বিএনপির কোন্দলে ফুরফুরে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা

আসন্ন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থিদের কোন্দলে ফুরফুরে মেজাজে আছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। দেশের উচ্চ আদালতের আইনজীবীদের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের তিনটি প্যানেল হওয়ায় বেশ নির্ভার রয়েছেন প্রতিপক্ষ আওয়ামী আইনজীবীরা। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সমিতির জয় করায়ত্ত করতে চান আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। কয়েকদিন আগে হয়ে যাওয়া ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থির সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে জয় পেয়েছেন। ঢাকা বারের এই জয়ের ধারা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় আইনজীবীরা। তারা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের ভরাডুবি নিশ্চিত, যদিও এ পক্ষের আইনজীবীরা মনে করছেন, তাদের এ বিভেদ সাময়িক। সমিতির নির্বাচনের আগেই দলীয় হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে তারা ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী এম আমিন উদ্দিন মানবকণ্ঠকে বলেন, আমরা একত্রিত আছি। বহুদিন পরে আমরা একত্র হয়েছি। আমাদের প্যানেল একটি হবে। নির্বাচনে একটি ভালো রেজাল্ট হবে আশা করি।

তবে এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের ভেতরে যা ঘটেছে নির্বাচনের আগেই ঠিক করে ফেলবেন আমাদের নেতারা। আমরা একত্রিত হতে পারব আশা করি। এ বিষয়ে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সমিতির বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন।

আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিদ্রোহী কোনো প্যানেল নাই। এই প্যানেল জয়ী হলে বারের উন্নয়নে প্রকৃত কাজ করা সম্ভব। আইনজীবীরা এই প্যানেলকে নির্বাচিত করবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

এদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বারের) নির্বাচনে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল’ ৬ মার্চ মঙ্গলবার রাতে ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার ১৬ ঘণ্টা পার না হতেই অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের একটি বিদ্রোহী প্যানেলের ঘোষণা আসে ৭ মার্চ বুধবার বিকেলে। ‘মনোনয়ন বঞ্চিতের’ অভিযোগ এনে পাল্টা এই প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এদিন দুপুরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দু’গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন কয়েকজন। এর পরদিনই ৮ মার্চ বৃহস্পতিবার বিএনপি-জামায়াতপন্থি আরো একটি (তৃতীয়) প্যানেল ঘোষণা করা হয়। বিএনপির সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. খসরুজ্জামানের নেতৃত্বে এই প্যানেল ঘোষণা করা হয়। ঘোষণা করা ওই প্যানেলের সম্পাদক হলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল বাশার। এই প্যানেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট শামসুল জালাল চৌধুরী ও অর্থ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবিনা ইয়াসমিন লিপি। তবে অন্য কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেননি তারা।

৪ মার্চ রোববার রাতে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে সভাপতি পদে এবং শেখ মোহাম্মদ মোরশেদকে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০১৮-১৯ মেয়াদের নির্বাচন আগামী ২১ ও ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সমিতির সুপারিনটেনডেন্ট (তত্ত্বাবধায়ক) নিমেষ চন্দ্র দাস বলেন, ১ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত মনোনয়ন সংগ্রহ ও দাখিল, ১১ মার্চ বিকেল সাড়ে ৫টায় বাছাই এবং ১৪ মার্চ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের তারিখ ধার্য করা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে এ বছর ছয় হাজার ২১২ জন ভোটার রয়েছেন। আগামী ২১ ও ২২ মার্চ সকাল ১০টা থেকে মাঝে এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সাতটি সম্পাদকীয় ও সাতটি নির্বাহী সদস্যের পদ রয়েছে।

বিগত বছরগুলোর নির্বাচনে দেখা গেছে, এখানে প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একটি সাদা প্যানেল, অপরটি নীল প্যানেল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ ও সমমনাদের সমর্থনে সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ সমর্থিতদের হচ্ছে সাদা প্যানেল। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ও সমমনাদের সমর্থনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্যের নীল প্যানেল।

৬ মার্চ মঙ্গলবার রাতে ‘জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল’ ঘোষণা করা হয়। এতে বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি প্রার্থী এবং বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনকে সম্পাদক প্রার্থী করা হয়। বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীদের বৈঠক শেষে ৬ মার্চ রাতে ঘোষণা করা প্যানেলের অপর প্রার্থীরা হলেন সহসভাপতি আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, এমডি গোলাম মোস্তফা, কোষাধ্যক্ষ নাসরিন আক্তার, সহসম্পাদক কাজী জয়নুল আবেদীন, আনজুমানারা বেগম মুন্নী, সদস্য ব্যারিস্টার সাইফুর আলম মাহমুদ, জাহাঙ্গীর জমাদ্দার, এমদাদুল হক, মাহফুজ বিন ইউসুফ, সৈয়দা শাহীনারা লাইলী, নাসরিন খন্দকার শিল্পী।

অপরদিকে ৭ মার্চ বুধবার বিকেলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে সভাপতি ও এবিএম রফিকুল হক তালুকদার রাজাকে সম্পাদক প্রার্থী করে বিদ্রোহী প্যানেল ঘোষণা করা হয়। বিদ্রোহী প্যানেলের অপর প্রার্থীরা হলেন সহসভাপতি ডা. মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া ও আলহাজ মুহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট আয়ুব আলী আসরাফী, সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট শরিফ ইউ আহমেদ ও অ্যাডভোকেট আবু হানিফ, সদস্য পদে মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, অ্যাডভোকেট মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী, সাবিনা ইয়াসমিন লিপি, মো. শফি-উর-রহমান, ইকবাল হোসেন, মো. আকবর হোসেন ও আব্দুস সামাদ।

এদিকে ৪ মার্চ নির্বাচনে অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট এসকে মোরশেদকে সম্পাদক প্রার্থী করে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের একক প্যানেল ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট বার ২০১৮-১৯ নির্বাচনের জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন। সভাপতি-সম্পাদক ছাড়া বাকি পদগুলোর মনোনীতরা হলেন- সহসভাপতি আলাল উদ্দীন ও ড. মোহাম্মদ শামসুর রহমান, ট্রেজারার ড. মোহাম্মদ ইকবাল করিম, সহসম্পাদক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক ও ইয়াদিয়া জামান, সদস্য ব্যারিস্টার আশরাফুল হাদী, হুমায়ুন কবির, চঞ্চল কুমার বিশ্বাস, শাহানা পারভীন, রুহুল আমিন তুহিন, শেখ মোহাম্মদ মাজু মিয়া, মোহাম্মদ মুজিবর রহমান সম্রাট।

মানবকণ্ঠ/এসএস