বাদপড়া মন্ত্রীরা আসছেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে নতুন সরকার গঠন করেছে। নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদে আনা হয়েছে নতুন এমপিদের। বাদ দেয়া হয়েছে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের। বাদপড়া মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকে আবার নতুনদের উৎসাহ দিয়ে হাসিমুখেই বিদায় নিয়েছেন মন্ত্রণালয় থেকে। তবে তারা রয়েছেন আলোচনার মধ্যেই। মন্ত্রিত্ব না পেলেও তাদেরকে রাখা হচ্ছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে। বাদ পড়া হেভিওয়েট মন্ত্রীদের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চতুর্থবারের মতো শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করতে যাচ্ছেন এমনটাই জানিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড।

সংসদের কার্যপ্রণালিবিধি অনুযায়ী, কমিটির দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা করা, মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা এবং বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেয়া বা সুপারিশ করা। কোনো কারণে কমিটির বৈঠক আহ্বান করা সম্ভব না হলে স্পিকার কমিটির সচিবকে বৈঠক আহ্বানের নির্দেশ দিতে পারবেন। সংসদের স্পিকার সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে থাকেন। তবে কাকে কোন বিভাগে, কোন পদে বসানো হবে তা সবই করে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। গত কয়েকটি নির্বাচনের পর দেখা গেছে, নির্বাচিত এমপিরাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্য হয়ে ছিলেন। প্রতিটি কমিটির একজন সভাপতি হয়ে থাকেন। ৮ জন থেকে ১৫ জন বিশিষ্ট কমিটি হয়ে থাকে। কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। সেই কমিটির সদস্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দশম জাতীয় সংসদের প্রথমবার ২৪টি এবং পরের বার ২৬টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছিল। মোট ৫০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন হয়েছিল। সংসদ অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতিক্রমে সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে সরকারি অর্থ কমিটি এবং বিশেষ অধিকার কমিটিসহ বেশ কিছু সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এসব কমিটির কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিল বিবেচনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনা এবং সঠিকভাবে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের বিষয় পর্যালোচনা করা। সংসদ কর্তৃক প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধিমালা দ্বারাই এসব কমিটির প্রায়োগিক দায়দায়িত্ব, সামগ্রিক কর্ম তৎপরতা এবং কার্যপরিধি নির্দেশিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এসব কমিটির আওতায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপকমিটি গঠনেরও বিধান রয়েছে। সংসদে স্থায়ী কমিটিগুলো হলো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি, অর্থ ও হিসাব নিরীক্ষা কমিটি এবং অপরাপর স্থায়ী ধরনের কমিটি। তবে বাছাই কমিটি ও বিশেষ বিষয় সম্পর্কিত কমিটিগুলো এদের থেকে আলাদা।

প্রথম সংসদের অধীনে ১৪টি কমিটি গঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংসদে কমিটির সংখ্যা ছিল ৫১, স্বল্প মেয়াদি তৃতীয় সংসদে ৬ এবং চতুর্থ সংসদে ৪৮টি। সময়ের পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় কার্যপরিধি বৃদ্ধির কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সংখ্যা পঞ্চম সংসদের অধীনে ৫৩ এবং সপ্তম সংসদে ৪৮-এ দাঁড়ায়। একই সঙ্গে উপকমিটির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তম সংসদ গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রধান ছিলেন সংশ্লিষ্ট মমন্ত্রীরা। সপ্তম সংসদের পঞ্চম অধিবেশনেই কার্যপ্রণালী বিধিতে একটি সংশোধনী গৃহীত হয়। এ সংশোধনী অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির সবগুলোতেই মন্ত্রীদের পরিবর্তে এমপিদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে কার্যকরভাবে জবাবদিহিতা আদায়ে কমিটিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অষ্টম সংসদে স্ট্যান্ডিং কমিটির সংখ্যা ছিল ৪৮ এবং ২০০৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এ সংসদে ১৩১টি উপকমিটি গঠন করে। এসব কমিটি ও উপকমিটি অক্টোবর ২০০১ থেকে জুলাই ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে যথাক্রমে ১১৫৭ এবং ৪২১ টি সভায় মিলিত হয়। উক্ত সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি ১২টি প্রতিবেদন পেশ করে। ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে নবম জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার পর সংসদে দলীয় প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে সংসদের সমন্বয়ে ৪৮টি কমিটি গঠন করা হয় এবং এসব কমিটির দুটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলীয় এমপি রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে যে কোনো ব্যক্তিকে যে কোনো জায়গায় বসাতে পারেন। এটা শুধু মাত্র প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্য এমপিরা হয়ে থাকেন। এবারো এই কমিটিগুলোতে নির্বাচিত এমপিরা থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী চাইলেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি থেকে শুরু করে সদস্য বানাতে পারেন।

সংসদীয় উপদেষ্টা ও স্থায়ী কমিটিসমূহ: কার্য উপদেষ্টা কমিটি, কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পিটিশন কমিটি, সংসদ কমিটি,আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি, বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি, অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
এ ছাড়া রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিদ–্যৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। 

মানবকণ্ঠ/এআর