বিভাগোত্তর উপমহাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং রাজনীতি বিপরীত মুখে চলতে শুরু করে। পাকিস্তানের ছোট-বড় শহরগুলো বিদেশি পণ্যে ভরে যায়। বিদেশি কার, বিদেশি শার্ট-প্যান্ট, স্যুট-কসমেটিকসসহ নানাবিধ বিলাসদ্রব্যে দোকানগুলো সয়লাব হয়ে যায়।

১৯৫৯ সালে জীবনের প্রথম সে রেজরটি কিনেছিলাম ঈশ্বরদীর মতো ছোট্ট এক শহরের দোকান থেকে সেটা তৈরি হয়েছিল জার্মানিতে। নাম জিলেট। ব্লেডও সব বিদেশি। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের রাস্তা-ঘাটে মনোহারী বিদেশি গাড়িতে ছেয়ে যায়। মার্সিডিজ বেঞ্চ, মরিস-মাইনর, ফোর্ড প্রভৃতি গাড়িতে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বরে স্যারদের মার্সিডিজ বেঞ্চসহ, কত মডেলের গাড়ি দেখেছি। অপরদিকে ভারতের বড় বড় শহরে কেবল অ্যাম্বাসাডার আর অ্যাম্বাসাডার। এ নিয়ে ভারতের প্রতি আমাদের করুণা হতো। আর পাকিস্তান নিয়ে গর্ব হতো। দেশ ভাগের অমানবিক দুঃখ-কষ্ট, প্রাণহানি, পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের করুণ চিত্রের পাশাপাশি, এ দৃশ্যও কারো নজর এড়িয়ে যায়নি। শহরবাসী উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর দৃষ্টি ছিল বিদেশি জিনিসপত্রের দিকে। দেশের কোনো জিনিসের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। আর ছিলই বা কী? নতুন দেশ, নতুন সরকার শূন্য বাজার। প্রকৃতিতে শূন্যস্থান থাকতে পারে না। বিদেশি পণ্য দ্বারা সে শূন্যস্থান পূরণ করা হয়।

পাকিস্তান অর্জনে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম লীগ স্বাধীন পাকিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে কোনো পূর্ব পরিকল্পনা করেছিল, এমন কোনো নজির আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছিল কংগ্রেস। দেশভাগের পেছনে যে গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে ছিল, ভারত ও পাকিস্তানে তাদের সে স্বার্থ ভালোভাবেই পূরণ হয়েছিল। তার জন্য খেসারত গুনতে হয়েছিল সাধারণ ছাপোষা মানুষকে। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বর্ডার অতিক্রম করতে হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ হিন্দু ও মুসলমানের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। সেই লাশের পাহাড়ের ওপর দিয়ে উভয় দেশের বুর্জোয়া শ্রেণীর শনৈঃশনৈঃ উন্নতি হয়েছিল। তারাই আজো উভয় দেশ শাসন করে আসছে। একাত্তরে পাকিস্তানের অর্ধেকটা খসে পড়লেও সেখানে আজো সেই শ্রেণীরই আধিপত্য অব্যাহত আছে।

