বিমসটেক সম্মেলন: আমাদের প্রত্যাশা

৬ জুন, ১৯৯৭ সাল। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ব্যাংককে। বৈঠকে একটি নতুন আন্তঃআঞ্চলিক জোট সৃষ্টি করা হলে তার নাম দেয়া হয় ‘বিমসটেক’। প্রথম দিকে চার দেশের নামের অদ্যাক্ষর সাজিয়ে নামকরণ করা হয় BIST-EC (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন)। পরবর্তীতে একই বছর ডিসেম্বরের দিকে মিয়ানমার যোগ দিলে সংগঠনের নামে কিছুটা পরিবর্তন এনে নামকরণ হয় BIMST-EC। যার পুরো নাম দাঁড়ায় -বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন সংক্ষেপে ‘বিমসটেক’।

এটি হচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আঞ্চলিক জোট। জোটের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পর্যালোচনা করে নেপাল ওই জোটে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেয়া হয় এবং ২০০৩ সালে নেপালকে জোটের পূর্ণ সদস্য পদ প্রদান করা হয়। একই বছর ভুটানকেও পূর্ণ সদস্য পদ প্রদান করা হলেও সংগঠনের নাম পরিবর্তন করা হয়নি।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে বিমসটেকের মূল উদ্দেশ্য। প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সন্ত্রাস, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রযুক্তি, পর্যটন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পোশাক, চামড়া শিল্প, ব্যবসা বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করা।

বিমসটেকের সদর দফতর ঢাকায় অবস্থিত। ২০১৪ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তা উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছে নেপাল; যা পরিবর্তনশীল। প্রথানুযায়ী চলতি বছরের চলতি মাসের শেষের দিকে বিমেসটেকের সম্মেলন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সংঘটিত হতে যাচ্ছে। ওই অনুষ্ঠানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আমন্ত্রিত। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিমসটেক সম্মেলনে যোগদান করেন। যতদূর জানা যায়, ওই অনুষ্ঠানে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করবেন।

সম্মেলনের মধ্যবর্তী সময়ে বিমসটেক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বলেও আভাস পাওয়া যায়। সে সুবাদে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনার সুযোগ হবে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। আমাদের বিশ্বাস দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। কেননা তিনি সবসময় বলে এসেছেন বাংলাদেশের যে কোনো সমস্যায় ভারত পাশে থাকবে। বিশেষ করে তিনি ইঙ্গিতও দিয়েছেন রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশের পাশে থাকার। যদিও ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যাকে বলে, ‘ধরি মাছ নাই ছুঁই পানি আচরণ’ করছে। তথাপিও আমরা ধরে নিচ্ছি বিষয়টা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করতে পারলে ভারত আমাদের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। পাশাপাশি বিমসটেক সদস্য দেশগুলোকে বোঝাতে সক্ষম হতে হবে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে শুধু মানবতার পরিচয়ই দেননি, দিয়েছেন বিশ্বমোড়লদের শিক্ষাও।

এখন যা করার সেটি হচ্ছে, বিমসটেক সম্মেলনে স্পষ্ট করতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একার নয়, এটি সমগ্র উপমহাদেশীয় অঞ্চলের জন্য অশনি সংকেত। হতদরিদ্র এ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লে লাভবান হবে জঙ্গি সংঠনগুলো। রোহিঙ্গাদের দরিদ্রতার সুযোগটি অনায়াসেই গ্রহণ করবে জঙ্গিরা। বিভিন্ন প্রলোভনে আকৃষ্ট করিয়ে বিপথগামী করে তুলতে খুব বেশি সময় লাগবে না ওদের। সেই ধরনের কিছু হলে ফল হবে ভীষণ মারাত্মক। ক্রমান্বয়ে ওরা ভারত-পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ বিস্তৃতির সুযোগ পাবে। যাতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান হুমকির সম্মুখীন হবে।
আর হ্যাঁ, শুধু জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়ানোই নয়, রোহিঙ্গারা বিভিন্ন রোগের বাহকও। যতদূর জানা যায়, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই জটিল রোগে রোগাক্রান্ত। জটিল ব্যাধি ওদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তার মধ্যে এইডস অন্যতম। যা ক্রমান্বয়ে ওদের ক্যাম্পসহ আশপাশের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে স্থানীয় অসাধু লোকের প্ররোচনায় অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে দেশে এই রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এ ছাড়াও ওরা বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়ে নানা অপকর্ম করে দেশের ইজ্জত লুণ্ঠন করছে। এসব তথ্য বিমসটেক সম্মেলনে তুলে ধরতে হবে।

বিমসটেক সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচন, সন্ত্রাস দূরীকরণসহ ইত্যাদি বিষয়ে যেহেতু বলার সুযোগ রয়েছে তাহলে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যু সর্বাগ্রে টানতে পারি। প্রয়োজনে বিমসটেকের গঠনতন্ত্রের উদাহরণ টানা যেতে পারে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে এটি আমাদের জন্য একটি মোক্ষম সুযোগ। যে সুযোগ বারবার উঁকি দেয় না। দিল্লি যেহেতু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাহলে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে বিমসটেক সম্মেলনের মাধ্যমে। তবে সার্থক হবে বিমসটেকের কার্যক্রম এবং সফল হবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক। – লেখক: কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ

মানবকণ্ঠ/এএএম