

সব ধরনের গ্রাহকই গুরুত্ব পাওয়ার কথা। বাস্তবে তা হয় না। বড় গ্রাহক হলে সমাদর মেলে। আর ঋণ গ্রহীতা হলে তো কথাই না। ঋণ পেতে, তার সঙ্গে খোঁজখবর রাখতে অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা সবসময় এগিয়ে থাকে। সাধারণ আমানতকারীরা সেবা পেতে অনেক সময় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুযোগ করেও ফলাফল মেলে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবরই গ্রাহক স্বার্থ সমুন্নত রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু তা কতটুকু কাজে লাগে, তার আর খবর রাখে না।

ব্যাংকগুলোতে এক বছরে কর্মী কমেছে ৯ হাজার ২০ জন। ২০১৬ সালে দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোতে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ২৬৫ জন। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা কমে ৮১ হাজার ২৪৫ জনে নেমেছে। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের ১০০ টাকার মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে মাত্র ২৫ পয়সা ব্যয় হয়। তা ছাড়া প্রশিক্ষণে বরাদ্দও কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। কর্মীসংখ্যা কমার একটি বড় কারণ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মীর পদত্যাগ। বাকিদের অনেকের চাকরি হারাতে হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, ২০১৬ সালে একটি ব্যাংকের কর্মীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৩১০ জন। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির কর্মীসংখ্যা কমে দুই হাজার ১৪৬-এ নেমেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রকৃত অর্থে কমেনি। কিছু পদ আউটসোর্সিং করে চালানো হচ্ছে। এমন কিছু কর্মীকে বাদ দেয়া হলেও তাদেরই আবার আউটসোর্সিং হিসেবে নেয়া হয়েছে। তাদের বেতনও অনেকাংশে বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকের স্থায়ী কর্মী কমেছে। আউটসোর্সিং এই প্রবণতা অনেক ব্যাংকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থায়ী কর্মীদের বেতন-ভাতা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার এই প্রবণতায় হতাশা বাড়ছে। স্থায়ী কর্মী যেভাবে দরদি ও আন্তরিক হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে কাজ করে, সেভাবে খণ্ডকালীন বা আউটসোর্সিং-এর কর্মীরা তো কাজ করবে না। অতি মুনাফামুখী প্রবণতা থেকে এ ধরনের কাজ করিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া বেড়েই চলছে।

ব্যাংক খাতে নীতিবান নেতৃত্বের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন ব্যাংক কর্মকর্তাদের ৬১ শতাংশ। এ কারণে ব্যাংকে অনিয়ম এবং দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলোর কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়নে ব্যয় ৫০ শতাংশ কমেছে। বিআইবিএম বলছে, এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক তাদের মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো ধরনের ব্যয় করেনি। যেসব ব্যাংক ব্যয় করেছে তাদের ১০০ টাকা পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে মাত্র ২৫ পয়সা কর্মীদের উন্নয়নে ব্যয় করেছে, যা খুবই হতাশাজনক। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালন ব্যয়ের ২ থেকে ৩ শতাংশ খরচ করা হয় এ খাতে। ব্যাংক খাতে চাকরির জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থার প্রবর্তন করলে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। ক্রমেই প্রশ্ন তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ব্যাংকিং কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াও ঝুলে গেল। অর্থমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, এই সরকারের আমলে কমিশন গঠন হবে না। তিনি কাগজপত্র গুছিয়ে গেলেন। পরের সরকারের এ বিষয়ে ভাবতে পারবে। পেশাদারিত্ব আর নৈতিক বোধ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে ব্যাংকিং খাতের উত্তরণ করা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। শুধু মানাফা তাড়িত না হয়ে মানবিক হয়ে উঠুক ব্যাংক পরিচালকরা। – লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এএএম