বুচিডংয়ে আবার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পোড়াচ্ছে সেনাবাহিনী

এতে ভয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশমুখী হওয়া শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার মুখে কয়েকদিন বন্ধ রাখার পর আবার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। রাখাইনের বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপে গত তিনদিন আগে আবারো নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে সেনাবাহিনী। এতে রাখাইনের বিভিন্ন শহরে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারাও বাড়িঘর ফেলে বাংলাদেশে চলে আসছে।

নতুন করে নির্যাতনের শিকার প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের ধনখালী চরে অবস্থান করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শাহ্পরীর দ্বীপের জেটি থেকে মিয়ানমারের দিকে তাকালেই দেখা যায় নাফ নদীর ওপারে ধনখালী চরে শত শত রোহিঙ্গাদের তাঁবু। তারা মিয়ানমারের কাঁটাতারের বাইরে চরে অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে অনেকেই নাফ নদী পার হয়ে কুইরখালী সীমান্ত দিয়ে টেকনাফের লম্বাবিলের এলাকায় প্রবেশ করেছে। ধনখালী চরে দু’দিন অবস্থান করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে টেকনাফে প্রবেশ করা সুলতান মিয়া এসব তথ্য জানিয়েছে।

সুলতান মিয়া জানান, তিনি শুক্রবার বিকেলে নাফ নদী পার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে টেকনাফের লম্বাবিল পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তিনি জানান, মিয়ানমারের নাফ নদীঘেঁষা মংডু ও মাঝখানে পাহাড় তার পূর্বে বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ। এ পাশ (টেকনাফ) থেকে বোঝার উপায় নেই সেখানে কি হচ্ছে। পাঁচ দিন পায়ে হেঁটে পাহাড় পেরিয়ে

পৌঁছি মিয়ানমার মংডুর কুইরখালী এলাকায়। আসার পথে দেখা মেলেনি কোনো মানুষ, নিশ্চুপ নির্জন সব গ্রামগুলো। যেন মনে হয় মরুভূমি। ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আছে। রয়েছে শুধু পোড়া গন্ধ। কুইরখালীতে এসে দেখা মেলে হাজারো রোহিঙ্গাদের ঢল, যারা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষা করছে। সেখানে অনুমানিক ২০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। তারা নৌকা না পেয়ে সেখানে কান্নাকাটি করছে। মহিলা ও শিশুদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তারা বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে পুড়ছে। তার বাড়ি মিয়ানমার বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ সিন্ডিপাড়া গ্রামে।

তিনি আরো বলেন, এপারে (বাংলাদেশে) এক মাস আগে আমার এক চাচাত ভাই চলে আসে। তার মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা ভাড়া করি গত শুক্রবার। তারপর এপার থেকে নৌকাটি নাফনদীর ধানখালী চরে গিয়ে পরিবারের ২০ সদস্যসহ ৩০ জনের একটি দল টেকনাফের লম্বাবিল পয়েন্টে শুক্রবার বিকেলে নিয়ে আসে। এরপর টেকনাফে প্রবেশ করি। নৌকা করে চলে আসার সময় সেখানে থাকা রোহিঙ্গারা আমার উপর হুড়াহুড়ি করে বলতে শুরু করে, শিশুরা খুব অসুস্থ; নৌকায় করে নিয়ে যান। সবার একই অবস্থা, কাকে রেখে কাকে আনবো। সুলতান মিয়া টাউনশিপ সিন্ডিপাড়া বাজারে একটি মোবাইল ফোনের দোকান করত। সেনারা তার দোকান লুট করে পুড়িয়ে দিয়েছে।

তার নৌকায় করে আসা দিল বাহার (৩৫) নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, তিনি বুচিডং (বুথেডং) টাউনশিপ পুমালি গ্রামের বাসিন্দা। তিনিসহ ৫ গ্রামের ৭ হাজার রোহিঙ্গা গত সপ্তাহে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্য রওনা দিয়েছিল। পাহাড়, বনজঙ্গ ও খাল-বিল পেরিয়ে ক্ষুধাতৃষ্ণায় তারা কাতর হয়ে পড়েন। গত বুধবার আমরা মিয়ানমারের মংডুর কুইরখালী এলাকায় পৌঁছি। কিন্তু নৌকা না পাওয়ার কারণে এত দিন আসতে পারেনি। গত শুক্রবার একটি নৌকা করে এপারে প্রবেশ করি আট সন্তানকে নিয়ে।

টেকনাফের হোয়াইক্যং পুথিন পাহাড়ের রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে প্রায় পাঁচ হাজার মতো রোহিঙ্গা এই পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, এখনো নাফনদীর ধনখালী চরে ২০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে খোলা মাঠে অবস্থান করছে।

গতকাল শনিবার বিকালে টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা জসিম মাহামুদ জানিয়েছে, শাহপরীর দ্বীপের জেটিতে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের দিকে তাকালে দেখা যায়, নাফ নদীর ওপারে ধনখালী চরে শত শত তাঁবু। কয়েক দিন ধরে এসব তাঁবু দেখা যাচ্ছে। ওখানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে টেকনাফে প্রবেশ করা অনেক রোহিঙ্গার কাছ থেকে জানা গেছে।

মিয়ানমারে রাখাইনে সেনাবাহিনীর সহিংসতার মুখে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জাতিসংঘ হিসাব দিয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

মানবকণ্ঠ/এসএস