বিড়ি শিল্প বন্ধের প্রস্তাবে ফুঁসে উঠেছে শ্রমিক ও ভোক্তারা

আগামী দুই বছরের মধ্যে বিড়ি শিল্প বন্ধ করে দেয়া হবে অর্থমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবের পরপরই প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন সারাদেশের বিড়ি শ্রমিক ও বিড়ি ভোক্তারা। দেশজুড়ে চলছে তাদের প্রতিবাদ, গণস্বাক্ষর গ্রহণ ও মানববন্ধনের মতো নানা কর্মসূচি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এসব প্রতিবাদ সমাবেশে বিড়ি শ্রমিক ও ভোক্তারা বলছেন, সিগারেট চালু রেখে কোনও ভাবেই বিড়ি বন্ধ করতে দেয়া হবে না। কারণ বিড়ি শিল্পের সঙ্গে হতদরিদ্র ও নিম্ন শ্রেণীর মানুষ জড়িত। নদী ভাঙ্গা, স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা শ্রমিকরা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এটি বন্ধ করে দেয়া হলে এসব ভাগ্যাগত মানুষের জীবনে চরম দুঃখ দুর্দশা নেমে আসবে।

প্রতিবাদকারীরা বলছেন, ভারতে বিড়ি শিল্পকে কুটির শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে তার সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিড়ি শিল্প বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তারা বলেন, ভারতে প্রতি হাজার বিড়িতে শুল্ক নেয়া হয় ১৪ টাকা বাংলাদেশে ২৫২ টাকা।
তারা বাংলাদেশে বিড়িকে কুটির শিল্প ঘোষণা এবং প্রতি হাজার বিড়িতে ১৪ টাকা শুল্ক নির্ধারণের দাবি জানান।

এদিকে অর্থমন্ত্রী ঘোষণায় গত ৭ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিড়ি শ্রমিকরা মহা সমাবেশ করেছে। সেখানে অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে বলে শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানান।

গত ২৩ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে মহা সমাবেশ করেছেন তামাকচাষী ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, অর্থমন্ত্রী একতরফা ভাবে ব্রিটিশ আমেরিকান কোম্পানির পক্ষ নিয়ে বিড়ি শিল্প বন্ধের পায়তারা করছেন। তিনি বিড়ি বন্ধ করে ব্রিটিশ আমেরিকান কোম্পানিকে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। তার এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আমরা বৃহত্তর রংপুরের তামাক চাষী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বিপদে পড়ে যাবো। কারণ এই অঞ্চলে তামাক হচ্ছে এক মাত্র ফসল। তারা বলেন, কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে লাখ লাখ তামাক চাষী বিপাকে পড়বেন। বিড়ি ও সিগারেট একই সময়ে বন্ধ করার দাবি জানান তামাক চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

সিগারেট চালু রেখে বিড়ি শিল্প বন্ধের ঘোষণায় ময়মনসিংহে প্রতিবাদ সমাবেশে
সিগারেট শিল্প চালু রেখে দুই বছররে মধ্যে বিড়ি শিল্প বন্ধ করা হলে সারাদেশে কঠোর আন্দোলনরে ঘোষণা দিয়েছে ময়মনসিংহের বিড়ি শ্রমিক ও ভোক্তারা। তারা বলনে, বৃটিশ আমেরিকান কোম্পানির পক্ষ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বিড়ি শিল্প বন্ধের পায়তারা করছেন। তা কোনো দিনও মেনে নেয়া হবে না।

গত মঙ্গলবার (২৪ এপ্রিল) সকালে ময়মনসিংহ জিরোপয়েন্টে বিড়ি শিল্প রক্ষায় ভোক্তা ও শ্রমিকদের সমাবেশে ও গণস্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন মালিক কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি কমল বাশার, ভোক্তা পক্ষের সভাপতি জসিম উদ্দিন, সদস্য মো: নাজমুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ, মো: মাহমুদুল করিম, মো: রইস উদ্দনি সিজানুর রহমান।

বিড়ি শিল্প রক্ষায় নেত্রকোনায় মানববন্ধন
ভারতের মতো বাংলাদেশে বিড়ি শিল্পকে কুটির শিল্প ঘোষণা করা এবং বিড়ি শিল্প বন্ধ না করার দাবিতে মানববন্ধন করেছে নেত্রকোনার বিড়ি ভোক্তা ও শ্রমিকরা। এছাড়াও গণ স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার নেত্রকোনা প্রেসক্লাবে এই মানবন্ধন ও গণস্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বক্তারা বলনে, দুই বছরের মধ্যে বিড়ি শিল্প বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আমরা বলতে চাই সিগারেট রেখে কোনো ভাবেই বিড়ি শিল্প বন্ধ করতে দেয়া হবে না। তারা বলনে, ভারতরে মতো বাংলাদেশের প্রতি হাজার বিড়িতে ১৪ টাকা শুল্ক নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়াও বিড়ি সিগারেট একই সময়ে বন্ধ করতে হবে।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ও জেলা রেডক্রিসন্টের সাধারণ সম্পাদক গাজী আজমল হোসনে টুকু। জেলা বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবুল কাশেম, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল গফুর, সহঃসভাপতি সুরুজ আলী ফকরি, সদস্য মোঃ রহমত আলী সহ অন্যান্য নেতারা।

বিড়ি শিল্প বন্ধ করার প্রস্তাবের প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে গণস্বাক্ষর
দুই বছররে মধ্যে বিড়িশিল্প বন্ধ এবং সিগারেট শিল্পকে ২২ বছর সময় দেয়ার প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে এক প্রতিবাদ ও গণস্বাক্ষর গ্রহন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিশোরগঞ্জ পৌর সুপার মার্কেটে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় উপস্থতি ছিলেন কিশোরগঞ্জ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, বিড়ি ভোক্তা পক্ষের মোফাজ্জল, বিড়ি ব্যবসায়ীর পক্ষে রতন মিয়া, শ্রমিকলীগ নেতা – কামরুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ মটর চালক শ্রমিকলীগ ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক ফাইজুল ইসলাম। কিশোরগঞ্জের বিড়ি ভোক্তা পক্ষ, বিড়ি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা এই প্রতিবাদ সভা ও গণস্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বক্তারা বলেন, বিড়ি শিল্প ২ বছররে মধ্যে বা ২০২০ সালে এবং সিগারেট শিল্প ২০ বছররে মধ্যে বা ২০৩৮ সালে বন্ধ করা হবে। এটা একটি বৈষম্যমুলক প্রস্তাব। এতে এই শিল্পের সাথে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বে। তারা বলেন, ভারতে বিড়িকে কুটির শিল্প ঘোষণা করা হয়েছে এবং হাজার প্রতি ট্যাক্স ১৪ টাকা এবং বাংলাদেশ হাজার প্রতি ট্যাক্স ২৫৬ টাকা দিতে হয়। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ১৯২৪ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছে। তাদের নিম্ন স্রাবের সিগারেট ( ডার্বি, হলিউড এবং পাইলট) ৩৫ টাকা বিক্রির কথা থাকলেও ২৭ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বিড়ি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে এক হাজার মানুষ স্বাক্ষর করে।

সিলেটে প্রতিবাদ সমাবেশে, গণস্বাক্ষর অনুষ্ঠান
বিড়ি শিল্প বন্ধ না করা এবং বিড়ি ও সিগারেটের মধ্যে বৈষম্য দূর করার প্রতিবাদে সিলেট অঞ্চলে ব্যবসায়ী ও বিড়ি ভোক্তাদের উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার সিলেট নগরীর ধোপা দিঘির পারে হাফিজ কমপ্লেক্সের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়ন ১৩২৬ এর সাধারণ সম্পাদক ইনছার আলীর সভাপতিত্বে ও রিক্সা শ্রমিক সংঘের সভাপতি শাহজাহান মাস্টারের পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখনে ব্যবসায়ী কামাল আহমদ। ভোক্তা পক্ষের সভাপতি মোঃ জাকির সহ বিপুল সংখ্যক ভোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলনে, বিড়ি শিল্প বন্ধ হবে ২ বছররে মধ্যে তথা সিগারেট বন্ধ হবে ২০ বছররে মধ্যে তাও আবার ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে আলোচনা করে। এই সিদ্ধান্ত চরম বৈষম্যমূলক। ভারত যেখানে বিড়ি শিল্পকে কুটির শিল্প ঘোষণা করেছে ট্যাক্স নিচ্ছে ১৪ টাকা। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের প্রতি হাজার বিড়িতে ট্যাক্স দিতে হয় ২৫৬ টাকা। বক্তারা আরো বলনে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কর্তৃক ১৯শ ২৪ কোটি টাকা কর ফাঁকির পাশাপাশি ৩৫ টাকার মূল্যের সিগারেট ২৭ টাকায় বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী কোন গুরুত্ব না দিয়ে শ্রমঘন বিড়ি শিল্পকে বন্ধের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন।

শেরপুরে বিড়ি শ্রমিক ও ভোক্তাদের মানববন্ধন
শেরপুর হাসপাতাল রোডের সামনে বিড়ির শ্রমিক ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অর্থমন্ত্রীর ২ বছরের মধ্যে বিড়ি বন্ধের ঘোষণাসহ বৈষম্যমূলক করনীতি ও সিগারেটের পক্ষপাতমূলক আচরণের বিরুদ্ধে মানববন্ধন সমাবেশ ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচী পালন করেছে। এসময় বক্তব্য রাখেন জাতীয় ভোক্তা পক্ষের নেতা নাসরুল্লাহ খান তাজ ও জেলা বিড়ি শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি তালাত মাহমুদ এবং জেলার সেক্রেটারি লুৎফর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

ঘন্টাব্যপি কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২ হাজার বিড়ি পক্ষের লোক। এবং দিনব্যাপী গণস্বাক্ষর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নেতারা বিড়ির উপর বৈষম্য মূলক আচরণ প্রতাহার করা না করলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।

মানবকণ্ঠ/ডিএইচ