বিআরটিসি বাসের ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা!

বিআরটিসি বাসের ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা!

রাজধানীর কুড়িল-পূর্বাচল এক্সপ্রেস রোডে বিআরটিসির বাসসেবা চালু হওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমলেও, ভাড়া নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন নরসিংদী ও রূপগঞ্জসহ এ সড়কে চলাচলকারী আশপাশের এলাকার লক্ষাধিক মানুষ।

এই রোডে একমাত্র গণপরিবহন হওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিসি) একটি অসাধু চক্র। শুরুতে এই পথে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ১০ টাকা। সম্প্রতি এই ভাড়াকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। এতে ক্ষোভের সঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এ রুটে চলাচলকারী যাত্রীরা। অথচ সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা। এর ফলে যাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হলেও বিকল্প না থাকায় নীরবে সব সহ্য করছেন। তবে যে কোনো সময় তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সরকারের পক্ষে দেশের সব রুটের ভাড়া নির্ধারণ করে। সর্বশেষ নির্ধারণ করা তালিকায় বড় বাসের ন্যূনতম ভাড়া ৭ টাকা। আর প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিই সরকার নির্ধারিত ভাড়া মানছে না রাজধানীর ৩০০ ফুট সড়কে। সর্বনিম্ন ভাড়ার পাশাপাশি কিলোমিটার প্রতি ভাড়াও বেশি নিচ্ছে তারা। এই পথে প্রথমে সর্বনিম্ন ভাড়া ধরা হয়েছিল ১০ টাকা। সম্প্রতি এই ভাড়াকে একটি অসাধু মহল বাড়িয়ে ১৫ টাকা আদায় করছে। আর এভাবে বাড়তি ভাড়া নেয়ায় যাত্রী সাধারণের সঙ্গে কুড়িল কাউন্টারের লোকজনের প্রায় প্রতিদিনই বাক বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায়।

এ রুটে নিয়মিত চলাচলকারী এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দেশটা আসলেই মগের মুল্লুক। যে যেখানে পারছে ক্ষমতা দেখাচ্ছে। বিআরটিসি রাষ্ট্রীয় পরিবহন হওয়ার পরেও রাষ্ট্রের আইন তারা মানছে না। সরকার বড় বাসের ভাড়া প্রতিকিলোমিটার ১ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। অথচ বিআরটিসিই মানছে না। কুড়িল থেকে স্বদেশ প্রপার্টিজ কাউন্টার পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার। সরকারি হিসাবে ভাড়া আসে প্রায় ৬ টাকা (৫ টাকা ৯৫ পয়সা), অথচ শুরু থেকেই এই দূরত্বের ভাড়া ১০ টাকা নিলেও এখন ১৫ টাকা নিচ্ছে যা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণেরও বেশি। এটা রীতিমতো বাটপারি। তবুও বিকল্প নেই তাই আমরা জিম্মি।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ অত্যাচার বন্ধের দাবি জানাই।

একই রুটে চলাচলকারী গণমাধ্যমকর্মী মো. আবু রায়হান বলেন, ‘শুরু থেকেই এ রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বর্তমানে তেল, গ্যাসের মূল্য না বাড়লেও অবারো ভাড়া বৃদ্ধিতে যাত্রীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে যে কোনো মুহূর্তে।’

বিআরটিসি কুড়িল থেকে বালু সেতু পর্যন্ত চার কিলোমিটার পথে যাত্রীদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা এবং পরবর্তিতে ১০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে কুড়িল কাউন্টার ১৫ টাকা নিচ্ছে। কুড়িল থেকে কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার পথের ভাড়া নিচ্ছে ২৫ টাকা। যা সরকারি হিসাবে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি। আবার কুড়িল থেকে ভুলতা পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার পথের ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪০ টাকা। ভাড়া হওয়ার কথা ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাঞ্চন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাঞ্চন সেতু থেকে কুড়িল পর্যন্ত মাত্র ১৪ কিলোমিটার পথে যেতে ২৫ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। তাছাড়া স্বদেশ, মস্তুল পর্যন্ত শুরুতে ১০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করলেও আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা। যা নিয়ে প্রতিদিনই এ রুটের যাত্রীদের সঙ্গে কাউন্টারের লোকদের দ্বন্দ্ব লাগছে। এটি যে কোনো মুহূর্তে সংঘাতে রুপ নিতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি পরিবহন হিসেবে পরিচিত বিআরটিসি বাসের এ ভাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত। এর ফলে বেসরকারি অথবা ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্যে আরো উৎসাহিত হবে।’ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিসির গাজীপুর ডিপোর ব্যবস্থাপক (পরিচালন) মো. শাহরিয়ার বলেন, ‘নতুন করে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। এ ছাড়া কুড়িল থেকে কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত ভাড়া ২৫ টাকা ও ভুলতা পর্যন্ত ভাড়া ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত এ ভাড়ার অতিরিক্ত কেউ নিলে তা বেআইনি এবং তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিস্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এই রুটের কাউন্টার লাইন ম্যান মো. আলী হায়দার বলেন, ‘বর্তমানে বিআরটিসির ২৪টি বাস চলাচল করছে এই রুটে। এখন পর্যন্ত এ রুটে মোট ১১টি কাউন্টার আছে। তবে এ সংখ্যা আরো বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাসগুলো ছাড়লেও কিছুদিনের মধ্যে রামপুরা ব্রিজ থেকে বাড্ডা, নতুনবাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, বালু ব্রিজ ও কাঞ্চন ব্রিজ হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা (গাউছিয়া) পর্যন্ত চলাচল করবে।

এর আগে ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর কুড়িল থেকে ভুলতা (গাউছিয়া) পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার তিনটি আর্টিকুলেটেড (জোড়া) বাস নিয়ে নতুন এই পরিবহন সেবা চালু হয়। শুরু থেকেই যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় পাঁচ দিনের মধ্যে বাসের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এটি আরো বাড়িয়ে বর্তমানে এ রুটে ২৪টি বাস চলাচল করে। এ মুহূর্তে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাসগুলো ছাড়লেও এর নির্ধারিত রুট হচ্ছে রামপুরা সেতু থেকে বাড্ডা, নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, বালু ব্রিজ ও কাঞ্চন সেতু হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা (গাউছিয়া) পর্যন্ত। যদিও এটি বাড্ডায় ইউলুপ নির্মাণের পর রামপুরা সেতুর কাছ থেকে বাসগুলো ছাড়ার কথা রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস