বাসের তীব্র সংকটে ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী

বাসের তীব্র সংকটে ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী

শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন আর শ্রমিকদের অবরোধের পর রাজধানীতে গণপরিবহন সচল হলেও বাস ও অন্য গণপরিবহনের তীব্র সংকট এখনো রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে রাস্তায় গণপরিবহন কম নামায় শহর জুড়ে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন কর্মমুখী যাত্রীরা। যেসব গাড়ির ফিটনেসের সমস্যা রয়েছে, সেগুলো ঠিকঠাক করতে কারখানায় পাঠানো হয়েছে। আর লাইসেন্স না থাকা চালকরা লাইসেন্সের আবেদন করেছেন। কিন্তু সেটি পাওয়ার আগে স্টিয়ারিংয়ে বসতে চাইছেন না তারা। এসব কারণে রাজধানী জুড়ে পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে।

ঈদের ছুটির সময় রাজধানীতে লোকসংখ্যা কম থাকায় সেভাবে সমস্যাটি বোঝা যায়নি, তবে ছুটি শেষে বাস সংকটের কারণে মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে দিনভর, এমনকি গভীর রাত অবধি কিন্তু বাসে উঠতে গলদঘর্ম হচ্ছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে অফিস সময়ের আগে এবং ছুটির পর যাত্রাপথের শুরুতে বাসে আসন পাওয়া গেলেও মাঝ পথে বাসে উঠাই দায় হয়ে পড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও দেখা মেলেনি কাঙ্ক্ষিত রুটের পর্যাপ্ত পরিবহন সেবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাসের দেখা না পাওয়ায় অনেকে হেঁটেই রওনা দিয়েছেন অফিসে। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত টাকা খরচ করে রিকশা কিংবা ভ্যানে অফিসের পথে রওনা দিয়েছেন। কোথাও কোথাও মিনি পিকআপগুলোও এখন যাত্রীদের ভরসা হয়ে উঠেছে। তবে বাস সংকটে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো বাস এলেও তাতে উঠতে হলে ধস্তাধস্তি করতে হচ্ছে যাত্রীদের। আর এতে যুবকরা গায়ের শক্তি খাটিয়ে যেভাবে উঠতে পারে, বয়স্ক এবং নারীরা তা পারছেন না। যাত্রী চাপে সিটিং সার্ভিস নামে চলা বাসগুলোতেও দাঁড়িয়ে যাত্রী বহন করা চলছে। আর পরিস্থিতি দেখে যাত্রীরাও তেমন প্রতিবাদ করছেন না।

বাসের চালক ও সহকারীরা জানান, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর লাইসেন্সহীন চালক ও ফিটনেস এবং অনুমোদনহীন বাস চলাচলের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আর মামলার ভয়ে কাগজপত্রহীন গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে না কোম্পানিগুলো। যেসব গাড়ির ফিটনেসের সমস্যা রয়েছে, সেগুলো ঠিকঠাক করতে কারখানায় পাঠানো হয়েছে। আর লাইসেন্স না থাকা চালকরা লাইসেন্সের আবেদন করেছেন। কিন্তু সেটি পাওয়ার আগে স্টিয়ারিংয়ে বসতে চাইছেন না তারা।

গণপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানী জুড়ে বাস সংকটের কয়েকটি কারণের একটি হলো ট্রাফিক পুলিশের কঠোর নজরদারি এবং পরিবহন সংগঠনগুলোর বিদ্যমান সক্রিয়তা। নগরজুড়ে গণপরিবহনের নৈরাজ্য ঠেকাতে ট্রাফিক পুলিশ সক্রিয় থাকায় অর্ধেকের বেশি বাস রাস্তায় নামছে না। সেই সঙ্গে বাস মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলোও এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার ফলে অযোগ্য বাসগুলো রাস্তায় নামতে দিচ্ছে না তারা। আবার যেগুলো নামছে সেগুলোকে মামলা দেয়া হচ্ছে কিংবা ডাম্পিংয়ে নেয়া হচ্ছে। এ কারণে গণপরিবহনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

গতকাল সোমবার সরেজমিন ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর আবদুল্লাহপুর, রামপুরা, মহাখালী, গাবতলি, যাত্রাবাড়ী, মিরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবহন সংকট রয়েছে। কোথাও কোথাও গণপরিবহন খুব কম অথবা বাস চলাচল করলেও নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া। এতে কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেও মিলছে না প্রতিকার। তাই নিরুপায় হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের।

রজনীগন্ধা পরিবহনের চালক সামসু বলেন, কাগজপত্র থাকলেও পুলিশ মামলা দিচ্ছে। তাই অনেক গাড়ি রাস্তায় নামছে না। তার মতে কাগজ না থাকলে মামলা দেয়া উচিত, তবে যাদের কাগজপত্র আছে তাদেরকে যেন হয়রানি না করে।

সাভার থেকে মতিঝিল রুটে চলাচল করে সাভার পরিবহন। তুলনামূলক ভালো সেবা দেয়ায় শুরু থেকে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কোম্পানিটি। তবে বর্তমানে কোম্পানিটির অনেকগুলো গাড়ি রাস্তায় নেই। এই রুটে চলাচলকারী একটি বাসে চালকের সহকারী রমিজ বলেন, আমাদের কোম্পানির ৭০টির মতো গাড়ি আছে কিন্তু এহন ২০ থাইক্যা ২৫টা বন্ধ। এইগুলো ঠিকঠাক করা হচ্ছে। মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চলাচলকারী মৈত্রী পরিবহনে একটি বাসের চালকের সহকারী জোনায়েদ জানান, তাদের কোম্পানির ৩২টি গাড়ি ছিল। বর্তমানে চলছে ১০টি। বাকিগুলো নানা ত্রুটির কারণে নামছে না। মিরপুর রোডে চলাচলকারী খাজা পরিবহনের চালক মতিয়ার জানান, তাদের ১০ থেকে ১২টি গাড়ি বসা। মালিক এগুলো নামানোর চেষ্টা করছেন।

ইটিসি বাসের মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের পর থেকে রাজধানীতে বাস চালানোটা কঠিন হয়ে গেছে। বাস ধরেই পুলিশ মামলা দিচ্ছে। ড্রাইভার ও গাড়ির কাগজপত্র থাকলে গাড়ির গ্লাস ভাঙা বা ফাটা, এমনকি রঙ ওঠার জন্য মামলা দিচ্ছে। ড্রাইভার ও মামলার টাকা দিতে দিতে সব শেষ। একজন মালিক বাঁচবে কীভাবে? তিনি আরো বলেন, আমার ইটিসি কোম্পানিতে ৮০টি গাড়ি ছিল। কমতে কমতে ১০ থেকে ১২টি ছিল। তাও এখন চলছে না, এখন মাত্র চারটি গাড়ি চলছে।

শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ঝামেলার কারণে ইতিমধ্যে অনেকে বাসের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার চিন্তা করছে। নতুন বাস তো কেউ নামাবেই না। যা আছে সেটা কমতে থাকবে। কিছু হলেই বাসের ওপর সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা কিন্তু তারা রাস্তায় এসে বাস ভাঙে, গার্মেন্টেসে বেতন হচ্ছে না, আন্দোলন করে তারা বাস ভাঙবে, সব ঝাল বাসের ওপর। মালিকরা কীভাবে বাস চালাবেন?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলাবাগান রুটে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আলম বলেন, গত কয়েকদিন থেকে রাস্তায় বাসের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়তে শুরু করেছে। তবে আগের মতো বাস রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না। আর সেটা দেখা না যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, যার কারণে মালিকরা বাস রাস্তায় নামাচ্ছেন না। তাছাড়া আমরা কোনো ত্রুটি থাকলে কোনো প্রকারের ছাড় দিচ্ছি না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি আমরাও পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এ জন্য আমরা কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। সেগুলো বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্থানে আমাদের ভিজিলেন্স কমিটি কাজ করছে। এ কারণে ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাস্তায় নামতে না দেয়ায় বাস সংকট হচ্ছে। সেগুলো উপযুক্ত করে তবে সড়কে চলাচল করবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ততদিন পরিবহন সংকটে সৃষ্ট দুর্ভোগের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস