বিসিএসআইআরে দেড় শতাধিক নিয়োগে জালিয়াতি

বিসিএসআইআরে দেড় শতাধিক নিয়োগে জালিয়াতি

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) শূন্যপদে দেড় শতাধিক নিয়োগে ঘটেছে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও জালিয়াতির ঘটনা। বিপরীতে নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা হয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। চাঞ্চল্যকর এ দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে। তবে এই নিয়োগের অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিএসআইআরের সদস্য (প্রশাসন) মো. আবদুল মাবুদ মানবণ্ঠকে বলেন, এই নিয়োগ অনেক আগেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অনেক অভিযোগ পড়েছিল তার আগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগের আগে ইডেন কলেজে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। পাতানো ভাইবা নেয়া হয়েছে- এ তথ্যটি সঠিক নয়।

রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, ১২ ধরনের ১৭৯টি শূন্যপদ পূরণে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সায়েন্স ল্যাবরেটরি। প্রতিষ্ঠানের সচিব (উপসচিব) মো. খলিলুর রহমানের স্বাক্ষরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে জুনিয়র মেকানিক পদে ২ জন, টেকনিশিয়ান পদে ৩ জন, জুনিয়র টেকনিশিয়ান পদে ২২ জন, স্টেনোটাইপিস্ট পদে ১ জন, একডিএ বা টাইপিস্ট অথবা টেকনিক্যাল টাইপিস্ট পদে ৪১ জন, টেলিফোন অপারেটর পদে ৩ জন, সিকিউরিটি গার্ড পদে ১৮ জন, অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) পদে ২৭ জন, প্লাম্বিং হেলপার পদে ৩ জন, ইলেকট্রিক হেলপার পদে ৪ জন, মালি পদে ৬ জন এবং ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট বা পিপি অ্যাটেনডেন্ট অথবা হেলপার পদে ৪৯ জনসহ মোট ১৭৯টি শূন্যপদ। রাজস্ব খাতের এ পদগুলো পূরণে প্রার্থীদের যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে অষ্টম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিপ্লোমা ডিগ্রি। কয়েকটি পদে টাইপ করার দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। বয়স নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর। পদগুলোর বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা। সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে তাদের চাকরি হয়েছে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই। এমনকি অনেকের নেয়া হয়েছে পাতানো ‘ভাইবা’।

রেকর্ডে আরো দেখা যায়, নিরাপত্তাকর্মী পদে আনসার কোটায় চাকরি হয়েছে মুন্সীগঞ্জের মো. সাইদুর রহমানের (রোল-২০১৩১৬)। তার দাখিলকৃত কাগজপত্রের মধ্যে আনসারে চাকরি করেছেনÑ মর্মে সার্টিফিকেট নেই। তার কোনো প্রশিক্ষণও নেই। এলডিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জুলহাস আহমেদের (রোল-৫২১৪)। তিনি কম্পিউটার না জানলেও লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় তাকে ‘উত্তীর্ণ’ দেখিয়ে চাকরি দেয়া হয়েছে। সায়েন্স ল্যাবরেটরির সচিব মো. খলিলুর রহমানের বাসার কাজের বুয়া ছিলেন ময়মনসিংহের নূরজাহান নূরী (রোল-১৯৯৯৪)। তাকে মালি পদে চাকরি দিয়ে কাজ করাচ্ছেন খলিলুর রহমানের নিজের বাসায়। নূরীর ভাই বাবুল হাসানকেও চাকরি দেয়া হয়েছে মালি পদে। খলিলুর রহমানের ড্রাইভার ইব্রাহিম মুসলিমের ছেলে নূরুন্নবীকে নিয়োগ দেয়া হয় টেলিফোন অপারেটর হিসেবে। ইব্রাহিম মুসলিমের ভাতিজা সবুজ মিয়া (রোল-১৯৯৭৬) চাকরি পান মালি পদে। বরিশালের মোছা. আছমা খানমের (রোল-১৩৯২৭) বয়স ছিল না সরকারি চাকরি নেয়ার। বয়স কমানোর জন্য তার ভোটার আইডি কার্ড পরিবর্তন করানো হয়। তিনি ল্যাবরেটরি এটেনডেন্ট পদে চাকরি করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির জন্য আবেদনই করেননি ফেরদৌস গাজী (রোল-২০১৩৯)। পে-অর্ডারও দেননি। এমনকি মৌখিক পরীক্ষায়ও তাকে ডাকা হয়নি। তবু তার চাকরি হয়েছে নিরাপত্তা প্রহরী পদে। তিনি সায়েন্স ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদের ভাতিজা বলে জানা গেছে। বর্তমানে চেয়ারম্যানের দফতরেই তিনি এখন কর্মরত।

একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়েছে নিয়োগগুলো। নিয়োগের কমিটি থাকলেও সেটি ছিল সিন্ডিকেটেরই পাতানো। একেকটি নিয়োগের বিপরীতে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা। এভাবে অন্তত দেড় শতাধিক জনবল নিয়োগে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও পাতায় পাতায় রয়ে গেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যেই রয়েছে বহু গরমিল।

তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সচিব মো. খলিলুর রহমান ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল সিকিউরিটি গার্ড পদে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য তালিকা প্রকাশ করেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীদের একটি প্রাথমিক বাছাই হয়। ওই তালিকাটি ছিল বাছাইয়ে উত্তীর্ণ এবং যারা প্রবেশপত্র পেয়েছেন শুধু তাদের। তবে তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে যারা ১৬ মে ২০১৭ তারিখের মধ্যে প্রবেশপত্র পাননি তাদের ২ কপি সত্যায়িত ফটোসহ ১৭ ও ১৮ মে’র মধ্যে পরিষদ সচিব দফতরে উপস্থিত হয়ে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়। সে অনুযায়ী ২০ মে সকাল সাড়ে ৯টায় সিকিউরিটি গার্ড প্রার্থীদের ২০১০১-২০২৪০ নম্বর রোলের মৌখিক পরীক্ষা হয়। একই দিন আড়াইটায় নেয়া হয় ২০২৪১-২০৩৩৪ রোল নম্বরের পরীক্ষা। মৌখিক পরীক্ষার এ তালিকায় ২০১৩৯ নম্বরে কোনো রোল নেই। ‘ফেরদৌস গাজী’ নামক কোনো প্রার্থী নেই। অথচ নিয়োগের পর ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পদায়নের প্রজ্ঞাপনে ফেরদৌস গাজীকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাচা সায়েন্স ল্যাবরেটরির শীর্ষ কর্মকর্তা ভাতিজা ফেরদৌস গাজীকে কোনো আবেদন ছাড়াই এ চাকরি দেন। তাকে পদায়নও করেন নিজ কার্যালয়ে। আনসার না হলেও এ কোটায় চাকরি দেয়া সাইদুর রহমানকেও পদায়ন করা হয়েছে নিজ কার্যালয়ে। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া প্রায় সব সিকিউরিটি গার্ড, মালিকে পদায়ন করা হয়েছে নিয়োগ কমিটি সদস্যদেরই সুবিধামতো জায়গায়।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রতিষ্ঠানটির ৩ কর্মকর্তা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ড. ইউনূস আলী প্রমাণিক। তিনি নিয়োগ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন। এ নিয়োগের কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। তবে অদৃশ্য ইশারায় তিনি ছাড়া পেয়ে যান। নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন যুগ্ম-সচিব আবদুল মাবুদ। সদস্য ছিলেন সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে কর্মরত উপসচিব বেনজির আহমেদ এবং সচিব মো. খলিলুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে উপরে তদবির করে নিয়োগ কমিটিতে ইউনুছ প্রামাণিককে আনা হয়। তার ভূমিকা ছিল কলের পুতুলের মতো। তাকে দিয়ে সব করানো সম্ভব। ইউনুছ প্রমাণিক একাধারে বিসিআইর বোর্ড সদস্য। নিয়োগ কমিটি বা ডিপিসির সদস্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সায়েন্স ল্যাবরেটরিরও ডেস্ক অফিসার। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির মাঝেই নিয়োগলব্ধ অর্থ ভাগ-ভাটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, এই নিয়োগ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কমিটির প্রধান ছিলেন একজন উপসচিব লেভেলের লোক। আমি বাইরে আছি কথা বলতে পারব না।

মানবকণ্ঠ/এসএস