বৃষ্টি আতঙ্কে রাঙামাটির মানুষ

বৃষ্টি আতঙ্ক বিরাজ করছে রাঙামাটি শহরে। বৃষ্টি হলেই নিরাপদ স্থানে খুঁজছে মানুষ। সোমবার রাঙামাটি শহরে সকাল ১১টার পর পরই শুরু হয় বৃষ্টি। এই বৃষ্টি ছিল কখনও হালকা কখনও ভারী। গত মঙ্গলবার বৃষ্টির পানির স্রোতের সঙ্গে পাহাড় ধস হওয়ায় এখন বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক দেখা দেয় শহর জুড়ে। পুরো রাঙামাটি শহরটি পাহাড়ের উপর হওয়ায় এই আতঙ্ক সবার।

মঙ্গলবারের পাহাড় ধসের ঘটনা ডিসি বাংলো, এসপি বাংলো, সিভিল সার্জন বাংলো, বিএফডিসি কমান্ডার বাংলো, পাসপোর্ট অফিস, টেলিভিশন কেন্দ্র কোনটি বাদ পড়েনি। ধস হয়েছে সমান তালে। তাই এখন বৃষ্টি হলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সোমবার বৃষ্টি শুরু হতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে দেখা গেছে। পানির স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন করতে অনেকে বালু বস্তা দিয়ে পানি নিরাপদ স্থানে ঠেলে দিয়ে নিজের দোকানসহ অন্যান্য স্থাপনা রক্ষা করেছে।

সাধারণ মানুষ বলছে, রাঙামাটির বর্তমান যে অবস্থা তাতে চেয়ে বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটি ধস হচ্ছে চোখের সামনে। তাই নিজেদের প্রচেষ্টায় ক্ষয়রোধ করছেন সবাই।

রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা: পাহাড় ধসের দুর্যোগের পর এবার আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া মানুষের মাঝে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিশুদ্ধ পানি ও সচেতনতার অভাবে এই রোগ ছড়াতে পারে বলছেন চিকিৎসকরা। এই আশঙ্কা রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে খুলেছে চিকিৎসা কেন্দ্র। স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে চিকিৎসা কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রগুলোতে সোমবার রোগীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

জেলা সিভিল সার্জন শহীদ তালুকদার বলেন, আবহাওয়া ঠাণ্ডা হওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ডায়রিয়া আমাশয় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সেসব রোগের কথা মাথায় রেখে পর্যাপ্ত ওষুধ আনা হয়েছে। রোববার রাঙামাটি ১ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ৫০ হাজার খাওয়ার স্যালাইন আনা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ওষুধ আনা হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।

খাদ্য সরবরাহ করছে পুলিশ বিজিবি সেনাবাহিনী: পাহাড় ধসের দুর্যোগের পর জেলা প্রশাসনের খোলা ১৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে খাদ্য সরবরাহ করছে জেলা পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। কেন্দ্র ভিত্তিক দায়িত্ব নিয়ে সকাল বিকেল খাদ্য সরবরাহ করছেন তারা।

রাঙামাটি পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান মানবকণ্ঠকে বলেন, এই দুর্যোগ মোকাবেলা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে যা যা করা প্রয়োজন তা তারা করে যাচ্ছেন। পুলিশ হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসা ক্যাম্প খোলা হয়েছে। এখান থেকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ওষুধ ও চিকিৎসা পাবেন রোগীরা।

আশ্রয় কেন্দ্রের মানবেতর জীবন: সোমবার আশ্রয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে মানবেতর জীবন পার করছেন ক্ষতিগ্রস্থরা। রাঙামাটি সরকারি কলেজের আশ্রয় কেন্দ্রের একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন সকাল ও বিকেল বেলার খাবার ছাড়া তাদের আর কোন সহযোগীতা দেয়া হচ্ছে না। মশারি না থাকায় রাতভর মশার কামড় খেতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া পরিধেয় কাপড়, ঠাণ্ডা থেকে পরিত্রাণ পেতে কম্বল কিছুই দেয়া হয়নি তাদের।

এ ব্যপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক : সোমবার রাঙামাটি শহরে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে। অকটেন সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে কোন কিছুর সংকট নেই জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বাভাবিক হয়নি : রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ সোমবার পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি। দিনভর বৃষ্টি হওয়ায় সড়ক সংস্কারের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। খাগড়াছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা বলেন, মঙ্গলবার বৃষ্টি না হলে ভারী যানবাহন ছাড়া হালকা যানবাহন রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে পারবে। তবে অন্যান্য গুলোতে সময় লাগবে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোর ও সকালে রাঙামাটি জেলা বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে ৪ জন সেনাবাহিনীসহ ১১৫ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে রাঙামাটি শহর এলাকায় মারা যায় ৬৭ জন, কাউখালী উপজেলায় ২৩ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৮ জন, বিলাইছড়ি ৩ জন এবং জুরাছড়ি উপজেলায় মারা গেছে ৪ জন।

মানবকণ্ঠ/এইচসি/এফএইচ