বাল্যবিয়ে: জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই

ইফতেখার আহমেদ টিপু:
বাল্যবিয়ে বন্ধে সরকারের এত তোড়জোড় সত্ত্বেও এখনো শতকরা ৪৭ ভাগ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের নিচে। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধকল্পে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা-২০১৮’-এর মোড়ক উন্মচন অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থার (ইউনিসেফ) তথ্যানুযায়ী বিশ্বের যেসব দেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ তার একটি। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যকে যখন দুনিয়াজুড়ে সমীহের চোখে দেখা হচ্ছে, তখন এ কলঙ্ক সেই সাফল্যকে যে অনেকটাই নিষ্প্রভ করছে তা সহজেই অনুমেয়।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোরম ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় বাল্যবয়সে। সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে বাল্যবিয়ে হয়। এ ছাড়া চরম দারিদ্র্য, দুর্বল বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগ প্রক্রিয়ার অভাবকে বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে ধরা হয়। বাল্যবিয়ের মচ্ছব বইলেও বাংলাদেশে আইনত বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ ও এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের ন্যূনতম বয়স বরের ক্ষেত্রে ২১ আর কনের ক্ষেত্রে ১৮। এর চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হলে তা বাল্যবিয়ে বলে বিবেচিত হয় এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের শামিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাল্যবিয়ে আইনানুযায়ী অবৈধ হলেও এ আইনের কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাদের সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এমনকি সংসদ সদস্যদের গাফিলতির কারণেই বাল্যবিয়ে বন্ধে কোনো সাফল্য আসছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেও বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটছে। বাল্যবিয়ে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশের অর্জিত সাফল্যকে নিষ্প ভ করে তুলছে। প্রসূতি স্বাস্থ্যের জন্য এটি বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে। জনসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ফেলছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। এ আপদ বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে। দেশে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে নারী সংগঠনগুলো সর্বদাই সোচ্চার ও উচ্চকণ্ঠ। বাল্যবিবাহ নিয়ে কিছু আইনকানুনও আছে। সরকারের উচ্চপর্যায়েও মাঝে মধ্যে এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়। কিন্তু বাল্যবিয়ের প্রকোপ কমছে না। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে এ বিষয়ে কিছু জনসচেতনতা লক্ষ্য করা গেলেও বস্তি অঞ্চল, গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলের অবস্থা ভিন্নতর। উত্তরাঞ্চলেও বাল্যবিয়ের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে যেসব বিষয়কে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষার সুযোগের অভাব, অর্থনৈতিক সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চরম দারিদ্র্য, দুর্বল বিচারব্যবস্থা ও আইনগত প্রক্রিয়া, সর্বোপরি সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ কর্তৃক যৌন নির্যাতন ও চরম জেন্ডার অসমতাকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা এবং যৌক্তিক বলে মেনে নেয়া অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকে বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে।
সে অবস্থায় শৈশব ও কৈশোরে একটি মেয়ে স্কুলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিজেকে অনিরাপদ বোধ করবে সেটাই স্বাভাবিক। বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজে অতি প্রাচীন একটি রোগ। শিক্ষা ও সভ্যতার আলো বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই রোগ থেকে সমাজ ক্রমশ মুক্তি লাভ করছে। কিন্তু সমাজে এখনো এমন মানুষের সংখ্যা অনেক, যারা এই রোগ থেকে মুক্ত নন। তারা মেয়ের জন্য ভালো কোনো ‘সম্বন্ধ’ এলেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মেয়ের বয়সের দিকে না তাকিয়েই ‘উপযুক্ত’ পাত্রের হাতে তুলে দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া শুরু করেন অথচ এই কাজটির মাধ্যমে মেয়ের কত বড় ক্ষতি করতে যাচ্ছেন, তা একবারও ভাবেন না। মেয়ের শারীরিক বৃদ্ধি বা পরিবর্তন পূর্ণতা পাওয়ার আগে বিয়ে দিলে কী ধরনের ক্ষতি হয়, সে সম্পর্কেও তাদের বিশেষ জ্ঞান নেই। এই কারণেই আইন করে বিয়ের বয়স নির্দিষ্ট করে দেয়া সত্ত্বেও সারাদেশেই এখনো ব্যাপক হারে চলছে বাল্যবিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সমাজের অগ্রসর নাগরিকদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বাল্যবিয়ে রোধে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাই, বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ দ্রুত মুক্তি পাক।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক নবরাজ