বিএনপি প্রার্থীকে হারাতে শক্ত প্রার্থীর খোঁজে আওয়ামী লীগ

বরিশাল-৫ (সদর) আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ লাইন থাকলেও বিএনপি থেকে একক প্রার্থী হচ্ছেন দলীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার। আর বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করতে শক্ত প্রার্থী খুঁজছে আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন বর্তমান এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল-২ (উজিপুর-বানারীপাড়া) আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশাল সদরের উপজেলা চেয়ারম্যান ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম)। এ ছাড়া এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মহসিন উল ইসলাম হাবুল ও মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি কাউন্সিলর মর্তুজা আবেদীন ও চরমোনাই অনুসারী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে চরমোনাই পীর রেজাউল করিমের ভাই সৈয়দ ফয়জুল করিমকে।

বরিশাল সদর আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তার সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে শওকত হোসেন হিরনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। বরিশাল নগরীকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেও ১৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে হিরন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিব কামালের কাছে পরাজিত হন। তাছাড়া গত সংসদ নির্বাচনে শওকত হোসেন হিরন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুর পর সদর আসন থেকে হিরনের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজকে মনোনয়ন দেয়া হয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় জেবুন্নেছা ডামি প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি জেবুন্নেছা। হিরনের নেতাকর্মীদের পর্যন্ত তিনি ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। এমনকি স্বামী হিরনের উন্নয়নের সামান্যতম ধারে কাছে যেতে পারেননি এ গৃহবধূ। জেবুন্নেছা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য পদে রয়েছেন।

২০০৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসন থেকে নৌকার মাঝি হয়েছিলেন কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম। ওই নির্বাচনে সরোয়ারের সঙ্গে পরাজিত হন শামীম। নির্বাচনে হেরে গিয়ে কিছুটা চুপচাপ ছিলেন জাহিদ। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করা ছাড়া তাকে বরিশালে তেমন একটা দেখা যায়নি। তবে বর্তমানে বরিশালে অবস্থান করে দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করছেন।

এর পূর্বে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে সরোয়ারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ। এরপর তিনি ১৯৯৪ সালে পৌরসভা নির্বাচনেও পরাজিত হন। ওই সময় সদর আসনে আওয়ামী লীগের অবস্থা ছিল নড়বড়ে। মাহাবুব উদ্দিন নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতেজ করে রেখেছিলেন। ওই তিনটি নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য মাহাবুব অনুসারীরা আওয়ামী লীগের একটি অংশকে দায়ী করেছেন। তাদের বিরোধিতার কারণে তিনি সংসদ ও পৌরসভা নির্বাচনে হেরে যান। এরপরও মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ থেমে থাকেননি। বরিশালে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।

সুন্দরবন লঞ্চ কোম্পানির স্বত্ব¡াধিকারী সাইদুর রহমান রিন্টু আওয়ামী লীগ ঘরনার হলেও তার রাজনীতিতে প্রবেশের বয়স বেশি না হলে নগরীতে সবার সঙ্গে রয়েছে ভালো সম্পর্ক। শওকত হোসেন হিরন এমপি থাকাকালীন বরিশাল সদর উপজেলায় নির্বাচনে অংশ নেন সাইদুর রহমান রিন্টু। নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রিন্টু। উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসার পর সদর উপজেলার উন্নয়নে ছুটে বেড়ান। সরকারের অপ্রতুল বরাদ্দ তার সঙ্গে নিজের অর্থ মিলিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন উন্নয়নের। ব্যবসায়ী হিসেবে যেমন তিনি সফল, তেমনি রাজনীতিতেও রিন্টু তার সফলতার ছাপ রেখেছেন। নগরীতে সাদা মনের মানুষ হিসেবে রয়েছে রিন্টুর পরিচিতি।

প্রায় ১৬ বছর বরিশালের রাজনীতির মাঠ থেকে সরে থাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ পাওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়েছেন। এখন বরিশালের রাজনীতিতে তিনি বেশি সময় দিচ্ছেন। এক সময় বরিশাল আদালতের সরকারি কৌঁসুলি হঠাৎ করে বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। তবে কি কারণে তিনি ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন সে বিষয়টি আজ পর্যন্ত কারো কাছে পরিষ্কার নয়। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তিনি ঢাকায় চলে যান। আবার রাজনীতির টানেই তিনি বরিশাল ফিরে আসেন।

এরা সবাই আগামী একাদশ নির্বাচনে সদর আসন থেকে নৌকার মাঝি হওয়ার জন্য লবিং চালাচ্ছেন। কেন্দ্র থেকেও বিএনপি প্রার্থী সরোয়ারের সঙ্গে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারবেন এমন প্রার্থীই খোঁজা হচ্ছে।

তবে সদর আসনের চমক হতে পারে বরিশাল-২ আসনের এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস। এমপি ইউনুসের আসনে দল থেকে অন্য কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হলে সে ক্ষেত্রে ইউনুসকে সদর আসনে নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের। ইউনুস ২০০৭ সালের নির্বাচনে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান বরিশাল-১ আসনের এমপি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলা হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হন। তার আসন থেকে তালুকদার মো. ইউনুস অংশ নিয়ে বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ নির্বাচনে বরিশাল-২ আসন থেকে ইউনুসকে মনোনয়ন দেয়া হয়। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন ইউনুস।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ভেবে-চিন্তে এগোতে হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি থেকে একক প্রার্থী হচ্ছেন মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি সদর আসন থেকে চারবার এমপি এবং প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। এ কারণে সরোয়ারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে পারে এমন শক্ত প্রার্থী খুঁজছে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী থাকলেও বিএনপিতে প্রার্থী রয়েছেন মজিবর রহমান সরোয়ার। তার সঙ্গে মনোনয়ন যুদ্ধে কেউ নেই। এ কারণে অনেকটা নিশ্চিন্ত সরোয়ার নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না। তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিচ্ছেন।

এদিকে এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন যুদ্ধে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বরিশাল ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম হাবুল এবং মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি কাউন্সিলর মর্তুজা আবেদীন। এরা দু’জন দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তৃণমূল থেকে জাতীয় পার্টির রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা দু’জনই লাঙ্গলের প্রার্থী হতে চান।

অপরদিকে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩শ’ আসনেই প্রার্থী দেবে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বরিশাল জেলার ৬টি আসনে প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করেছে দলটি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাইর পীর মাওলানা মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করীমের ভাই সৈয়দ ফয়জুল করিম বরিশাল-৫ সদর আসন থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনের বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নেছার উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন আমাদের সংগঠনের প্রার্থীরা হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। সে লক্ষ্যে প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় তাদের নির্বাচনী কর্মসূচি শুরু করেছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত সবার অধিকার রয়েছে মনোনয়ন চাওয়ার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যাকে মনোনয়ন দেবেন তার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীরা কাজ করবেন। তবে দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছেন সরোয়ারকে পরাজিত করতে দল শক্ত প্রার্থী খুঁজছে।

মহানগর বিএনপির সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ভাবছি না। আমরা তখনই নির্বাচনের কথা ভাবব যখন দেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস