বিমানের যাত্রী বাড়ছে বাড়েনি সেবার মান

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। জাতীয় পতাকাবাহী এ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বাড়লেও বাড়েনি সেবার মান। গত ১০ বছর আগে বিমান বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ছিল ১৩টি। বর্তমানে বিমান বহরে আছে ১৫টি উড়োজাহাজ। ১৬টি আন্তর্জাতিক ও ৭টি অভ্যন্তরীণ রুটে এ সীমিত সংখ্যাক উড়োজাহাজ নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করতে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বিমানকে। এ নিয়ে কোনো ধরনের মাথাব্যথা নেই সংশ্লিষ্টদের। যুগের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ এ সংস্থাটি কেন্দ্র করে বিমানের একশ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারী লুটপাটের মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের জ্বালানি খাতে, ক্যটারিং ও বিমান মেরামতের নামে চলছে নানা দুর্নীতি আর লুটপাট। প্রতিষ্ঠা লাভের ৪৭ বছরেও বিমান গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বিমানের সিডিউল বিপর্যয়, সময় মতো ফ্লাইট পরিচালনা না করা, যাত্রীদের লাগেজ হারানো, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং খাবারের মান নিয়ে অন্তহীন অভিযোগের পরেও সংস্থার কর্তা ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কোনো ধরনের সমাধান করতে পারেননি। বিমান ও বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে বাংলাদেশ বিমানের যাত্রী বাড়লেও কমেছে সেবার পরিসর। ৫২টি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৫টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দক্ষ লোকবলের ঘাটতির কারণে কাক্সিক্ষত অবস্থানে যেতে পারেনি সংস্থাটি। তবে সময়সূচি ঠিক রাখা ও সেবার মান বাড়ানো গেলে, বাড়বে বিমানের মুনাফা। বিমানের প্রত্যাশা, চলতি বছরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আরো পাঁচটি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে চিত্র পাল্টাবে।

ভাড়া বেশি থাকায় এক সময় শুধু উচ্চবিত্তরা ভ্রমণ করতেন বিমানে। তবে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে বদলেছে চিত্র। সিভিল এভিয়েশনের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় অভ্যন্তরীণ রুটে আকাশপথে যাত্রী বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১৩ সালে যেখানে যাত্রী ছিল ১৩ লাখ, ২০১৭তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখে। ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাপ সামলাতে চলতি মাসেই ঢাকা থেকে যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশাল রুটে ফ্লাইট সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ বিমান।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, চাহিদা বাড়ার কারণে সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়নো হবে। ঢাকা থেকে সৈয়দপুর সপ্তাহে ৭টি ফ্লাইটের বদলে ১৪টি, ঢাকা থেকে রাজশাহী ৪টির বদলে ৭টি। এ ছাড়া ঢাকা থেকে যশোরে ১৪টি ফ্লাইট করার পরিকল্পনা নিয়েছি।

এদিকে যাত্রীর চাপ বাড়লেও বাড়েনি বিমানবন্দরগুলোর হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি ও অবকাঠামো সুবিধা। এক্ষেত্রে মান সম্মত সেবা নিশ্চিতে বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের আহ্বান খাত সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, ২০০৮ সালে বিমান লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি বন্ধ হয়েছিল। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিমানের একটি ডিসি ১০ দিয়ে পরিচালিত ঢাকা-লন্ডন সরাসরি সেবার একটি বিমান হিথ্রো বিমানবন্দরে তার নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা পর পৌঁছালে তাকে সেখানে অবতরণ করার অনুমতি না দিয়ে জ্বালানি ভরার জন্য গেটউইক বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২০০৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং সময়সূচি না মানার কারণে এর কর্মীদের বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণ না করার সতর্কতা জারি করে। তা সত্ত্বেও যারা বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণ করেছে তারা নিজ দায়িত্বে ভ্রমণ করেছে এবং তাদের বীমার টাকা দাবি করতে পারেনি। বিমানের এ ধরনের সমস্যার কারণে শুধু বিমানেরই নয় দেশের ভাবমর্যাদাও বার বার মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার সৈয়দপুর যশোর ৩টি এয়ারপোর্টে যে সিটিং ক্যাপাসিটি থাকা উচিত, সেই সুবিধা নেই। টার্মিনাল ও লাগেজ ফ্যাসিলিটি বাড়ানো হলে যাত্রীরা বিমানকে বেছে নেবে।

অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর কারিগরি ও অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়াতে শিগগিরই কাজ শুরু হবে বলে জানায় বেবিচক কর্তৃপক্ষ। বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি পরিচালক উইং কমান্ডার চৌধুরী জিয়াউল কবির বলেন, কক্সবাজার যশোরে কাজ দ্রুত হচ্ছে। নতুন ভবনসহ রানওয়ের কাজ নেভিগেশনের কাজসহ প্রযুক্তিগত আপগ্রেড হচ্ছে। খুব দ্রুত এই কাজগুলো এগোচ্ছে। যাতে যাত্রী বৃদ্ধির কাজ সহজে করা যায়। অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে সব বিমান সংস্থার প্রতিদিন গড়ে ১৯২টি ফ্লাইট চলাচল করে। আর যাত্রী ভ্রমণ করে প্রায় ১০ হাজার।

সিভিল এভিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল খান মজলিস বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের প্রায় ১ কোটি প্রবাসী থাকেন। ওই রুটে বিমানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ঠিকভাবে সেবা দেয়া গেলে মুনাফার পরিমাণ বাড়বে। এ ছাড়া বিমান লিজ নেয়ার সময় আমাদের বেশি করে বার্গেইন করতে হবে যাতে করে আমরা সবচেয়ে কম টাকায় ভালো বিমান নিতে পারি। তিনি আরো বলেন, যাত্রী সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি বিমান বহরে এয়ার ক্রাফটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমাদের বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো বাড়াতে হবে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এএম মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বিমান এখন একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। আগামীতে এই ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা প্রতিষ্ঠানের সেবার মান আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছি। বাংলাদেশ বিমান যাতে যাত্রীদের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় তার লক্ষ্যে রাত-দিন সবাই কাজ করে যাচ্ছে।