বিষাক্ত লবণে বাজার সয়লাব

সোডিয়াম সালফেট আমদানি নীতিমালা ও বিক্রি নজরদারির তাগিদ সংশ্লিষ্টদের

বিষাক্ত লবণ

সোডিয়াম ক্লোরাইড ও সোডিয়াম সালফেট। দুটি রাসায়নিক পদার্থ দেখতে হুবুহু একই রকম। স্বাদও একই- লবণাক্ত। কিন্তু এই দুটি রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারে ক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহৃত হচ্ছে খাবার লবণ হিসেবে। আর সোডিয়াম সালফেট ব্যবহার করা হয় মিল-কারখানায়। এটা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আবার সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাবার লবণ আমদানি নিষিদ্ধ। তবে দেশে লবণ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে ওই ঘাটতি লবণ বিদেশ থেকে আমদানির সুযোগ দেয়া হয় এবং কঠোরভাবে তা মনিটরিংও করা হচ্ছে। ডিউটি ট্যাক্স বেশি হওয়ায় সোডিয়াম ক্লোরাইডের আমদানি ব্যয়ও অনেক বেশি।

অন্যদিকে সোডিয়াম সালফেট বা ক্লিনিং এজেন্টের আমদানি ব্যয় অনেক কম। সরকার শিল্পখাতকে উৎসাহিত করতে সোডিয়াম সালফেটের ডিউটি ট্যাক্স কম নির্ধারণ করেছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল হক জানান, আমদানি নীতি ২০১৫-১৭ অনুযায়ী সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানি নিষিদ্ধ। আবার সোডিয়াম ক্লোরাইডের তুলনায় সোডিয়াম সালফেট আমদানিতে ডিউটি কম। তাই এক শ্রেণির অসৎ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী এই সুযোগটি নিচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষ করে তারা সোডিয়াম সালফেট আমদানির ঘোষণা দিয়ে সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত করে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন খাবার লবণ হিসেবে।

জানা যায়, চট্টগ্রামের লবণ ব্যবসায়ীরা বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাদের সেই অভিযোগটি আমলে নেয়া হয়নি। ফলে নির্বিঘেœই নিজেদের অপকর্ম করে যাচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীরা।

সম্প্রতি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় থাকা ২ হাজার টন বিষাক্ত লবণ আটক করে। পরে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফলিত রসায়ন ও ক্যামিকৌশল বিভাগে। পরীক্ষার পর তাদের দেয়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, জব্দকৃত লবণে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ, সোডিয়াম সালফেট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আর্দ্রতার পরিমাণ ১ শতাংশ।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের দুই আমদানিকারক মেসার্স আজমির ট্রেডিং কর্পোরেশন ও মেসার্স আশা এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে এসব বিষাক্ত লবণ আমদানি করেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার লবণে নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত হলে তা খাবার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। তবে খাবার সংরক্ষণে ১ শতাংশ বা তারও কম পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট ব্যবহার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. নুরুল আমিন মানবকণ্ঠকে বলেন, সোডিয়াম ক্লোরাইডের (খাবার লবণ) সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত হলে তা খাওয়া যাবে না। এই মিশ্রণটি মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, সোডিয়াম সালফেট সাধারণত পেপার মিল, টেক্সটাইল মিল, ডিটারজেন্ট তৈরিতে, ড্রাইং এজেন্ট (কাপড় পরিষ্কার) হিসেবে এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ বিভিন্ন কলকারখানায় ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি মানবদেহের কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়াও নারী ও শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম লবণ মিল সমিতির সভাপতি ও এমএন কবির অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী নুরুল কবির মানবকণ্ঠকে জানান, সাধারণত সোডিয়াম ক্লোরাইড বা খাবার লবণ আমদানি নিষিদ্ধ। খাবার লবণ সাধারণত দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে কখনো দেশে লবণের উৎপাদন কম হলে ঘাটতি লবণ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। আবার যে কেউ ইচ্ছে করলেই লবণ আমদানি করতে পারে না। লবণ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই লবণের আমদানিকারক। অন্যদিকে যে কেউ ইচ্ছে করলেই সোডিয়াম সালফেট আমদানি করতে পারেন। অনেক অসৎ আমদানিকারক প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে বাকিটা খাবার লবণ বলে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কারো ৫ টন সোডিয়াম সালফেট প্রয়োজন। কিন্তু তিনি ৫০০ টন সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে বাকি সাড়ে ৪শ’ টন খাবার লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তার মতে এসব বিষয়ে সরকারের নজরদারির যেমন অভাব রয়েছে তেমনি সোডিয়াম সালফেট আমদানিরও কোনো নীতিমালা নেই। তিনি সোডিয়াম সালফেট আমদানি নীতিমালা তৈরির পাশাপাশি এর ব্যবহারে ওপরও নজরদারি বৃদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন। এসব বিষয়ে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লবণ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিসিক ও লবণ মিল মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা ১৫ লাখ ৭৬ হাজার থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। চলতি অর্থ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন কম লবণ উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে বিগত বছরের ঘাটতি ছিল ৫ লাখ মেট্রিক টন। যা আমদানির জন্য চলতি সপ্তাহেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানির অনুমতিপত্র দেবে বলে জানা যায়। ১৬৪ জন মিল মালিক এসব লবণ আমদানি করবেন। ব্যবসায়ীরা স্বল্প সময় ও আমদানি ব্যয় হ্রাসসহ বিভিন্ন কারণে ভারতের গুজরাট থেকেই সাধারণত লবণ আমদানি করে থাকেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস