বিষফোঁড়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা

আরো আসার অপেক্ষায় অনুপ্রবেশে বাধ্য করছে মিয়ানমার : আজ রোহিঙ্গাদের দেখতে উখিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে জিইয়ে রয়েছে মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা রোহিঙ্গারা। টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের জন্য একটি বিষফোঁড়ার মতো হয়ে আছে।

সর্বশেষ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করার সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হলে এ দেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করাও মুশকিল।

জানা গেছে, টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত এলাকাসহ কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা এবং গোটা দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে অবস্থান করছে। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে বিভিন্নভাবে কক্সবাজার-বান্দরবানে ৫ লক্ষাধিক বলে দাবি করা হয়ে থাকে।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালে উখিয়ায় কয়েকশ’ একর পাহাড় কেটে ১৫ হাজার রোহিঙ্গাকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। এরপর এই শিবিরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে কয়েক হাজার একর সংরক্ষিত পাহাড় কেটে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। টেকনাফেও ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে ২০১২ সালেই আশ্রয় দেয়া হয়েছিল বিভিন্নভাবে। এভাবে কক্সবাজারের পুরো জেলায় রোহিঙ্গাদের বিস্তার ঘটে। আরাকান নয়, কক্সবাজারই হতে পারে কথিত ‘রোহিঙ্গা রাজ্য’। এবারো যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তারা এখানেই ফের বন বিভাগের বন ও পাহাড় দখল করে বসতি স্থাপন করে নিয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢুকাতে পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারকে উসকানি দিচ্ছে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী ও দেশ। বাধ্য করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের।

বর্তমানে এরা শুধু কক্সবাজার অঞ্চলেই নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভাষা, চেহারা, চালচলন, আচার ব্যবহার, খাদ্যাভাসসহ প্রায় সবকিছুর সঙ্গে মিল রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। ফলে এদের শনাক্ত করাও এখন কঠিন এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে। আবার কখনো কখনো রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক নয় বলেও বলা হয়ে থাকে।

কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়ে, কখনো সে দেশের সামরিক জান্তার দমন-নিপীড়নে উপায়ান্তর না দেখে আবার কখনো ভাগ্যান্বেষণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেই চলেছে।

১৯৪২ সালে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: সর্বপ্রথম ১৯৪২ সালে জাপান-ব্রিটিশ যুদ্ধের সময় রোহিঙ্গারা ব্রিটিশের পক্ষে থাকায় জাপানি সৈন্যদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারে চলে আসে। ১৯৬৫ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় জাতিগত দাঙ্গার কারণে রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন সীমান্ত অতিক্রম করে এ দেশে চলে আসা শুরু করে। তার কোনো হিসাব কোথাও নেই।

১৯৭৮ ও ৯২ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের বিএনপি সরকারের আমলে (১৯৭৮ সালে) এবং ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গার আগমন ঘটে। তখন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে চলে এসেছিল। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ শরণার্থী প্রত্যাবাসন হলেও ফের বেশিরভাগ রোহিঙ্গা চলে আসে এ দেশে।

২০১৬ সালে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: ২০১৬ সালের অক্টোবরে সীমান্তরক্ষীদের চৌকিতে হামলার পরেই মিয়ানমারে রাখাইনের গ্রামে-গ্রামে অভিযান চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। সে সময় নির্বিচারে রোহিঙ্গা হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয় বলে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠে। সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে অক্টোবরেই প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা।

২০১২ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: ২০১২ সালের জুনেও মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। ওই সময় সরকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শক্ত অবস্থান নেয়। তার পরও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। তবে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই।

২০১৭ সালে ২ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: এদিকে সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে শুরু হয়েছে নতুন করে সহিংসতা। রাখাইনে দমন অভিযানের মুখে গত দুই সপ্তাহে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরো ২ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বৈধ রোহিঙ্গা ৩২ হাজার: কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, কক্সবাজারে উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফে নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে তালিকাভুক্ত শরণার্থীর সংখ্যা ৩১ হাজার ২৯৮ জন। তৎমধ্যে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ২৬৩৫ পরিবারে ১৩ হাজার ১৫১ জন ও নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে ৩৩৮৫ পরিবারে ১৮ হাজার ১৪৭ জন শরণার্থী রয়েছে। সরকারি হিসাব মতে বাংলাদেশে বৈধ রোহিঙ্গার সংখ্যা হলো প্রায় ৩২ হাজার।

প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ, ২০০৫ সালের ২৭ জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে দুটি শিবিরে আশ্রিত শরণার্থী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম। ১৯৭৮, ১৯৯১, ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ও প্রত্যাবাসনে ফাঁকি দিয়ে বিপুলসংখ্যক মিয়ানমার নাগরিক থেকে যায় এ দেশে। আবার প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গারাও ফের অনুপ্রবেশ করে এ দেশে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে বলে ইউএনএইচসিআরের সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদ আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চল বর্তমানে সামগ্রিক নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। ইতিমধ্যে তাদের কারণে সারাদেশে উগ্র জঙ্গি তৎপরতা, ইয়াবা ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারে বোধগম্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দাবি- অবিলম্বে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে সীমান্ত সিল করা, রোহিঙ্গাদের মানবতার নামে অনুপ্রবেশে উৎসাহ প্রদানকারী কতিপয় দেশি-বিদেশি এনজিও এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া।

তিনি বলেন, ২০১৫ পর্যন্ত বৈধ-অবৈধ মিলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানসহ আশপাশের জেলাগুলোয় প্রায় আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা ছিল। এসব রোহিঙ্গার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা সমস্যা-সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে বা হয়েছে। নয়াপাড়া আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ১১টি রাইফেল লুট ও এক আনসারকে হত্যার ঘটনায় রোহিঙ্গারা জড়িত ছিল। সর্বশেষ ২০১৬ সালের অক্টোবর ও ২০১৭ সালের চলতি মাসে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে তিনি জানান।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার আসিফ মুনীর জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার। তা না হলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান কোনোদিনও হবে না।

এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, নতুনভাবে তিন লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। সব মিলে এখন পর্যন্ত ৭ থেকে আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আসার অপেক্ষায় রয়েছে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, সরকার এ বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বর্তমান সরকার দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আবারো শুরু করবে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসের জন্য সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘ দায়িত্ব পালন করছে। এখনো পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার এ ব্যাপারে তেমন কোনো মতামত দিচ্ছে না। যদি তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার মতামত দেয় তাহলে দ্রুতই প্রত্যাবাসন করা হবে।

এ ছাড়া তিনি বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে অনেক রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফ ঢুকে পড়েছে। তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থান করে দেয়ার জন্য ব্যবস্থা চলছে।

আজ উখিয়া আসছেন প্রধানমন্ত্রী: রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য আজ ১২ সেপ্টেম্বর উখিয়ায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের সহানুভূতি জানাবেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টায় কক্সবাজার আসবেন। তবে কক্সবাজার বিমানবন্দর নাকি সরাসরি উখিয়া বা টেকনাফে অবতরণ করবেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনবেন এবং তাদের সমবেদনা জানাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের আরো বেশ কয়েক শীর্ষ নেতাও সফর সঙ্গী হবেন বলে জানা গেছে।

One Response to "বিষফোঁড়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা"

  1. swapan kumar mondol   13/09/2017 at 10:50 AM

    Future problem of Bangladesh do not understand opposite party of Bangladesh.Look to Pakistan-Afgan refugey had created that problem,that problem still now.Everyday Pakistan face to terrorist.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.