অমর একুশে গ্রন্থমেলা:

বিক্রেতাবিহীন স্টল ও একটি মানবিক আয়োজন

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সোমবার ছিলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৯ এর চতুর্থ দিন। সূর্য অস্তমিত যাওয়ার আগে একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই বিগত দিনের তুলনায় বইপ্রেমীদের ভিড় লক্ষ্য করা গিয়েছে। মেলা এখনও খুব একটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেনি বলা যায়।  গোছানোর কাজও চলছে বিভিন্ন স্টলে। অনেক জনপ্রিয় লেখকের বই এখনও মেলায় আসেনি।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বইপ্রেমীদের আনাগোনায় প্রাঙ্গণ যেন প্রাণ ফিরে পায়। অভিভাবকরা শিশুদের হাত ধরে বিভিন্ন স্টলে গিয়ে বই দেখছেন। এছাড়া বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন স্টলে গিয়ে নিজেদের পছন্দের বই খোঁজ করছেন। প্রিয় লেখকদের নতুন কোন বই এসেছে কিনা, সেটা স্টল থেকে জেনে নিচ্ছেন।

একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে পশ্চিম দিকে গিয়ে দেখা মিললো ভিন্ন চিত্র। প্রত্যেক স্টলে বিক্রেতা থাকলেও মাত্র একটা স্টলে কোন বিক্রেতা নেই্। স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখা মিললো‌ ‌“বিক্রেতাবিহীন স্টল, বই বিক্রির অর্থ পথশিশুদের আহারের জন্য ব্যয় হবে।” এই স্ক্রিনে আরো লেখা রয়েছে “বইয়ের লিখিত মূল্যের ৭৫% পরিশোধ করুন,বইয়ের কভারের মূল্য *০.৭৫= বইয়ের মূল্য। সমস্যা হলে সেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতা নিন।”

এর নীচে বেশ বড় করে লেখা “এই স্টলের অর্থে আমাদের খাবার হবে, অনুগ্রহ করে বই কেনার অর্থ বক্সে জমা দিন।” লেখাটি দু’টি প্রতীকী পথশিশু ধরে রেখেছে।

পাশের দেয়ালে লেখা টাকা এখানে জমা দিন। তার নীচে ভাউচার রয়েছে। বই কেনার পর ক্রেতাকে নিজ দায়িত্বে ভাউচারে রশিদ কেটে টাকা জমা দিতে হবে। মেলায় এমন ব্যতিক্রমী স্টল দেখে বইপ্রেমীরা থমকে দাঁড়াচ্ছেন। অনেকে সেটা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। ৫৩ নং এই স্টলটির নাম “১ টাকার আহার”।

রাজধানীর মগবাজার থেকে এসেছিলেন কলেজ শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। তিনি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরে-ফিরে দেখলেন এবং একটা বইও কিনলেন। নিজ দায়িত্বে সকল প্রক্রিয়া সেরে নির্দিষ্ট জায়গায় টাকা জমা দিলেন।

কলেজ শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানালেন, অনেক বছর থেকে বই মেলাতে আসি। তবে এরকম বিক্রেতাবিহীন স্টল আগে কখনও দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা একটা মানবিক আয়োজন। যার মাধ্যমে পথশিশুদের আহারের ব্যবস্থা করা হবে।

বাচ্চাদের সঙ্গে করে মিরপুর থেকে এসেছিলেন একজন গৃহিনী। তার বাচ্চারা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, এই বই কেনা অর্থ দিয়ে পথ শিশুদের খাদ্য কেনা হবে।

‘১ টাকার আহার নামে’ স্টলটির নীচে বড় করে লেখা আছে ‘বিদ্যানন্দ’। তার নীচে ছোট করে লেখা পড়বো; খেলবো; শিখবো। স্টলের ভেতরে যোগাযোগের জন্য ভিজিটিং কার্ডের দেখা মিললো।

সেটার সূত্র ধরে মোবাইলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যানন্দের ভলেন্টিয়ার মোহসিন জানালেন, আমরা পথশিশুদের নিয়ে কাজ করি। স্টলের বিক্রিত বইয়ের টাকা পথশিশুদের খাবার কেনার জন্য ব্যয় করা হবে।

বিক্রেতাবিহীন এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন কেন? এমন প্রশ্নে উত্তরে তিনি বলেন, আমরা মনে করি বই পড়ুয়া মানুষরা সৎ ও রুচিশীল হয়, সুতরাং কোন সমস্যা হবে না বলে মনে করি। এছাড়াও একটা মানবিক কাজ সততা দিয়েই শুরু হোক। আমরা প্রথমে স্টলে পথশিশুদের রাখতে চেয়েছিলাম। তবে ভেতরে দু’জন প্রতীকী পথ শিশু রাখা হয়েছে। তারা একটা ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

বইপ্রেমীদের কাছ কেমন সাড়া পাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে উত্তরে তিনি জানালেন, আমরা যতটা আশা করেছিলাম, তার থেকে অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছি। পথশিশুদের জন্য সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

বিদ্যানন্দ একটি শিক্ষা সহায়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন(সরকারী রেজিস্ট্রেশন নম্বার এস-১২২৫৮/২০১৫)। সংগঠনটি ৪০ জন কর্মকর্তা ও কয়েক’শ স্বেচ্ছাসেবক দ্বারা আটটি শাখা ও নিজস্ব ক্যাম্পাসে নবনির্মিত অনাথাশ্রম এবং পরিপূর্ণ স্কুল প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।এছাড়াও পথশিশুদের জন্য “এক টাকায় আহার” নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.