বাসে নৈরাজ্য থামছে না

বাসে নৈরাজ্য থামছে নারাজধানীর গণপরিবহনের নৈরাজ্য থামছে না। বার বার অভিযান পরিচালনা করেও এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না পুলিশ। ৮৭ শতাংশ বাস চালানো হয় বেপরোয়া গতিতে। বেশিরভাগ চালকই লাইসেন্সবিহীন। নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করে তারা গাড়ি চালান। এ কারণে প্রায় প্রতিনিয়তই সড়কে ঝরে প্রাণ।

সিটিং সার্ভিসের নামে চলছে প্রতারণা। সিটিংয়ের নামে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও দাঁড় করিয়ে যাত্রী নেয়া হচ্ছে। দরজা খোলা রেখে যত্রতত্র ওঠানো-নামানো হয় যাত্রীদের। প্রতিবাদ করলেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে বাস মালিকরা চুক্তিতে গাড়ি তুলে দেন অদক্ষ চালকদের হাতে। আর চালকদের অনেকেই মাদকাসক্ত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবহনের রুট পারমিট নিয়ে প্রভাবশালীরা কোনো পুঁজি ছাড়াই করছেন ব্যবসা। তারা কোম্পানি খুলে বিভিন্ন মালিকের বাস নিয়ে পরিচালনা করে থাকেন। এসব বাস মালিকরা দৈনিকভিত্তিতে ভাড়া পান। আর কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা কোনো পুঁজি ছাড়াই মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছেন। চালক ও শ্রমিকরা জানান, এ ধরনের ব্যবস্থার কারণে পরিবহনে বাস মালিকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কোম্পানিগুলোই সব নিয়ন্ত্রণ করে। চালক ও সহকারী নিয়োগ দেয় তারা। তারা সব সময় বেশি লাভের আশায় চুক্তিতে বা কম বেতনে চালক ও সহকারী নিয়োগ দিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদা দিয়ে গণপরিবহন চালানোয় গাড়ির লাইসেন্স, চালকের লাইসেন্স, ফিটনেস না থাকলেও দিব্যি চলছে বাস-লেগুনাসহ যাত্রীবাহী যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য এই অনৈতিক বাণিজ্যে জড়িত থাকায় এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয় না খুব একটা।

সর্বশেষ ১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে বাসচাপায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। চাপা দেয়া সু-প্রভাত বাসটির রুট পারমিট ছিল না রাজধানীতে চলার। এ ছাড়া এ বাসের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলাও ছিল। এ অবস্থায় বাসটি নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেছে অনায়াসে। আবরার মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো রাজধানী। নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবহন মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেই প্রশ্ন উঠেছে পারমিট ছাড়া এ বাস ঢাকার সড়কে এতদিন চলেছে কীভাবে? এদিকে অবৈধ চালক ও যানবাহনের বিরুদ্ধে চলা সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও গত শুক্রবার গাজীপুর রুটে চলাচলকারী বলাকা সার্ভিসের একটি বাস রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের গাড়িতে ধাক্কা দেয়।

অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ওই বাসটি জব্দের পরও পুলিশ জানিয়েছে, লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব বলছে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪২২টি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এসব যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিবন্ধিত, ভুয়া নাম্বারধারী ও অযান্ত্রিক যান মিলে প্রায় ৫০ লাখ যান চলছে। যার ৭২ শতাংশ ফিটনেস অযোগ্য। রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বেপরোয়া চলাচল করে। ফলে এসব বাসে দুর্ঘটনায় কারো হাত, কারো পা, কারো মাথা, কারো জীবন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে।

আর বিআরটিএ সূত্র বলছে, বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে প্রায় ২৮ লাখ। এর মধ্যে একই লাইসেন্সে একজন ব্যক্তি মোটরসাইকেল ও অন্য যানবাহন চালান। এদের বাদ দিলে চালকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ ১৮ লাখ যানবাহন ‘ভুয়া’ চালক দিয়ে চলছে। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) জানায়, ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪টি দুর্ঘটনাই বাসের কারণে ঘটেছে। এ ছাড়া ১৩০ মোটরসাইকেল, ১১৩টি ট্রাক, ৭৩টি পিকআপ এবং ৫৬টি ব্যক্তিগত গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে।

ওই সময়ে রাজধানীতে দুর্ঘটনা, আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে বাসের কারণে দুর্ঘটনাও। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ১২৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন, আহত হয়েছেন ৩৩৭ জন। ২০১৭ সালে ঢাকায় ২৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটার তথ্য দিচ্ছে এআরই। তাতে ২৭৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৩৫৮ জন আহত হয়েছিল। সে বছর ১৪৫টি দুর্ঘটনায় বাসের সম্পৃক্ততা ছিল। ২০১৮ সালে ঢাকায় ২৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬ জন নিহত হয়। আহত হয়েছিল ৫৩২ জন। সে বছর ১৩৪টি দুর্ঘটনার কারণ বাস। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোর কারণে মালিকপক্ষের টাকা পরিশোধের চাপ নিয়ে রাস্তায় নামেন চালকরা। সেইসঙ্গে লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকের সংখ্যা বাড়ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় চালকরা বেপরোয়া হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা দুই লাখের বেশি বলে তারা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ প্রসঙ্গে জানান, আমরা এসব দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা নয় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলতে চাই। কেননা আমাদের সড়কে সব অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে নৈরাজ্যকর পরিবেশে যাতায়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। নগরীর প্রতিটি বাস-মিনিবাসের ব্যবসা মূলত চালকরা নিয়ন্ত্রণ করছে। দৈনিক চুক্তিভিত্তিক ইজারায় প্রতিটি মালিক তার বাস চালকের হাতে তুলে দিয়েছেন। এতেই চালকরা যাত্রী উঠানোর জন্য বাসে বাসে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে বাস চালাতে গিয়ে বাসের নিচে কে পড়ল কার হাত বা পা গেল তা দেখার সময় নেই তাদের। তিনি বলেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। পরিবহন সেক্টরে মালিক সমিতি ও পুলিশ যেভাবে জড়িয়ে পড়েছে এটা যদি বন্ধ না হয় তবে ভবিষ্যতে এটি আরো ভয়াবহ রূপ নিবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, চাঁদাবাজির ভয়াবহতা এতটাই বেড়ে গেছে শুধু পণ্যবাহী গাড়ি নয় সদরঘাট থেকে একটি বাস গাবতলী পর্যন্ত যাতায়াত করতে গেলে তাকে প্রতিদিন ১২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নাই। বিশেষ করে রাজধানীর গণপরিবহনগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে স্বীকৃত ভালো কোম্পানিকে দিয়ে পরিচালনা করতে হবে।

পুলিশের সাবেক আইজি নুর মোহাম্মদ বলেন, সড়কে যা ঘটে যাচ্ছে তা পুরোপুরি ভীতিকর একটা অবস্থা হয়ে গেছে। আমরা বাইরে বের হলে সুস্থ বা জীবিত ফিরে আসব সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, হাইওয়েতে যে বাস, ট্রাক, লরি চলে সেগুলো খুবই বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হোসাইন আহম্মেদ মজুমদার বলেন, রাস্তা-ঘাটে সাধারণত দুইভাবে চাঁদা নেয়া হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা নেয়া হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জেলা বা পৌরসভা পর্যায়ে যে সব সংগঠনের গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট জায়গা আছে, তাদের নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেয়া আছে, চালকরা গাড়ি থামিয়ে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে পারবে এসব সংগঠনেরই ৩০-৪০ টাকা চাঁদা নেয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু দেখা যায় রাস্তা ঘাটে নামে বেনামে কিছু সংগঠন টাকা তুলে।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের নেতারা বলছেন, বেপরোয়া সড়ক পারাপার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। নিরাপদ রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ঢাকায় অন্তত ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মানবকণ্ঠ/এএম