বিপন্ন গণতন্ত্র ও রাজা চার্লসের শিরশ্ছেদ

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের ফলে গণতন্ত্র বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। গণতন্ত্র নামক বিমূর্ত শাসন কাঠামোটি যেন ক্রমশ অন্ধকারের অতল তিমিরে তলিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৪ সালে আরেল্ড লিজফার্ট নামে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের পরিবেশকে ভিত্তি করে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। ওই সমীক্ষায় বিগত শতাব্দীর অষ্টম দশককে বাংলাদেশের জন্য একটি বন্ধ্যা দশক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। অথচ এই আশির দশক থেকে বিশ্বময় সূচিত হতে থাকে গণতন্ত্রের বিজয়। ওই দশকের শেষ প্রান্তে পূর্ব ইউরোপ একনায়কত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে শুরু করে গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা। একদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে সূচিত হয় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। গণ-অধিকার নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। চেক রিপাবলিক, স্তোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড একনায়কতন্ত্রের কবল থেকে আজ মুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ক ও গ্রিস সামরিক শাসন থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্রের পালে লেগেছে নতুন হাওয়া। ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর নতুন আলোকে উজ্জ্বল। নেপালে নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের শুভ সূচনা হয়েছে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় দলীয় আধিপত্যের কবল থেকে গণতন্ত্র বিকশিত হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকায়ও শুরু হয়েছে গণতন্ত্রের উৎসব। মেক্সিকো, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, কোস্টারিকায় জনগণের অধিকার আজ অপ্রতিরোধ্য। অন্যদিকে আরব বসন্তের হাওয়া উড়িয়ে নিয়েছে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ-মিসর, লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার একনায়কতন্ত্রের দুর্বৃত্তায়িত শাসন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ বিপর্যস্ত। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসককে হঠিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমরা সবাই ভেবেছিলাম সেই গণতন্ত্র ক্রমশ আরও সুদৃঢ়, সুসংহত ও টেকসই হবে। কিন্তু ১৯৯০ থেকে এ পর্যন্ত গণতন্ত্র অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও আজ মনে হচ্ছে এটি একেবারে শুয়ে পড়েছে মাটিতে। অথচ যাদের জন্য গণতন্ত্রের এই অবস্থা, পূর্বাপর তাদের মুখেই সর্বদা ধ্বনিত হতো-ওয়েস্ট মিনস্টার পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। অনেকটা আক্ষেপের সঙ্গেই বলতে হয় সরকারের সেসব কর্তা ব্যক্তির যদি এতটুকু ইতিহাসবোধ থাকত, তবে তারা ইতিহাস ঘেঁটে জেনে নিতেন ওয়েস্ট মিনস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্রের জন্ম ইংল্যান্ডে কীভাবে হয়েছিল? কী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল বিশ্বের প্রথম সার্থক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। যার একদিকে ছিলেন স্বৈরাচারী, জনগণবিরোধী, খামখেয়ালি রাজা প্রথম চার্লস, অন্যদিকে গণতন্ত্রকামী জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত রাজনীতিক অলিভার ক্রমওয়েল।

