বিদেশনির্ভর হচ্ছে বিএনপি

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছে বিএনপি। এতে করে বিএনপি মনে করছে রাজনৈতিকভাবে সরকারকে চাপে ফেলা সম্ভব। সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপ সৃষ্টি হলে তারা লাভবান হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে। দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কেউ কেউ এমন দৃষ্টি আকর্ষণকে ফায়দা হিসেবে দেখছেন। তারা এও মনে করছেন, যে কোনোভাবে হোক না কেন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে হবে। এ জন্য যে ধরনের কূটনৈতিক চাল প্রয়োজন তা চালিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এ মুহূর্তে ‘মাঠে খেলার’ মতো বিএনপি ও তার সঙ্গে থাকা মিত্র কয়েকটি দলের তেমন পরিস্থিতি নেই। আবার তাদের ভেতরেও ‘গৃহপালিত নেতা’ পুষছে সরকার এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থা। যে কারণে বিএনপি ও তার সঙ্গের দলগুলোর সব তথ্য আগাম জেনে যাচ্ছে সরকারের সংস্থাগুলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ২০১৫ সালে জ্বালাও-পোড়াও পরবর্র্তী ধারাবাহিক বিভিন্ন ধর্মের এবং বিদেশি নাগরিক হত্যার মাধ্যমে বিএনপি সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছিল। যে সন্ত্রাসের সঙ্গে বিদেশি গোষ্ঠীর হাত ছিল। এ জন্য বাংলাদেশকে অস্থির সময় পার করতে হয়েছে। এবারো বিএনপি মনে করছে তারা বিদেশিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা বিদেশে দেয়া হয়েছিল সেটার পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর বিদেশ নির্ভরের জায়গায়টা সংকুচিত হয়েছে। তবে তারা ফের বিদেশ নির্ভর হতে এখন অনেকখানি তৎপর।

জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ আরো মনে করেন, রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে জঙ্গিরা উৎসাহ পায়। আর তখনই সুযোগ নেয় চক্রান্তকারী। এ ধরনের সুযোগ তৈরির জন্য দেশীয় এজেন্টদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ষড়যন্ত্রকারী একজোট হয়ে কাজ করে থাকে। তবে বাংলাদেশ নিয়ে যতবারই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, ততবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশিদের পক্ষে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল। এতে করেও জঙ্গিগোষ্ঠী উৎসাহী হয়েছে। সরকারের পতনের জন্য যত ধরনের কৌশল দরকার ছিল চক্রান্তকারীরা তা করেছে।

নজরদারি করা একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, তারা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের চার নেতার ওপর পুরোপুরি খেয়াল করছেন। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার আগ মুহূর্ত থেকে এ চার নেতা নানা ধরনের ফন্দি-ফিকিরে লিপ্ত আছেন। তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মনগড়া তথ্য বোঝানোর চেষ্টা করছেন। তালিকায় আছেন এক শীর্ষস্থানীয় সুশীলও। বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে এই সুশীল লাগাতার অপপ্রচার চালিয়ে সরকারকে কোণঠাসা করার ব্যর্থ চেষ্টা চালান। এ ব্যক্তির অপতৎপরতা এখনো থেমে নেই।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, সরকারবিরোধী অপপ্রচারের জন্য দু’জন নেতা বিদেশ সফরের চেষ্টা করছেন। তারা মনে করছেন বিদেশে তাদের যে মিত্র আছে তারা সহযোগিতা করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা প্রবাসী ব্যবসায়ীদের দু’একজন আছেন যারা বিএনপির সঙ্গে সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারেন। তবে সরকার সব ধরনের অপপ্রচারের ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থে যা যা করণীয় দরকার তাই করবে। এতে করে যে মাত্রার অভিযান প্রয়োজন তাও চালানো হবে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবীর যেসব দেশে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব জড়িত আছে সেখানেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতার যোগসূত্র তৈরি করতে কেউ কেউ তৎপর রয়েছে। এ চক্র বাংলাদেশকেও লক্ষ্য করেছিল। সেই প্রচেষ্টা যে এখনো থেমে নেই তা বলা যাবে না। স্বার্থ হাসিলের জন্য সংশ্লিষ্টরা তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা কোনো কোনোভাবে এখনো সক্রিয় আছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালে ৯২ দিনের ককটেল-পেট্রলবোমা নিক্ষেপ ও আগুন-সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র এবং অস্থিতিশীল চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারপর ভিন্ন কায়দায় পুরোহিত, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিয়া, পীর, ওলামা, মাশায়েখ, খাদেম ও বিদেশি নাগরিককে হত্যার মাধ্যমে যে নাশকতা চালানো হয়, এর পেছনে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হয়েছিল। সর্বশেষ সরকার পতনের জন্য বড় ধরনের হামলা চালাতে লক্ষ্যবস্তুতে আনা হয় বিদেশিদের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন দেশের নাগরিককে হত্যা করা হয়। আর এসব করার পেছনের কারণ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের এজেন্টেদের এ দেশে অধিষ্ঠিত করা। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ সতর্কতার কারণে সব ধরনের ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের জন্য মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। এ বৈঠকের তথ্য-প্রমাণ সরকারের কাছে আছে। এর আংশিক গণমাধ্যমে প্রকাশও হয়। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি ও তাদের একটি মিত্র দলের এক নেতা সরকার উৎখাতে নানা ধরনের কৌশল নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি জেনে যাওয়ায় সরকার সবকিছু মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও করে অসংখ্য মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরও যখন সরকারবিরোধীরা ব্যর্থ হলো, তখন তারা বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণে হামলা শুরু করল। যার ফলশ্রতিতে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের চলাফেরায় কথিত সতর্কবার্তাও জারি করেছিল। সরকারের যারা ভালো চায় না তারা এবারো একই কৌশল নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তারা বিদেশিদের ওপর ভর করছে। গোয়েন্দারা অবশ্য এসব বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, কোনোভাবে এবার জ্বালাও-পোড়াও হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে যে ধরনের কৌশল নেয়া দরকার তা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। তার মতে, রাজনৈতিক সংকট তৈরির সুযোগ নেয় উগ্রপন্থি-জঙ্গিরা। অবশ্য উগ্রপন্থিদের সঙ্গে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো কোনো পক্ষের সরাসরি, দূর নিয়ন্ত্রিত এবং অপ্রকাশ্য যোগাযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, বাংলাদেশে আইএস আছে বলে বারবার যারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল তাদের সেই চেষ্টা এখনো থেমে নেই। তাই বিষয়টিকে মোটেই খাটো করে দেখার কিছু নেই। এ কারণে সরকার আন্তর্জাতিক মানের ইন্টিলিজেন্স আরো বাড়িয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। বিএনপি-জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপতৎপরতা এবং ষড়যন্ত্রে যা যা করণীয় দরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাই করা হবে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের প্রয়োজনী পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.