দুই
বুর্জোয়া শ্রেণী, যারা ভারত-পাকিস্তানের মাটিতে তাদের শিল্প-বাণিজ্য-ব্যবসাপাতি নিয়ে জাঁকিয়ে বসেছিলেন, দেশ ভাগের ফলে তাদেরও বর্ডার অতিক্রম করতে হয়েছিল। তাদের যাবতীয় ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে হিন্দু, শিখ ও পার্সি প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে আর মুসলিম ব্যবসা-বাণিজ্যগুলো পাকিস্তানে চলে আসে। এরাই ১৯৫০ সালের পর ভারত-পাকিস্তানের অর্থনীতি-রাজনীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় ভারত-পাকিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতি বিপরীতমুখে পরিচালিত হয়েছে। কেন? এই প্রশ্নটি নিয়েই গবেষণা করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক তীর্থঙ্কর রায়। গত ১৭ আগস্ট, ২০১৭ তার ‘How Partion Shaped the Business That Moved Across Borders’ প্রবন্ধে বলেন যে, বহু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বর্ডার অতিক্রম করেছিল এবং সেইসব প্রতিষ্ঠানের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ১৯৫০ সালের পর উভয় দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। আমরা জানি অখণ্ড ভারতের প্রধান পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সমর্থন করেছিল। উল্লেখযোগ্য যে, দুটো বিশ্বযুদ্ধ, অসহযোগ আন্দোলন ও ত্রিশের মহামন্দায় ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের সঙ্গে ঔপনিবেশিক কেন্দ্রের যোগসূত্র অনেকটা দুর্বল বা একেবারেই ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেই সুযোগটা ভালোভাবেই গ্রহণ করে দেশীয় পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণী। তারা অনেকটা শক্তি সঞ্চয় করে এবং স্বাধীন ভারত-পাকিস্তানে তাদের বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা লক্ষ্য করে। ১৯৩৮ সালে জিডি বিরলা সমস্ত ব্রিটিশ স্বার্থকে দেশত্যাগের দাবি জানান। ভারতীয় মার্চেন্টস চেম্বারের সভাপতি এম. এ. মাস্টার বলেন, ‘ভারতের শিল্পোদ্যোগ যদি বন্ধও রাখতে হয়, বন্ধ থাকবে, কিন্তু নতুন কোন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে ঢুকতে দেয়া হবে না। মুম্বাই প্ল্যান সমস্ত বৈদেশিক পুঁজির অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কস্তুরিবাই লালাভাই, আম্বালাল সারাভাই, যমুনালাল বাজাজ এবং জিডি বিরলার মতো শিল্পপতি মহাত্মা গান্ধীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এরা সবাই স্বাধীন ভারতে শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারা নেহরুর সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা পছন্দ করেন না। কিন্তু তার শিল্পায়ন-নীতির সমর্থক ছিলেন। নেহরু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তার সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা থেকে সরে আসেন। অন্যদিকে মুসলিম ব্যবসায়ী শ্রেণীর সঙ্গে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সমর্থন করেনি। তাদের সবাই ছিলেন ব্যবসায়ী পুঁজির মালিক, শিল্পায়নের মধ্যে তাদের উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এই পার্থক্য মৌলিক। এছাড়াও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণী একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের পক্ষপাতী ছিল। অন্যদিকে মুসলিম বুর্জোয়া শ্রেণীর একটি দুর্বল কেন্দ্র ও শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষপাতী ছিল। এজন্য স্বাধীনতার পর ভারত প্রশাসনিক ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসিত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং সেখানে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি শিল্প-বিপ্লবের সূচনা হয়। অন্যদিকে দুর্বল কেন্দ্র-শাসিত পাকিস্তানে ভারত থেকে হিজরতকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তি সঞ্চয় করে। এ কারণেই রাজনীতির গতি প্রকৃতি দুটি দেশে বিপরীত দিকে পরিচালিত হয়।

তিন
দেশভাগের প্রাক্কালে করাচি ও লাহোর ছিল জনবহুল বড় ব্যবসা-কেন্দ্র। সেখানকার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ছিল হিন্দু, পার্সি ও শিখ। দেশভাগের পর তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে ভারতে চলে যায়। সবচেয়ে বড় নামকরা ব্যবসায়ী লালা শ্রীরাম দিল্লিতে গিয়ে বিরাট কাপড়ের মিল স্থাপন করেন। দেশ ভাগের ফলে ফয়সালাবাদের ‘লায়ালপুর কাপড়ের কল’ সংকটে পড়ে। সেই মিলের প্রায় সবাই দিল্লিতে গিয়ে ১৯৪৮ সালে ‘স্বতন্ত্র ভারত মিল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
অপরদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে যায়, সেগুলো সবই ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। তারা গতিশীল, এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে তাদের স্থাপনা ছিল। কারো কারো কলকাতায় প্রধান অফিস ছিল। তাদের পরিচয় যেমন মুসলিম, তেমনি উদার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্মত। তারা যে কোন উদার আহ্বানে পৃথিবীর দেশে দেশে ব্যবসা সম্প্রসারিত করতে প্রস্তুত ছিল। গুজরাটের সর্ববৃহৎ হানাই মেমন সম্প্রদায় করাচিতে চলে যায় এবং কাপড়ের ব্যবসা নিজ হাতে তুলে নেয়। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের বড় ব্যবসা পরিবার মন্নো ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ ছিল পাঞ্জাবি; আদমজী ও কাশেম দাদা ছিলেন গুজরাটের মেমন গ্রুপের সদস্য, সায়গলরা ছিলেন পাঞ্জাবি, এদের ব্যবসাকেন্দ্র ছিল কলকাতায়, গুজরাটের কাটিহার থেকে এসেছিলেন আহমেদ দাউদ এবং বাওয়ানি টেক্সটাইল পরিবার গুজরাটের বড় ব্যবসা-গ্রুপ থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়। এইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের টেক্সটাইল ও ফিন্যান্স নিয়ন্ত্রণ করে। গুজরাটি ইসমাইল মহম্মদ আলি হাবীব পাকিস্তানের বৃহত্তম বেসরকারি হাবীব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। জিন্নাহর উৎসাহদানে তিনি ব্যাংকটি গুজরাট থেকে করাচিতে স্থানান্তর করেন। ১৯৫৯ সালে সায়গল পরিবার ‘ইউনাইটেড ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করে। মুম্বাই, গুজরাট ও কলকাতা থেকে এসব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু তাদের সে প্রভাব ভারতের পুঁজিপতিদের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণী কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এবং শিল্প-পুঁজির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের বুর্জোয়া শ্রেণীর সবাই ছিল ব্যবসায়ী। এই পার্থক্যই ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য রচনা করে। পাকিস্তানের ব্যবসা পুঁজি রাষ্ট্র কর্তৃক উৎসাহিত হয়। মধ্য-সত্তর দশকের অল্প সময়ের সমাজতান্ত্রিক বিবৃতি ছাড়া পাকিস্তান ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেনি। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ভারতীয় শিল্প-পুঁজির বিকাশের জন্য যে কঠিন সংরক্ষণবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করেছিল, পাকিস্তানে তা হয়নি। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী প্রথম থেকেই উদার হাতে দরজা-জানালা খুলে দিয়েছিল। তারই ফলে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের বাজারে বিদেশি পণ্যের বন্যা বয়ে যায়। অন্যদিকে ভারতে ব্যবসায়-পুঁজির স্থান ছিল খুবই নিচে। সরকারের সমস্ত উদ্যোগ ছিল ব্যবসায়-পুঁজির টুঁটি টিপে ধরা, যেন বিদেশি পণ্যে ভারতের বাজার প্লাবিত হয়ে না যায়। বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় ভারতীয় নেতারা মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হননি।