পাঠকদের আমি এখানে এমন একটি সময়ের কাহিনী শুনাচ্ছি, যখন বিশ্বজুড়ে রাজতন্ত্রের মহোৎসব ও জয়-জয়কার। সে সময়টায় ভারতের মসনদে সিংহাসন আলোকিত করে বসে আছেন সম্রাট শাহজাহান। ইরানের সিংহাসনে বাদশা দ্বিতীয় শাহ আব্বাস। তুরস্কে অটোম্যান সম্রাট ইব্রাহিম পাশা। ফ্রান্সের সিংহাসনে ছিলেন রাজা তেরোতম লুই ও চীনে মিং ডাইনেস্টির সম্রাট চোংঝেন। অর্থাৎ এ কথা বলা যায়, পৃথিবীর মানুষ তখন গণতন্ত্রের নামই শোনেনি, এটি বাস্তবায়ন করা তো অনেক দূরের কথা। ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র হটিয়ে চার বছরব্যাপী (১৬৪২-৪৬) রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংসদীয় গণতন্ত্রের উšে§ষ পর্ব শুরু হয়েছিল একটি ক্ষুদ্র ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৬৪২ সালের শীত ঋতুর শুরুতে স্কটল্যান্ড হঠাৎ করেই ইংল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা করে। আক্রমণের এই সংবাদ পেয়ে রাজা প্রথম চার্লস ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান আর্ল অব স্ট্যাফোর্ড, লর্ড থমাসকে ডেকে পাঠান। লর্ড থমাস স্ট্যাফোর্ড রাজা চার্লসের একজন অন্যতম উপদেষ্টা। স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ড আক্রমণ করার জন্য ইংল্যান্ডের সীমান্তে তাদের সৈন্যসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে। এ অবস্থায় রাজা চার্লসের কী করণীয় সে সম্পর্কে চার্লস তার অন্যতম সামরিক উপদেষ্টা লর্ড থমাস স্ট্যাফোর্ডের কাছে জানতে যান। লর্ড স্ট্যাফোর্ড চার্লকে এই বলে আশ্বস্ত করেন, তাকে যদি পর্যাপ্ত অর্থ ও মাস খানেক সময় দেওয়া হয় তবে তিনি তিন হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে স্কটল্যান্ডের পথে রওনা হবেন। লর্ড স্ট্যাফোর্ডের মুখে পর্যাপ্ত অর্থের কথা শুনে রাজার গৌরবর্ণ মুখটি শুকিয়ে একেবারে চুন। তিনি লর্ড স্ট্যাফোর্ডকে উদ্দেশ করে বললেন, সামরিক বাহিনীর অর্থ ছাড়ের জন্য পার্লামেন্টের অনুমতি নিতে হবে। পার্লামেন্টের কাছ থেকে অনুমতি? অনুমতির কথাটি শুনে সত্যি বেশ আশ্চর্যান্বিত হন লর্ড স্ট্যাফোর্ড। রাজা চার্লসের পাশেই বসেছিলেন তার আরেক উপদেষ্টা অ্যাডওয়ার্ড হাইট। তিনি লর্ড স্ট্যাফোর্ডকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি অনেক দিন ইংল্যান্ডের বাইরে আছেন। তাই হয়তো আপনার জানা নেই যে, এখন যে কোনো অর্থ ছাড়ের জন্য পার্লামেন্টের অনুমতি নিতে হয়। লর্ড স্ট্যাফোর্ড রাজাকে বললেন, আপনি কি ভিক্ষুক যে পার্লামেন্টের কাছে অর্থভিক্ষা চাইবেন? আমাকে আদেশ করুন আমি কামানের গোলা দিয়ে পার্লামেন্ট উড়িয়ে দেই। রাজা চার্লসও মনে মনে এমন তোষামুদে লোকই খুঁজছিলেন এবং সহসাই যেন তার সেই কাক্সিক্ষত পুরুষটিকে রাজা পেয়েও গেলেন। রাজা বললেন, এবারের মতো বিলটি পাস করিয়ে নেওয়া যাক, তিন হাজার সৈন্য তৈরি করে তারপর পার্লামেন্টকে শায়েস্তা করা যাবে। রাজার আদেশে তিন হাজার সৈন্য সংগ্রহের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি প্রস্তাব আকারে পার্লামেন্টে তোলা হলো। পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে অলিভার ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে পাঁচজন সংসদ সদস্য রাজার সঙ্গে দেখা করে তাকে জানালেন, রাজা যদি তার সব প্রশাসনিক ক্ষমতা পার্লামেন্টের কাছে সমর্পণ করেন, তবে পার্লামেন্ট এই অর্থ ছাড়ে সম্মত আছে। রাজা অলিভার ক্রমওয়েলের কাছে জানতে চাইলেন সেই শর্তগুলো কী কী। অলিভার ক্রমওয়েলের সেই শর্তগুলোর মধ্যে তিনটি শর্ত ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক. লিবার্টি অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাধীনতা, দুই. ফেয়ার ট্রায়াল অর্থাৎ ন্যায়বিচার, তিন. সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যকর পার্লামেন্ট। ক্রমওয়েল রাজাকে উদ্দেশ করে বলেন, ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নিতে রাজতন্ত্র এখন অচল আর সে জন্য ডেমোক্রেসি অর্থাৎ গণতন্ত্রই পারে ইংল্যান্ডকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে।

রাজা চার্লস বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন, গণতন্ত্র তো সেই জিনিস, যা গ্রিসের কিছু মূর্খ প্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন। যারা মনে করতেন, একজন সম্ভ্রান্ত লর্ড ও একজন কৃষক কিংবা শ্রমিক সমপর্যায়ের। অলিভার ক্রমওয়েল বললেন-আপনি একজন কৃষক কিংবা শ্রমিককে যেভাবে বিদ্রƒপ করছেন তাতে মনে হয়- আপনি ভুলে গেছেন, আপনার ভোগবিলাসের প্রতিটি কড়ির জোগান দেওয়া হয় তাদের দেওয়া ট্যাক্সের পয়সা থেকে। রাজা চার্লসের কিছু উপদেষ্টা বিশেষ করে লর্ড স্ট্যাফোর্ড ও অ্যাডওয়ার্ড হাইট রাজাকে বিশেষভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন, এ মুহূর্তে সেই সংসদীয় কমিটির পাঁচ সদস্যকে যে করেই হোক এরেস্ট করতে হবে। চার্লস সেই সংসদীয় কমিটির পাঁচ সদস্য-অলিভার ক্রমওয়েল, জন পিম্প, হেনরি আর্টন, জন হ্যামডন ও আর্থার হ্যাজলরিগ এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে এরেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করলেন এবং সেই সঙ্গে পার্লামেন্টও ভেঙে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধ শুরু হতে না হতেই পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পার্লামেন্টের এক আদেশে মুণ্ডু হারালেন রাজার ধূর্ত ও কপট উপদেষ্টা লর্ড স্ট্যাফোর্ড। ইংল্যান্ডের গণতন্ত্রের জন্য এই গৃহযুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল সুদীর্ঘ চার বছর। রাজা চার্লসের বিরুদ্ধে জনসাধারণের পক্ষের শক্তির নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল ফায়ার ফক্স ও উপ-সেনা প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন অলিভার ক্রমওয়েল। এবার ক্রমওয়েল সম্পর্কে একটু জানা যাক, ক্রমওয়েলের পিতৃ পুুরুষ ছিলেন কেমব্রিজের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও শীর্ষ দুই ধনী ব্যক্তির একজন। সেই সঙ্গে তাদের পুরো পরিবারটি ছিল ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একটি পরিবার। ক্রমওয়েলের পিতামহ স্যার হেনরি উইলিয়াম, পিতা রবার্ট উইলিয়াম, ক্রমওয়েল নিজে ও তার পুত্র রিচার্ড-এই চারজনই ছিলেন লিংকন্স ইন থেকে পাস করা ব্যারিস্টার ও আইনজ্ঞ। ব্যারিস্টারি পাস করার আগে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখাপড়া করেছিলেন। দীর্ঘ চার বছর গৃহযুদ্ধে নিহত হয়েছিল ইংল্যান্ডের হাজার হাজার নাগরিক। অবশেষে ১৬৪৩ সালে রাজা প্রথম চার্লস অলিভার ক্রমওয়েলের কাছে পরাজিত ও বন্দী হন। রাজা প্রথম চার্লসের দুই পুত্র যথাক্রমে দ্বিতীয় চার্লস, জেমস ও স্ত্রী হেনরিয়েটা মারিয়া ফ্রান্সে আশ্রয় নেন। অলিভার ক্রমওয়েল বন্দী রাজাকে নানাভাবে অনুরোধ, উপরোধ করতে থাকেন যে, তিনি যেন ইংল্যান্ডের শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে মেনে নেন। রাজা চার্লস বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে সময়ক্ষেপণের আশ্রয় নেন। কিন্তু আসলে তিনি ভেতরে ভেতরে ফ্রান্স ও স্কটল্যান্ডের রাজাদের সঙ্গে আঁতাত ও ষড়যন্ত্র করে আরেকটি গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অলিভার ক্রমওয়েল সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজাকে বাঁচিয়ে রাখলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। ক্রমওয়েল খুব দ্রুত পার্লামেন্টের একটি অধিবেশন ডাকলেন এবং রাজা চার্লসকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে মর্মে একটি বিলও পাস করিয়ে নেওয়া হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। বিচারটি অনুষ্ঠিত হলো খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে। বিচারে রাজা চার্লসের শিরñেদের আদেশ হলো এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো ১৬৪৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। চার্লসের শিরñেদের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘটল একটি মজার ঘটনা। অলিভার ক্রমওয়েলকে রাজার অনুসারীরা চল্লিশ হাজার পাউন্ড উৎকোচ দিতে চেয়েছিল। যাতে করে রাজার শিরñেদ আদেশটি স্থগিত হয়। সেই সময়ের চল্লিশ হাজার পাউন্ড মানে হচ্ছে এ সময়ের প্রায় শত কোটি টাকার সমান। কিন্তু অলিভার ক্রমওয়েল ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, আজ যদি আমি ঘুষ নিয়ে এই দুষ্কর্মটি করি, তবে ইতিহাস আমাকে ক্ষমা করবে না। অলিভার ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের লর্ড প্রটেক্টর হিসেবে প্রায় সাত থেকে আট বছরের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডকে সত্যিকার অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়েছিলেন। তবে কাহিনী এখানেই শেষ হলেই বোধকরি ভালো হতো। অলিভার ক্রমওয়েলের মৃত্যু হয় ১৬৫৮ সালে। তার মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডের জনগণ প্রথম চার্লসের পুত্র ফ্রান্সে নির্বাসনে থাকা দ্বিতীয় চার্লসকে এনে ক্ষমতায় বসালেন।

রাজা দ্বিতীয় চার্লস সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল তার বাবার হত্যাকারীদের বিচার করা। রাজা দ্বিতীয় চার্লস অসম্ভব বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। তিনি কিছুতেই ইংল্যান্ডের মাটিতে আর রক্তপাত চাচ্ছিলেন না। কিন্তু ভাই জেমস ও তার মা হেরনিয়েটা মারিয়ার মাত্রাতিরিক্ত চাপে কতিপয় ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে হলো ঠিকই। কিন্তু তিনি তার মা ও ভাইকে সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে আর রক্তপাত ঘটাবেন না। তিনি তার পিতার হত্যাকারীদের ক্ষমা করে দিচ্ছেন এ কারণে যে, তিনি ইংল্যান্ডে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখতে চান। তিনি তার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন যে- রক্তপাত আরও অনাকাক্সিক্ষত রক্তপাত ডেকে আনে। এই উদারতা ও বিচক্ষণতার জন্য তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে রাজত্ব করেছিলেন। তবে অলিভার ক্রমওয়েলের পর ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র আর আগের চেহারায় ফিরে আসেনি। ক্রমওয়েলের এ আন্দোলনের হাওয়া ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপজুড়ে। রাজা প্রথম চার্লসের শিরñেদের প্রায় দেড়শ বছর পর ফরাসি বিপ্লবের আন্দোলনের মুখে শিরñেদ ঘটে ফ্রান্সের রাজা অষ্টদশ লুইয়ের। এর পর আমেরিকার বিপ্লবের ফলে স্বাধীনতা পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় সেখানেও। অন্যদিকে রাশিয়ায় বিপ্লবের ফলে জারের একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে প্রতিষ্ঠিত হয় জনগণের সরকার।

এবার বাংলাদেশের বিপন্ন গণতন্ত্রের বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক। নির্বাচনের পূর্বাপর পরিস্থিতি নিয়ে কথা হচ্ছিল আমার এক অগ্রজ অ্যাডভোকেট বন্ধুর সঙ্গে, নারায়ণগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান তিনি। যার পুরো পরিবার আওয়ামীপন্থি। এ ব্যক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে-এক. তিনি একজন শহীদ পরিবারের সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি তার বাবা ও চাচা দুজনকেই একসঙ্গে হারিয়েছেন। দুই. তিনি একজন নিবিষ্ট পাঠক। অসাধারণ পড়–য়া একজন মানুষ। নানা বিষয়ে তার জ্ঞান সীমাহীন। কিন্তু পড়তেই ভালোবাসেন, লিখেন না কিছুই। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কটি কড়া-মিঠে ও অম্ল মধুর। কিছু কিছু বিষয়ে আমরা একমত হই, যা হোক তিনি বর্তমান সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে মহা বিরক্ত। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি নাখোশ কেন? আপনি তো আওয়ামীপন্থি মানুষ। তিনি আমাকে বললেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা হচ্ছে গণতন্ত্র। আজ আমি কি একজন শহীদের সন্তান হয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মতামতের মূল্য না দিয়ে আমার চাওয়াটাকেই শুধু প্রতিষ্ঠিত করতে চাইব? আমাকে বলতেই হয় যে, ছাত্রদল, যুবদল, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের বাইরেও একটি বিষয় থাকে। আর সেটি হচ্ছে ন্যায়লীগ। আমরা নিজেকে যারা আলোকিত হিসেবে ভাবতে চাই তাদের এ বিষয়গুলো ভুললে চলে না। আমি বললাম, আপনি হয়তো একজন আলোকিত মানুষ, সে জন্য এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ধরতে পারছেন, কিন্তু দেশের মানুষকে বোঝাবেন কীভাবে? তিনি বললেন, শ্রদ্ধাভাজন প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার একটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য- ‘কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য, সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য; কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না। বর্তমান সরকার বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কতটুকু বোকা বানাচ্ছে, তা ইতিহাসই বিচার করবে। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। ইতিহাস কারও প্রতি এতটুকু সহানুভূতি প্রদর্শন করে না।

পাদটীকা : প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব ৫০৮ সালে এথেন্সে যে তিনজন বড় আইনপ্রণেতার আবির্ভাব হয়, তাদের অন্যতম ছিলেন ক্লিসথেনিস। অন্য দুজন ছিলেন সলোন এবং পেরিক্লিস। অভিজাত বংশে জš§ হওয়া সত্ত্বেও ক্লিসথেনিস এবং সলোন এবং একটি সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে সব মানুষই হবে সমান। ক্লিসথেনিসের নতুন ধরনের এ সরকার চালু হয় এবং সেই সঙ্গে বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র সৃষ্টি হয় গ্রিসের ছোট একটি শহর রাষ্ট্র এথেন্সে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, গ্রিসের প্রাচীন ও সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটল তিনজনই গণতন্ত্র শাসন কাঠামোটির কঠোর সমালোচক ছিলেন। আর ইতিহাসও তাদের এ জন্য এতটুকু ক্ষমা করেনি। তারা তিনজনই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন গণতন্ত্রের খলনায়ক হিসেবে।
লেখক: গল্পকার এবং সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী

মানবকণ্ঠ/এসএস