বিগো লাইভ ভয়ঙ্কর নেশা

বিগো লাইভ ভয়ঙ্কর নেশা

ভয়ঙ্কর এক নেশা। আসক্ত হচ্ছে অনেকেই প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। রাত যত বাড়ে; এই নেশায় মগ্ন হতে থাকে তরুণ প্রজন্ম। শুধু তারুণ্যই নয়, সব বয়সী মানুষ ভার্চুয়াল জগতের এই নেশায় পা বাড়াতে শুরু করেছে।

রাত ১টা। বিগো লাইভে চলছে নগ্নতার মহোৎসব। বিকাশে টাকা পাঠাও! আমাকে কে কে চাও! আবার কেউ কেউ বলছে আমাকে পেতে খুব বেশি টাকা লাগবে না, এক হাজার টাকা দিলেই হবে! বাড়ছে রাত, বাড়ছে অশ্লীলতা। ঘড়ির কাঁটা ঠিক দু’টার ঘরে। বিগো লাইভে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী সরব। গানের তালে শরীর প্রদর্শন করছে স্বল্পবসনা। অনেকের শরীরে নেই কোনো কাপড়। আবার কারো কারো মুখে দুর্দান্ত মেকআপ। কণ্ঠে ভয়াবহ সব অশ্লীল কথা।

লাইভের দর্শকদের আহ্বান করা হচ্ছে, বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাও। তাহলে আমার নগ্ন শরীর দেখতে পাবে। আমি তোমাদের ইমো বা ওয়াটসঅ্যাপ অথবা ভাইবারে নম্বর দেব সেখাকে নক করো তাহলেই আমাকে পাবে। ঘোষণার একটু পরপর পর্দার আড়ালে চলে যায় তরুণী।

বিগো লাইভের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা ভিডিও কলে লাইভ কথা বলি। আবার দূরে যারা থাকেন, তাদের সঙ্গেও জরুরি কথা বলি। অনেক দিন বাড়ির বাইরে, পরিবারের বাইরে যারা রয়েছে, প্রযুক্তির উন্নয়নে আমরা লাইভে কাছাকাছি চলে যাচ্ছি তাদের কিন্তু এই লাইভ ভিডিও কল কখনো কখনো সময় কাটানোর জন্য কিংবা মাস্তি সময় উপভোগ করার জন্য ব্যবহার হয়। বিগোর মতো অ্যাপসকে ব্যবহার করছে অনেকে সে কাজে। আর এই বিগো লাইভ অ্যাপ ব্যবহার করে এক শ্রেণির মেয়ে প্রতিদিন রাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রবাসী তরুণদের কাছ থেকে। তরুণদের যৌনতার ফাঁদে ফেলে তারা কৌশলে বিকাশে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে।

বিদেশে এমন ঘটনা হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে শুরু হয়েছে। ভার্চুয়াল জগতের এই নেশার মায়াজাল বিগো লাইভ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেহ প্রদর্শন করছে বাংলাদেশের তরুণীরা। যার মাধ্যমে ফোন সেক্সে যুবকদের আকৃষ্ট করছে তারা। টাকার বিনিময়ে ইমো, হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ভাইবারে হচ্ছে এই ফোন সেক্স। বিগো লাইভের মাধ্যমে এই যৌন ব্যবসার মূল টার্গেট প্রবাসীরা। টাকার বিনিময়ে মোবাইল ফোনে সাময়িক যৌন চাহিদা মেটাচ্ছে তারা। প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশি যুবকদের কাছে এই অ্যাপটি দিন দিন ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে।

ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইন্টারনেট কোম্পানি বিগো টেকনোলজি ২০১৬ সালে বিগো লাইভ চালু করে থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ডে বর্তমানে ‘অ্যাপল স্টোর’ ও ‘গুগল প্লে স্টোরে’ এই অ্যাপসটি র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে। থাইল্যান্ডে ভার্চুয়ালি যৌনতার বিস্তারে এই অ্যাপটি ব্যাপকহারে ব্যবহƒত হচ্ছে। থাইল্যান্ডের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বিগো লাইভ।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী এই অ্যাপে সময় কাটাচ্ছে। যদিও অ্যাপটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যে কোনো ধরনের পর্নোগ্রাফি ও নগ্নতা বিগো লাইভে নিষিদ্ধ। এসব কর্মকাণ্ড ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট আইডি ব্যান হতে পারে। তাই এই অ্যাপে সরাসরি যৌন কার্যক্রম চলে না। এটি ব্যবহার করে মূলত যৌনতার ফাঁদ তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, বিগো লাইভ যৌন ব্যবসার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত বিগো লাইভের বেশিরভাগ আইডি ফলো করে দেখা গেছে, রাত বাড়লেই অশ্লীল কার্যকলাপে মেতে উঠছেন এসব ব্যবহারকারী। তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শত শত তরুণ-তরুণী। ডিজিটাল যৌনপল্লী পরিণত হয়েছে এই অ্যাপটির মাধ্যমে। ১ ঘণ্টা কথা বলতে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করছে অনেকে।

জেসমিন পুনম, বেবি, ফারিহা, সুন্দরী রুমী, মেঘ বালিকা, অর্পিতা, ফ্রি কুইন, নীল সায়লা, অর্থি খান, শ্যামা চৌধুরী, কুমকুম, নিঝুম রাতের সুমি, রুপা, পুষ্প, জিনিয়া খান মিম, সোনালি কারিনা, হট গার্ল, মৌসুমি চৌধুরী এমন নামে বেনামে আইডি খুলে বিগো লাইভের মাধ্যমে অশ্লীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এর মধ্যে কয়েকটি আইডিতে নারী বেশে প্রবাসীদের মনোরঞ্জন করছেন বাংলাদেশের হিজড়ারা। যাদের মূল টার্গেট প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি যুবকরা। বিগো লাইভে যারা নিজেকে প্রদর্শন করে তাদের বলা হয় ব্রডকাস্টার। লাইভ রুমে যারা দর্শক থাকে তাদের গেস্ট বলে। গ্রুপ করেও অনেক সময় একাধিক ব্যবহারকারী ব্রডকাস্ট করে। ব্রডাকাস্টাররা ইচ্ছেমতো গেস্টদের লাইভে সংযুক্ত করে।

বাংলাদেশ থেকে মাঝরাতে বিগো লাইভে ব্রডকাস্টার ছিল এক হিজড়া। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী। তার দর্শক ছিল ৮৯৩ জন। হিন্দি গানের তালে তালে শরীর দোলাতে থাকে। দর্শকরা একের পর এক অনুরোধ করে তার কাপড় খুলতে। একপর্যায়ে এক যুবক নগ্ন হওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা অফার করে। বিগোতে নগ্ন হলে আইডি ব্যান হতে পারে। তাই ওই যুবককে ইনবক্সে যেতে বলে।

একই সময়ে বিগো লাইভে ব্রডকাস্টার ছিল অর্পিতা। তার চেহারা না দেখা গেলেও কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল। লাইভ শেয়ার দাও, ইনবক্সে ইমো নম্বর দাও বলে চিৎকার করছিল। চেহারা আড়াল করে ব্রডকাস্টে পাওয়া যায় আরেক ব্রডকাস্টারকে। লাইভে সে জানায় তার বয়স ২১, বাসা ঢাকায়। তার সঙ্গে যারা ফোন সেক্স করতে আগ্রহী তাদের ইমো নম্বর ইনবক্স করতে বলে। এ জন্য নিজের ফোন নম্বর লাইভে ব্রডকাস্ট করে।

অ্যাপসটিতে একইসঙ্গে টেক্সট ও ভিডিও চ্যাট করা যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে একটি বোর্ডে (ভিডিও চ্যাটে) যুক্ত হতে পারেন আটজন পর্যন্ত। তারা একইসঙ্গে নিজেদের দেখতে ও শুনতে পারেন। এ ছাড়া তাদের চ্যাটিং (ভিডিও) দেখতে পারেন অ্যাকাউন্টধারী যে কেউ।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অশ্লীল গল্প, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করা হচ্ছে এখানে। অনেকেই খুঁজতে থাকেন প্রতারণার সুযোগ। কেউ ফাঁদে পা দিলেই তার সর্বস্ব লুটে নেয়ার উপায়ও তাদের জানা রয়েছে। শুধুমাত্র সময় কাটানো কিংবা আগ্রহের বসে অ্যাপসটি ইনস্টল করে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় প্রতারিতরা অ্যাপসটি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মূলত উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী, প্রবাসী, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একাকীত্ব অনুভব করা এবং যেসব নারী বাড়িতে একা অবস্থান করেন তাদের মধ্যেই অ্যাপসটি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি।

এই ভয়াবহ ও আসক্ত অ্যাপসগুলো সম্পর্কে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সিনিয়র সাংবাদিক কাওছার উদ্দীন বলেন, প্রযুক্তির ভালো দিকগুলোকে বাদ দিয়ে অনেক সময়ই খারাপ দিকগুলোকে গ্রহণ করেন অনেকে। শুধুমাত্র এই অ্যাপস নয়, এ ধরনের অনেক অ্যাপস ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। যেহেতু এই অ্যাপসটি দিয়ে প্রতারণার ঘটনা বেশি ঘটছে তাই বিটিআরসি চাইলেই এটি বন্ধ করে দিতে পারে।

অ্যাপস ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পক্ষ থেকে খুব কম কিছুই করার থাকে বলে মনে করেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, গুগল অ্যাপস স্টোরে হাজারো অ্যাপস রয়েছে। এগুলোকে ভালো-মন্দ দু’ভাবেই ব্যবহার করা যায়। কে কোন অ্যাপসটিকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন বা কেউ এটি দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন কিনা সেটা আমাদের জানার কথা নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীর প্রত্যেকেরই সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। তারাই এগুলো বেশি দেখাশোনা করে। কেউ অভিযোগ করলে আমরা আইজিডব্লিউকে বলে সেটি বন্ধের ব্যবস্থা করি। তবে এই অ্যাপসটি ব্যবহার করে যেহেতু অনৈতিক কাজ ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে সেহেতু বিষয়টি খতিয়ে দেখে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

মানবকণ্ঠ/এসএস