চার
তীর্থঙ্কর রায় বাংলাদেশ পর্যন্ত আসেননি। কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি নিয়ে সামান্য আলোচনা না করলে প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে পূর্ব-পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ ব্যবসাপুঁজির অবাধ শোষণের চারণভূমি। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি দেশ ভাগের পর ভারতের মুসলিম ব্যবসায়ী গ্রুপ সব পশ্চিম পাকিস্তানে আস্তানা গড়ে তুলেছিল। তারাই পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে পাকিস্তানের ব্যাংক-বীমা-রাজধানীসহ অন্যসব ব্যবসায়-স্থাপনা পশ্চিম পাকিস্তানেই গড়ে উঠেছিল। দেশ ভাগের পর ইস্পাহানি, দাউদ, হাবীব, সায়গলদের মতো বড় প্রতিষ্ঠান পূর্ব-পাকিস্তানে আসেনি। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পেছনে সেই অর্থনৈতিক বৈষম্য বড় ভূমিকা পালন করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে যে সামান্য পুঁজি গড়ে উঠেছিল, বিশেষ করে ষাটের দশকে, তা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ ব্যবসা-পুঁজির অধীনস্ত। ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের সেই দুর্বল অধীনস্ত পুঁজি আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিল। যেমনটি দিয়েছিল ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী কংগ্রেসকে। পাকিস্তানের সেই দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণীর সাব-কন্ট্রাক্টররা স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে যারা পশ্চিম পাকিস্তানের হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন। তাই তারা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকে উদার হাতে সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদ নীতি তাদের সে আশায় ছাই ঢালে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলি জাতীয়করণ করতে প্রথম সরকারের কোন বেগ পেতে হয়নি। বাকশাল গঠনের পর তারা আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করেন। সেই সব রাষ্ট্রায়ত্ত স্থাপনা রাজনৈতিক পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেয়া হয়। তাদের অনেকেরই ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতগুলো অচিরেই দুর্নীতির শিকারে পরিণত হয়। শুরু হয় রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় বাংলাদেশে একটি ধনিক শ্রেণীর জন্ম প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি পায় বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর। জিয়া শুরু করেন বিজাতীয়করণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি পুঁজিপতি শ্রেণীর উত্থানের দ্বিতীয় পর্ব। এ সম্পর্কে রেহমান সোবহানের বক্তব্য ‘১৯৭৬ সালের দিকে একটি পুঁজিপতি শ্রেণী সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের নীতি হিসেবে বিচারহীনভাবে বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যথা বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা থেকে অবাধে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সরবরাহ করা শুরু হয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর অবিকশিত চরিত্র, ঋণ বণ্টনে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির ফলে বণ্টিত ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়।’ তিনি আরো বলেন, এই খেলাপি ঋণ সমস্যাটি বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রের কাঠামো সংকটে পরিণত হয়েছে। বিঘিœত হয়েছে পরিণত ও শক্তিশালী জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী গঠন প্রক্রিয়া।’ (বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকট, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০০৩)। উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পেয়েছি পাকিস্তানের ব্যবসায়ী পুঁজির শাসন। যে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারে ঢুকতে পেরেছে, তা সম্পূর্ণ বিদেশি সহায়তায় তাদেরই পুঁজির সাহায্যে গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে কম মূল্যে এদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সেই সস্তা শ্রমই বিদেশি পুঁজিকে এদেশে আসতে উৎসাহিত করেছে। মালিক শ্রেণী সেই নয়া-উপনিবেশবাদী পুঁজির দালাল ছাড়া আর কিছু না। তারা পরগাছা- তাদের অস্তিত্ব বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীল। তাই এদেশে দেশপ্রেমিক শিল্পপুঁজির বিকাশ ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশ আজ বিদেশি বিলাস দ্রব্যের বেহেশতে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর যে পরনির্ভরশীল ব্যবসায়-পুঁজি পাকিস্তানের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেখান থেকে সরে আসতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাই বাংলাদেশ নিজেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়ে চলেছে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/আরএ