বিএনপিতে একক, আওয়ামী লীগে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী

বিএনপিতে একক, আওয়ামী লীগে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী

রাজনৈতিকভাবে কুমিল্লা জেলাকে উত্তর এবং দক্ষিণ নাম দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছে। কুমিল্লা জেলায় বর্তমানে সংসদীয় আসন ১১টি। কুমিল্লা উত্তরে সংসদীয় আসন রয়েছে ৫টি আর দক্ষিণে রয়েছে ৬টি। ২০০৮ সালের পূর্বে এখানে আসন ছিল ১২টি।

দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১ সংসদীয় আসন। কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে এটি হেভিয়েট আসন হিসেবে পরিচিত। একদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অপরদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও জ্বালানি সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভুইয়া। এবার এখানে সুবিদ আলী ভুইয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খুব শক্তভাবেই মাঠে রয়েছেন আইইবির প্রেসিডেন্ট ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুর ও মেঘনা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিকুল ইসলাম।

এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬১৪ আর নারী ভোটার ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩২০ জন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে সুবিদ আলী ভুইয়া ১২ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়ে বিএনপির ড. মোশাররফকে পরাজিত করে এমপি হন। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভুইয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

বিএনপি: ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একক নেতৃত্বে এখানে সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং দল হিসেবেও সুসংহত। এখানে তিনি দল ও জোটের একক প্রার্থী। ১৯৯১ সালের ৫ম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই ড. মোশাররফ বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সার্বিক বিবেচনায় এবারো তিনি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন বলে মনে করেন স্থানীয় জনগণ। তবে এখানে তার ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য খন্দকার মো. মারুফ হোসেন এই আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পিতা ড. মোশারফ কুমিল্লা-হোমনা ও তিতাস থেকে নির্বাচন করতে পারেন।

আর বর্তমান সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন সংগ্রামে ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনের এই নির্বাচনী এলাকার কোনো ভূমিকা নেই। দৃশ্যমান কোনো নেতাকর্মীকেই ইদানীং মাঠে দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন বলেন, বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্মম নির্যাতনে, হামলা-মামলার কারণে নেতাকর্মীরা ঠিকমতো নিজের ঘরেও থাকতে পারছে না। তারপরেও তারা প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে অবদান রাখছে। দাউদকান্দির মাটি ও মানুষ শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসে। অতীতেও তারা এর প্রমাণ দিয়েছে, ইনশাআল্লাহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আগামীতেও এর প্রমাণ পাবেন।

আওয়ামী লীগ: কুমিল্লা-১ আসনের দাউদকান্দি ও মেঘনা এই দুই উপজেলার প্রতিটিতেই রয়েছে আওয়ামী লীগের ব্যাপক গ্রুপিং। এখানে এমপি সুবিদ আলী ভুইয়া এবং এন্টি এমপি অবস্থা বেশ দৃশ্যমান। দাউদকান্দি উপজেলায় আওয়ামী লীগের দুটি কমিটি। একটি বর্তমান এমপি লে. কর্নেল (অব.) সুবিদ আলী ভুইয়া কর্তৃক আর অপরটি উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ কর্তৃক। দুই কমিটিতেই সভাপতি অ্যাড. আহসান হাবিব চৌধুরী (লিল মিয়া) আর সাধারণ সম্পাদক পদে এমপি গ্রুপে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সালাম আর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেন ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন সিকদার।

অপরদিকে একই আসনের অপর উপজেলা হলো মেঘনা। এই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক রতন শিকদার হলেন এন্টি এমপি গ্রুপ আর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হলেন এমপি গ্রুপ। অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যানই উপজেলা কমিটির পক্ষে এবং এমপি সুবিদ আলী ভুইয়ার বিপক্ষে।

এই আসনে বেশ কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন বর্তমান এমপি সুবিদ আলী ভুইয়া। সাধারণ নেতাকর্মী এবং সংসদীয় আসনের দুই উপজেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে এমপি সুবিদ আলী ভুইয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, তিনি এমপি হয়ে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন, মূল্যায়ন করেননি, ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করে নিজের ছেলেকে দাউদকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান করেছেন, দলে গ্রুপিং সৃষ্টি করেছেন।

বর্তমান এমপি লে. কর্নেল (অব.) সুবিদ আলী ভুইয়া ছাড়াও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে এবার যারা নমিনেশন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, ২০০১ সালে নির্বাচন করা হাসান জামিল সাত্তারের ছেলে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগে উপপ্রচার সম্পাদক ব্যারিস্টার নাঈম হাসান, মেঘনা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. সফিকুল আলম এবং ইউরোপিয়ন ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. আবদুল মান্নানসহ কয়েক তরুণ।

এর মধ্যে নেতাকর্মীরা জানান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর তার নিজস্ব অবস্থান থেকে এলাকার প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে গণসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর মনোনয়ন পেলে গ্রুপিং অনেকটাই কমে আসবে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ মনোভাব সৃষ্টি হবে। সুবিদ আলী গ্রুপ আর এন্টি সুবিদ আলী গ্রুপ উভয় গ্রুপই ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুরের একটি আলাদা ইমেজ রয়েছে বলে জানা যায়।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর বলেন, আমি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। নির্বাচন করার জন্য আমি সার্বিকভাবে প্রস্তুত। দুই উপজেলাতেই উন্নয়ন এবং গণসংযোগ চালাচ্ছি। জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে সব মতভেদ ভুলিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আসনটি উপহার দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। আর আমি যদি নির্বাচিত হই দাউদকান্দি ও মেঘনা হবে দেশের অন্যতম সেরা দুটি উপজেলা।

দাউদকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপেরই সভাপতি আহসান হাবিব চৌধুরী ওরফে লিল মিয়া জানান, দাউদকান্দি উপজেলা তথা কুমিল্লা-১ নির্বাচনী এলাকায় কোনো গ্রুপিং নেই। তবে কিছুটা মান-অভিমান আছে। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সবাই কাজ করবে। তবে এ পর্যন্ত বর্তমান এমপি সুবিদ আলী ভুইয়া সাহেবই এগিয়ে রয়েছেন।

কুমিল্লা উত্তর জেলা অনুমোদিত দাউদকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন শিকদার বলেন, জেলা কমিটি আমাকে সাধারণ সম্পাদক করেছে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী। আর এমপি সাহেব জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত না মেনে সালাম সাহেবকে নিজে নিজে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেছেন। দলীয় এমপি সুবিদ আলী ভুইয়ার বিরুদ্ধে কেন আপনারা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত তিনি গণতন্ত্র মানেন না। এমপি হয়ে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন করে চলছেন। যারা সারাজীবন আওয়ামী লীগ করল তাদের বাদ দিয়ে নিজের ছেলেকে উপজেলা চেয়ারম্যান করেছেন। আর নির্বাচনী এলাকার সকল উন্নয়নমূলক কাজ থেকে তার স্ত্রী মাহমুদা ভূইয়া নিজে পারসেন্টেজ গ্রহণ করেন। এ কথাগুলো শত ভাগ সত্য। এ বিষয়ে দলীয় হাই কমান্ডকে জানিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব জানিয়েছি। আগামী নির্বাচনে নৌকার জন্য কাকে উপযুক্ত মনে করেন জানতে চাইলে মহিউদ্দিন শিকদার বলেন, সুবিদ আলী ভুইয়া ছাড়া যিনিই এ আসন থেকে প্রার্থী হবেন তিনিই বিজয়ী হবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে কতটুকু আশাবাদী জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট এই এমপি বলেন, আমি দাউদকান্দিতে যে কাজ করেছি গত ৫০ বছরেও এত উন্নয়নমূলক কাজ কেউ করেনি। সুতরাং আমার ছাড়া মনোনয়ন আর দেবে কাকে। কে আছে এমন যে আমার থেকে বেশি কাজ করবে।

জাতীয় পার্টি: এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করার জন্য নাম শোনা যাচ্ছে জাপা নেতা সুলতান আহমেদ জিসান, আবদুল কাদের জুয়েল ও জাতীয় ছাত্রসমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আবু জায়েদ আল মাহমুদ মাখন সরকারের। তবে এর মধ্যে মাঠে রয়েছেন মাখন সরকার। এখানে সাংগঠনিকভাবে জাপা খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই।

অন্যান্য দল: এখানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের দৃশ্যমান কোনো প্রার্থী না থাকলেও প্রচণ্ড প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তারা গোপনে গোপনে দলের কাজ করেন বলে জানা গেছে। আর ইসলামী ঐক্যজোট থেকে এখানে সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন মাওলানা আলতাফ হোসেন।

এই নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, আওয়ামী লীগ থেকে এখানে যেই মনোনয়ন পাক না কেন তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে বিএনপির ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনের সঙ্গে। কারণ ঐক্যবদ্ধ বিএনপির বিরুদ্ধে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়নে কতটা চমক দেখাতে পারে সেটার ওপরই নির্ভর করবে দলের ফলাফল।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.