বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন ভূ-খণ্ডটি একদিনে কিংবা হঠাৎ করেই গজিয়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ২৪ বছরের লাগাতার প্রচেষ্টা, সঠিক নেতৃত্ব, যথাযথ পরিকল্পনা ও এর সময়োপযোগী প্রয়োগ এবং জাতির হৃদয়ে স্বাধীনতার ক্ষুধা জাগিয়ে তোলার মতো পদক্ষেপগুলো একের পর এক নিতে হয়েছে। আর এর পুরোধায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ডাকেই ৭ কোটি মানুষ একযোগে বাঙালি উঠতে পেরেছিল। যার যার অবস্থান থেকে দেশ রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরেছিল। এমনই একজন অকুতোভয় সৈনিকের নাম মতিউর রহমান।
॥ৎদেশমাতৃকার টানে নিজের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পরিবার-পরিজন কোনো কিছুই তার কাছে বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে তিনি দেশমাতৃকাকে বাঁচাতে ছুটে এসে শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে সর্বোচ্চ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর জš§গ্রহণ করেন। বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ, মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ডিস্টিংকশনসহ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের শুরুতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে ঢাকা আসেন। ২৫ মার্চের কালরাতে মতিউর ছিলেন রায়পুরের রামনগর গ্রামে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সঙ্গে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খুললেন। যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট শুক্রবার ফ্লাইট সিডিউল অনুযায়ী মিনহাজের উড্ডয়নের দিন করাচির মৌরীপুর বিমান ঘাঁটিতে তাঁরই এক ছাত্র রশীদ মিনহাজের কাছ থেকে একটি জঙ্গি বিমান ছিনতাই করেন। কিন্তু রশীদ এ ঘটনা কন্ট্রোল টাওয়ারে জানিয়ে দিলে, অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশীদের সঙ্গে মতিউরের ধস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন এবং রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউরের সঙ্গে প্যারাসুট না থাকায় তিনি প্রাণ হারান। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধা-মাইল দূরে পাওয়া যায়।
– আব্দুল্লাহ আল সিফাত