বায়ুর প্রাণঘাতী দূষণ রোধ করতে হবে

বায়ুর প্রাণঘাতী দূষণ রোধ করতে হবে

নগর সভ্যতার ডামাডোলে গোটা বিশ্ব এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যেখানে প্রাণ ধারণের জন্য ন্যূনতম বিশুদ্ধ আলো, বাতাস ও পানির মতো প্রকৃতির অফুরান দানগুলো অবশিষ্ট থাকার সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে নানা বিরূপ প্রভাবসহ মানবসৃষ্ট পরিবেশ দূষণের কবলে পড়ে ক্রমশ হুমকির মুখে এগিয়ে চলছে জনজীবন। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দ্রুত শিল্পায়নের এই অশুভ প্রতিযোগিতার করাল গ্রাসে পড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে, লাগামহীনভাবে বেড়ে চলছে দূষণ। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে আলো-বাতাস-শ্যামলে ভরা বাংলাদেশও আজ দূষণে আক্রান্ত, জনমানবের বসবাসের অযোগ্য বলে বিবেচিত। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার এয়ারভিজ্যুয়াল’ এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস’-এর ২০১৮ সালের গবেষণায় বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ৭৩টি দেশের ২০টি শহরের মধ্যে ১৮টি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। এর মধ্যে রাজধানীর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় এবং শহর হিসেবে ১৭তম। এই তালিকা তৈরি করতে বাতাসে ‘পিএমটু-পয়েন্টফাইভ’ নামের এক ধরনের সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাতাসে ‘পিএমটু-পয়েন্টফাইভ’—এর গড় মাত্রা রয়েছে ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। গ্রিনপিস ও এয়ারভিজ্যুয়ালের গবেষণা মতে, বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটতে পারে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব। বায়ু দূষণ মানবকুলের জীবিকা ও ভবিষ্যত্ ধ্বংস করে দিতে পারে। মানুষের জীবন সংহার ছাড়াও বায়ু দূষণের ফলে বিশ্বব্যাপী চিকিত্সা ব্যয় পড়ছে প্রায় ২২৫ বিলিয়ন ডলার।

ধূলিধূসরিত ঢাকার বাতাসে সাদা চোখে যে ধুলা দেখা যায় তা কিন্তু শুধুমাত্র মাটির ক্ষুদ্র কণা নয়। এর মাঝে মিশ্রিত আছে নানা ধরনের সূক্ষ্ম রাসায়নিক বস্তুকণাসহ কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন, হাইড্রোকার্বন, বেনজিন, সালফার, অ্যামোনিয়া, ফটো-কেমিক্যাল অক্সিডেন্টস। এসব ক্ষতিকর উপাদানগুলোর ব্যাপকহারে নিঃসরণ শহরে বসবাসকারী বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। দূষিত বায়ু মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, যা ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে শুরু করে স্ট্রোক, হূদযন্ত্র ও অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ব্যাধির কারণ হতে পারে। ঢাকার বাতাসে সিসাজনিত দূষণ জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমপক্ষে হাজার গুণ। ব্যাপক সিসা দূষণের ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত, মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ এফেক্টস ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বৈশ্বিক বায়ু দূষণ পরিস্থিতি-২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বায়ু দূষণে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু শ্বাসজনিত জটিল সমস্যার শিকার হয় এবং একই কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে ৩০ কোটি শিশু দূষিত বায়ু অধ্যুষিত এলাকায় বাস করে যার মধ্যে ২২ কোটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। আর বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ৬ লাখ শিশুর মৃত্যু ঘটে। ঢাকার অবস্থা পর্যালোচনা করে বিশ্বব্যাংক জানাচ্ছে, পারিপার্শ্বিক বায়ু দূষণের কারণে বছরে মারা যায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ এবং আবাসিক দূষণের কারণে বছরে সাড়ে ৪ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

গত ৪০ বছর ধরে ঢাকা শহরে সুউচ্চ ভবন নির্মাণসহ অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও নন-কমপ্লায়েন্স শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে বাতাসে যুক্ত হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ। বিক্ষিপ্ত নগরায়নের কারণে ৭৫ শতাংশ চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাচ্ছে। বনভূমি উজাড়ের কারণে বাতাসে বাড়িয়ে তুলছে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা। জাতিসংঘের মতে, ব্যাপক বৃক্ষরোপণের পরও গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ হেক্টর বনভূমি। এই হিসাবে প্রতি মিনিটে হারিয়ে যাচ্ছে ৮ হেক্টর বন। বাংলাদেশে গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১ লাখ ৩০ হাজার বৃক্ষ নিধন হলেও এর বিপরীতে রোপণ হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার বৃক্ষ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাতাস, জলবায়ু ও গোটা প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। গবেষণায় জানা যায়, প্রাণহানির জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে ৪র্থ বায়ু দূষণ। বায়ু দূষণজনিত মানবমৃত্যু ও অন্যান্য কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ১৯ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ মোটরযানের অনিয়ন্ত্রিত কালোধোঁয়া বাতাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন-মনোক্সাইডের বিস্তার ঘটায়। এসব উত্স থেকে সৃষ্ট মিথেন, ইথেলিন বাতাসে মিশ্রিত হয়ে প্রাণীদেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এসবেস্টস আঁশ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে ধুলাবালি, সিগারেটের ধোঁয়া ও কীটনাশক স্প্রের কণা বাতাসকে দূষিত করে মানবদেহে ক্যান্সারসহ এলার্জিজনিত নানা জটিল রোগের সংক্রমণ ঘটায়। কঠিন পদার্থ ছাড়াও দূষিত তরল বর্জ্য থেকে বাতাস অধিকতর দূষিত হয়ে থাকে। চামড়া শিল্প, রং কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, পয়ঃশোধনাগার থেকে উত্পন্ন হাইড্রোজেন সালফাইড জীবজগতের অস্তিত্বের ওপর হুমকিস্বরূপ। শক্তি উত্পাদন কেন্দ্র, প্লাস্টিক ও বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত কারখানা থেকে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেরিয়ে এবং পানিতে মিশ্রিত হয়ে বিষাক্ত নাইট্রিক এসিডে পরিণত হয় এবং নিকটবর্তী এলাকার বাতাসকে দূষিত করে। এ ছাড়া ধাতু গলানো কারখানা, কয়লা-পেট্রোল-কেরোসিনের মতো জ্বালানির সালফার বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে সালফার-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি করে যা প্রাণঘাতী এসিড বৃষ্টির কারণ। সুপার-ফসফেট কারখানা থেকে নির্গত হাইড্রোজেন-ক্লোরাইড বাতাসে মিশে প্রাণীদেহের হাড়ের ক্ষতিসাধন করে। ফটোকেমিক্যাল অক্সিডেন্টসমূহ বাতাসে মিশ্রিত হয়ে বৃষ্টিপাতে বিঘ্ন ঘটায় এবং বাতাসের তাপমাত্রা কমিয়ে উদ্ভিদ জগতের বিকাশে বাধা দেয় যা মানবদেহে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

বাতাসকে দূষণমুক্ত রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি নির্মাণাধীন নতুন ভবন ও রাস্তাঘাট থেকে উত্পন্ন ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা। শিল্প কলকলকারখানাকে শহর থেকে দূরে স্থাপন, কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পবর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাসহ যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ইটের ভাটা স্থাপন এবং ভাটায় চিমনি ব্যবহারের মাধ্যমে কালোধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে যথাযথ নিয়ম মেনে চলার নিশ্চয়তাবিধান অত্যাবশ্যক। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তার পাশে উন্মুক্ত ডাস্টবিন স্থাপন বন্ধ করতে হবে। নদীর মাধ্যমে বায়ু দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেতে ওয়াসার সিউয়েজ নিগর্মনসহ নদ-নদীর পানিতে সব রকমের কঠিন, গৃহস্থালি ও স্যানিটারি বর্জ্যের মিশ্রণ রোধ করতে হবে। নদীর পাড়ে জাহাজভাঙ্গা শিল্প, লঞ্চ, স্টিমার নির্মাণ ও মেরামতকালে নদীর পানিতে তৈলাক্ত বর্জ্যের মিশ্রণ প্রতিহত করতে পারলে নদী থেকে বায়ু দূষণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশের বায়ু দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদফতরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। রাজধানীর ধুলা কমাতে একই স্থানে বেশি পরিমাণ পানি দিয়ে কর্দমাক্ত না করে বাষ্পের মতো অল্প অল্প পানি ছিটালে ধুলা মাটিতে বসে যাবে। বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীর বায়ু দূষণ রোধ তথা পরিবেশ সংরক্ষণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ বেসরকারি সেবাদানকারী সংস্থাসমূহকে সম্পৃক্ত করে আপামর জনগণকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। জাতীয়ভাবে বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
– লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস