বিবিধ প্রসঙ্গ

কোন বিষয়ে লিখব বুঝে উঠতে পারছি না। অনেক বিষয় সামনে আছে। গত লেখায় ভেতর থেকে দেখা সিপিবিকে নিয়ে কিছু লিখেছিলাম এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে লিখব বলে আশা প্রকাশ করেছিলাম। অনেকে নানা মাধ্যমে আমাকে এ বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন। কিন্তু ভেবেচেন্তে ঠিক করলাম সিপিবি নিয়ে লেখার আরো সময় পাওয়া যাবে। চোখের সামনে অন্য যে ইস্যুগুলো ঘুরছে আজ সেদিকেই মনোযোগ দেয়া যাক।

সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন অবসর যাপন করছে। অনেক ব্যর্থ আন্দোলন-সংগ্রাম করে তার ক্লান্ত। সহায়ক সরকার ছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না-এই গান শুনিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি না পারলেও সরকারকে চাপের মধ্যে রাখার জন্য নিত্যনতুন ইস্যু তৈরি হচ্ছে। কোনো ইস্যু সরকার নিজে তৈরি করছে আবার কোনোটা আচমকা এসে সরকারকে চেপে ধরছে। যেমন ধরা যাক চিকুনগুনিয়ার কথা। ওরে বাপ, এমন যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি, ভাবাই যায় না। আমি নিজে একমাসের বেশি সময় কাতরেছি। বিএনপির ধ্বংসাত্মাক আন্দোলনের চেয়ে চিকুনগুনিয়া মনে হয় মানুষের মনে বেশি আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য জাতীয় সংসদে বলেছেন চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। মন্ত্রী গণমাধ্যমকে অহেতুক আতঙ্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রী আরো বলেছেন, চিকুনগুনিয়ার কারণ যে এডিস মশা তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। এর দায়িত্ব কোনোভাবেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালের নয়। একজন ভুক্তভোগী বাসযাত্রী মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মন্তব্য করলেন: মামু, অহন কই যামু? এ বলে ওর দোষ, ও বলে এর। মাঝখানে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা জনগণের।

সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের খবর কয়েকদিন আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। স্বাভাবিকভাবেই দায় চাপছে সরকারের ওপর। কারা এই পাচারকারী? সরকার ঘনিষ্ঠদের দিকেই তো সন্দেহের চোখ যায়! অর্থমন্ত্রী অবশ্য সংসদে জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা পাচার নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর ‘অতিশয়োক্তি’। ওই একই কাহিনী। যত দোষ নন্দ ঘোষ। সব ঝুট হায়। কিন্তু মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য কোনটা? অর্থমন্ত্রীর বয়ান নাকি গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ? প্রশংসাসূচক সংবাদ বের হলে ঠিক আছে, আর একটু বিরুদ্ধে সংবাদ হলেই ‘বোগাস’-এই নীতি পরিহার করা উচিত।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের রায় সরকারের জন্য একটি চরম বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা সরকারকে একটা জব্বর ধাক্কা দিয়েছে। সংসদে এ নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছেন সরকারদলীয় সদস্যরা। বাইরে সরকারবিরোধীদের উল্লাস চাপা থাকছে না এই রায় নিয়ে সরকারবিরোধীরা ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে, করছে। নানা ধরনের কল্পগল্প ছড়ানো হচ্ছে। সরকার এবং সর্বোচ্চ আদালতের এই মুখোমুখি অবস্থানের সš§ানজনক নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, সেদিকেই এখন সচেতন দেশবাসীর দৃষ্টি।

সুন্দরবন-রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ইস্যুতেও সরকার খুব সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বলে মনে হয় না। ইউনেস্কোর অবস্থান নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বিরোধীদের মতামত উপেক্ষা করে সরকার সুন্দরবনের সন্নিকটে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে। সরকার সরকারের কাজ করুক। কিন্তু সবাইকে কেন সরকারের অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে? সব ব্যাপারেই সরকারের এত অসহিষ্ণুতা কেন? দুই-চার-ছয়শ’ লোকের প্রতিবাদ সমাবেশ কিংবা মিছিল কি সরকারের গদি টলিয়ে দেবে? সরকারের এত আতঙ্ক কেন? নারায়ণগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর সরকার সমর্থকদের হামলা এবং কয়েকজনকে আহত করার ঘটনাটির নিন্দা না করে পারা যায় না। এর আগেও রামপাল ইস্যুতে প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা হয়েছে। এসব থেকে বিরত না হলে সরকারকে এক সময় বড় ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

এবার চোখ ফেরাই এখন বহুল আলোচিত ইস্যু ফরহাদ মজহারের দিকে। ফরহাদ মজহারকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকীয়তা তিনি ভোরবেলা বাসা থেকে বের হয়ে অপহৃত হলেন। মোবাইল ফোনে স্ত্রীকে প্রথমে জানালেন অপহরণকারীরা তাকে মেরে ফেলবে। তারপর জানালেন ৩০ লাখ টাকা দিলে ওরা তাকে ছেড়ে দেবে। আরো পরে এই টাকার পরিমাণ আরো কমিয়েও বলেছেন। কিন্তু টাকা কোথায় কীভাবে দিলে তার মুক্তি মিলবে সেটা তিনি বলেন। যা হোক সারাদিন এ নিয়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক গসিপ চলল। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হামলে পড়ল। মুক্তচিন্তার পক্ষে যারা তারাও মনে করলেন ফরহাদ মজহারের অবস্থান যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে, তাই তার অপহরণের পেছনে না থেকেই পারে না। ২৪ ঘণ্টা সময় পার হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফরহাদ মজহারকে যশোর থেকে উদ্ধার করল। তাতে স্বস্তি গেলেও সামনে এলো অসংখ্য প্রশ্ন। আশা করা হয়েছিল, যেমন দ্রুততার সঙ্গে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে, তেমন দ্রুততার সঙ্গেই ঘটনার রহস্যোদ্ঘাটন করে পুলিশ তাদের সক্ষমতা ও পারদর্শিতার প্রমাণ দেবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও তাদের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে যেসব গল্প ছাপা হচ্ছে তা অনেকের কাছেই বিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে না। এক নারীর জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী তাকে টাকা দেয়ার জন্যই ফরহাদ মজহার অপহরণ নাটক সাজানো হয়েছে। ফরহাদ মজহারকে যারা একটু ভালোভাবে জানেন, তারা এটাও জানেন যে তিনি নাটকীয়তা পছন্দ করেন। এটা কি তার সাজানো নাটক? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। আবার এ প্রশ্নও সামনে আসছে, তদন্তকারীরা শেষে যা বলবেন সেটা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে তো? এই হয়েছে এক জ্বালা। আমরা পুলিশের কাছে নির্ভরতাও চাইব আবার তাদের কথা বিশ্বাসও করতে চাইব না।

ফরহাদ মজহার নিজে যে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাতে তিনি সম্ভাব্য অপহরণকারী হিসেবে ‘সরকারকে যারা বিব্রত করতে চায়’ তাদের কথা বলেছেন। ফরহাদ মজহার যে রাজনৈতিক দলের গুণগ্রাহী সেই বিএনপি নেতারা ক্রমাগত বলছেন, ফরহাদ মজহার অপহরণ নাটক সরকারেরই সাজানো। তাহলে তো এটাই দাঁড়ায় যে, সরকারই সরকারকে বিব্রত করার জন্য এই নাটক সাজিয়েছে। এটা কি হতে পারে? কী জানি বাপু সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে সবই হতে পারে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফরহাদ মজহারের প্রশংসা করে অনেক কথার সঙ্গে এটাও বলেছেন যে, তিনি একজন বড় দার্শনিক। তা, তার দর্শনটা কী, মানব জাতির কোন উপকার তার দর্শন থেকে হয়েছে সেটা যদি একটু বিস্তারিত বলতেন তাহলে আমপাবলিকের একটি বুঝতে সুবিধা হতো। এটা ঠিক, ফরহাদ মজহারের কিছু সমর্থক আছেন। তবে এর চেয়ে বিরোধীর সংখ্যাই মনে হয় বেশি। তিনি নিঃসন্দেহে একজন চিন্তাশীল মানুষ। কিন্তু তার চিন্তা কারো উপকারে না লাগলেও অপকারে লাগে। ফরহাদ মজহারকে নিয়ে রহস্য জাল বিস্তার হতে না দিয়ে এটা গুটিয়ে ফেলাই হবে বিচক্ষণতার পরিচায়ক। সরকার সমস্যা জিইয়ে রেখে সেটা নিয়ে বিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে, না সমস্যা সমাধানে ব্রতী হবে- সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.