বিশ্ব হাতি দিবস

আজ বিশ্ব হাতি দিবস। ২০১০ সাল থেকে, কানাডিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিকিয়া সিমস এবং মাইকেল ক্লার্ক থাইল্যান্ডের বিপন্ন এশিয়ার হাতির অবস্থা বর্ণনা করে ‘হোয়েন এলিফ্যেন্ট অয়ার ইয়ং’ নামক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট হাতি রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এশিয়ান ও আফ্রিকান হাতির জরুরি অবস্থা দেখার জন্য প্রথমবাবের মতো ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে চালু করা হয়েছিল এবং প্রতিবছর এই দিবসটি বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে লক্ষ্য করে পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় ‘হাতিকে রক্ষা করার জন্য বিশ্ববাসী একযোগে কাজ করতে হবে’। এ বছরের প্রতিপাদ্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ কারণ বন বিভাগের তথ্য মতে, বন ধ্বংস করে কৃষি জমির বিস্তার, নগরায়নসহ নানা কারণে অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে হাতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতি সংরক্ষণে দেশের অবশিষ্ট বনাঞ্চল সংরক্ষণ, চলাচলের বিচরণ পথ রক্ষা এবং জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। অন্যথায় স্থলভাগের বৃহত্তম এই প্রাণীটি আগামী কয়েক দশকেই দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এক সময় দেশের ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় হাতির অবাধ বিচরণ ছিল। এরই মধ্যে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সিলেট থেকে হাতি হারিয়ে গেছে। এসব এলাকায় একটি নির্দিষ্ট সময় ভারতের আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরা থেকে কিছু হাতি খাবারের সন্ধানে আসে। বর্তমানে শুধু চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি বনেই হাতির দেখা মেলে। বিশেষ করে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, টেকনাফ, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ও চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে হাতির বিচরণ রয়েছে। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির হাতি আছে, এশিয়ান হাতি ও আফ্রিকান হাতি, যদিও শারীরিকগত দেখতে প্রায় একইরকম তবু এদের মধ্যে জৈবিক পার্থক্য রয়েছে। পৃথিবীতে এখন ৪০,০০০ এর কম এশিয়ান হাতি আছে। পৃথিবীতে প্রায় ৪,০০,০০০ এর কম আফ্রিকান হাতি (বন ও তৃণভূমি) বেঁচে আছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায় যে, বনচারী আফ্রিকান হাতি জেনেটিক্যালী স্বতন্ত্র প্রজাতি, যা হাতির তৃতীয় প্রজাতি।
ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) জরিপ মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃদেশীয় যে ৫৭টি পথ দিয়ে হাতি চলাচল করত তার মধ্যে ১১টি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এই জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। জরিপে বন্যহাতির সংখ্যা বলা হয়েছে ২৬৮টি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত আইইউসিএনের জরিপে হাতির সংখ্যা ছিল ১৭৮। নতুন জরিপ মতে, বন্যহাতি ছাড়াও ৯৩টি অভিবাসী হাতি এবং ৯৬টি পোষা হাতি রয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরের কারণে ৪০টি হাতি বিপদে পড়েছে। হাতিগুলো টেকনাফ-উখিয়ার সংরক্ষিত বনভূমির পশ্চিম দিকে ছয়-সাত মাস ধরে আটকে আছে। খাদ্য সংগ্রহের জন্য তারা শিবির পার হয়ে বনের পূর্ব দিকে যেতে পারছে না এবং উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরের বসবাসরত রোহিঙ্গারা সরাসরি নির্ভর হতে হচ্ছে বনের উপর। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি ও ২৬ নভেম্বরের স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে উখিয়া উপজেলার বনভূমির উপর একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে, এতে দেখা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে ওই এলাকার মোট ভূমির ৬৫.৪৯ শতাংশ বনভূমি ছিল, যেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির তৈরি করতে ১১.১ শতাংশ বনভূমি উজাড় হয়ে যায়, অর্থাৎ বর্তমান বনভূমির পরিমাণ মোট ভূমির ৫৪.৩৯ শতাংশ। আইইউসিএন এর তথ্যমতে, বন্য এশীয় হাতি বাংলাদেশের মহাবিপন্ন প্রজাতির প্রাণী এরা মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারতের ভেতর দিয়ে দল বেঁধে বিচরণ করে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও মাইন পুঁতে রাখায় প্রতিবছর দুই থেকে তিনটি হাতি মারা যায় এবং নতুন বিপদ হিসেবে হাজির হয়েছে রোহিঙ্গা শিবির। এছাড়া দাঁত, চামড়া ও মাংসের জন্য প্রতিবছর গোপনে বন্য হাতি নিধন তো চলছেই।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাতিকে বলা হয় আমব্রেলা স্পিসিস। কারণ, একটি হাতি বনে ছাতার মতো কাজ করে। অর্থাৎ, হাতি যদি বেঁচে থাকে, তাহলে বনও টিকে থাকবে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অনেক প্রাণী বিলুপ্তির পথে তাই হাতি যেন সে পথ না ধরে, সে জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানো, হাতির এলাকা সংরক্ষণ, খাবার নিশ্চিত করাসহ একাধিক বিষয়ে প্রাধান্য দিতে হবে। হাতি রক্ষার ব্যবস্থা না নেয়া হলে আমাদের দেশ থেকে অচিরেই হারিয়ে যাবে এই প্রাণী। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, হাতির বিচরণ পথ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পৃথিবীর অন্যান্য প্রানীর ন্যায় এই বিশাল প্রানীও পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
– ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও মো. হাসিব ইকবাল কানন