একাদশ জাতীয় নির্বাচন : কুমিল্লা (৮)

বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীর বিপক্ষে হ-য-ব-র-ল আওয়ামী লীগ-মহাজোট

বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীর বিপক্ষে হ-য-ব-র-ল আওয়ামী লীগ-মহাজোট

১৫টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও ১টি উপজেলা মিলে কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) সংসদীয় আসন। চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপির শক্তিশালী আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম আসন হলো কুমিল্লা-৮ বরুড়া। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচনের পর যে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলো হয়েছে সেগুলোও ছিল বিতর্কিত। এই বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতেও দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে থেকে বরুড়ায় প্রশাসনকে কিছুটা সুষ্ঠু নির্বাচন করাতে বাধ্য করায় স্থানীয় বিএনপি। ফলে বরুড়া উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র ও অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা নির্বাচিত হন বিএনপি দলীয় ধানের শীষ প্রতীকে যা চট্টগ্রাম বিভাগে আর কোনো উপজেলায় বিএনপির জন্য সম্ভব হয়নি।

এই আসনে বিএনপির এক প্রকার নিশ্চিত প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন। অপরদিকে, এখানে আওয়ামী লীগ তিন ধারায় বিভক্ত। তার ওপর রয়েছেন এখানকার বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। এখানে জাপা-আওয়ামী লীগ সাপে-নেউলে সম্পর্ক। একে তো বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী তার ওপর আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির চরম দ্বন্দ্বে কারণে এখানে জোটগতভাবেও ২০ দলীয় জোট থেকে যোজন যোজন দূরত্বে রয়েছে মহাজোট।

এ উপজেলা ১৫টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ উপজেলায় ৩৩৩টি গ্রাম রয়েছে। ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়নে বিএনপি ইউপি চেয়ারম্যান, ৭টিতে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান ও একটিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান রয়েছেন। এমপি ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির। পৌর মেয়র, উপজেলার চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপির।

কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে ৪ বার, বিএনপি ৪ বার ও জাতীয় পার্টি ২ বার। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রয়াত নেতা আবদুল হাকিম। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন বিএনপির প্রয়াত আলী হোসেন। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগ প্রয়াত নেতা আবদুল হাকিম। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এমপি হন সাবেক জাপা নেতা ও বর্তমান কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান ভুইয়া। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হন ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির আবু তাহের। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির আবু তাহের এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের আবদুল হকিম। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার এমপি হন বিএনপির আবু তাহের। তিনি এমপি থাকাবস্থায় ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মারা গেলে একই বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জাপার বর্তমান এমপি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলনকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন সাবেক এমপি প্রয়াত আবু তাহেরের বড় ছেলে বর্তমান বিএনপির কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক জাকারিয়া তাহের সুমন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে এখানে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পান সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুল ইসলামকে ৩৩ হাজার ৬৯৮ ভোটে পরাজিত করে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। সেই বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ তার পক্ষে কাজ করলেও এখন আর সেই সুসম্পর্ক নেই।

আওয়ামী লীগ: কুমিল্লা-৮ সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ এখন ত্রি-ধারায় বিভক্ত। এক গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ আহ্বায়ক নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। আরেক গ্রুপে আছেন এই আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত আওয়ামী লীগদলীয় এমপি মরহুম আবদুল হাকিমের ছেলে ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম আর আরেক গ্রুপে আছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মিয়াজী। ৩ জনেই এলাকায় সক্রিয় এবং নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দল এবং মহাজোটের তারা সম্ভাব্য প্রার্থীও।

এই আসন থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আওয়ামী লীগদলীয় অন্যতম প্রার্থী ছিলেন সাবেক এমপি নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল হাকিম পরিবার থেকেও। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আসনটি ছেড়ে দেয় জাতীয় পার্টিকে। মহাজোট প্রার্থী হিসেবে জাপার মনোনয়ন পান কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জাপার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। আর বিদ্রোহী প্রার্থী হন সাবেক এমপি প্রয়াত আবদুল হাকিমের ছেলে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। তখন সাবেক এমপি নজরুল গ্রুপ জাপার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে। নির্বাচনে বিজয়ী হন জাপার অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অধ্যাপক মিলন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এমপি হলেও তিনি এমপি হয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি। তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। আর অপর দিকে, বিএনপিকে সুবিধা করে দিয়েছেন। আমরা আর তাকে চাই না। যদিও এমপি মিলন গ্রুপের পক্ষ থেকে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি নিজের প্রার্থিতা পরোক্ষভাবে জানান দেয়ার জন্য বরুড়ায় নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি পরিকল্পনামন্ত্রী লোটাস কামাল, সাধারণ সম্পাদক রেলমন্ত্রী মজিবুল হক মুজিবকে নিয়ে এক জনসভার আয়োজন করেন। এই জনসভা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কট করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও এই আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম।

এখন পর্যন্ত এই আসনে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন নেয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ আহ্বায়ক নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মিয়াজী। মনোনয়ন দৌড়ে সম্প্রতি জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দুই মন্ত্রীকে এনে জনসভা করিয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন নাসিমুল আলম চৌধুরী নজরুল, স্থানীয় নেতাকর্মীরা এমনটাই মনে করেন। অপরদিকে, কামরুল ও এনাম গ্রুপের বক্তব্য, মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড, বরুড়ার জনসভা না।
এদিকে, বরুড়া আওয়ামী লীগ শিবিরে আরেকটি আতঙ্ক কাজ করছে আর তাহলো, আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে যদি জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের মহাজোট অক্ষুণ্ন থাকে আর সেক্ষেত্রে জাপা যদি তাদের বর্তমান আসনটি রাখতে চায়, তখন কী হবে এই তখন, যদি ও কিন্তুর ওপর ভিত্তি করে আরামের ঘুম হারাম হচ্ছে বরুড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তিন শিবিরেই।

বিএনপি: কুমিল্লা-৮ সংসদীয় আসনে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের একমাত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির কর্মসংস্থান সম্পাদক, জেলা সহসভাপতি ও সাবেক এমপি জাকারিয়া তাহের সুমন। তার বাবা আবু তাহেরও এই আসন থেকে তিন বার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল এবং জোটে তার কোনো ন্যূনতম প্রতিদ্ব›দ্বী নেই। এবারের উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে শত প্রতিক‚লতার মধ্যে থেকেও নিজের প্রার্থীদের বিজয়ী করে বরুড়ায় নিজের অবস্থানকেই শুধু সুসংহত করেননি তিনি আগামী নির্বাচনে যে একজন শক্ত প্রার্থী প্রতিপক্ষকে এই বার্তাও দিয়েছেন বলে জানান তার নেতাকর্মীরা। এই আসনের বিএনপির নেতাকর্মীদের বক্তব্য, আমরা বিজয় নিয়ে কিংবা আওয়ামী লীগের গ্রুপিং নিয়ে চিন্তা করছি না। আমরা চাচ্ছি ন্যূনতম হলেও একটি সুষ্ঠু ভোট হোক। তাহলেই আমরা বিজয়ী হতে পারব।

জাতীয় পার্টি: ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের পর এই আসনে আবার জাতীয় পার্টির লাঙ্গল বিজয়ী হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে। তখনকার এমপি মাহাবুবুর রহমান ভুইয়া এখন জেলা বিএনপির সহসভাপতি। বর্তমানে জাতীয় পার্টির এমপি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কামাল হোসেনও জাতীয় পার্টির। জাতীয় পার্টিতে এখানে কোনো গ্রুপিং নেই। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন দলের একক প্রার্থী। আসলে এখানে জাপার কোনো নিজস্ব ভোট নেই। এমপি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলনের ব্যক্তি ইমেজের কিছু নিজস্ব ভোট আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন চাচ্ছেন আরেকবার মহাজোটের প্রার্থী হতে। তবে জানা গেছে, মহাজোটের প্রার্থী না হতে পারলেও তিনি জাপা থেকে নির্বাচন করবেন।

এলাকার ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখানে আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের গ্রুপিং শেষ করে জাতীয় পার্টিকে আস্থায় এনে একক প্রার্থী দিতে পারে তবে বিএনপির জাকারিয়া তাহের সুমন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন। অন্যথায় ৫০ ভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও আসনটি বিএনপির ঘরে পৌঁছে যেতে পারে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা।

মানবকণ্ঠ/এসএ