বাড্ডায় অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি

রাজধানীর ক্রাইম জোন হিসেবে খ্যাত বাড্ডায় খুনোখুনি থামছে না। প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের হামলায় পড়ছে একের পর এক লাশ। এলাকার ডিস ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদবাজি ও গরুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ঘটছে এসব সিরিয়াল কিলিং। বাড্ডার আন্ডারওয়ার্ল্ডে একাধিক পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। সুদূর বিদেশ থেকেও একাধিক গ্রুপের কলকাঠি নাড়া হচ্ছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি। তা ছাড়া খুব অল্প টাকায় ভাড়াটে কিলার মেলায় সাম্প্রতিক সময়ে বাড্ডা এলাকার খুনোখুনি বেড়ে গেছে বলে গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্র বলছে।

একই সূত্র মতে, গত ৫ বছরে বাড্ডা এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ডিশ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রতিটি খুনের ঘটনা ঘটেছে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে। এসব হত্যকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েক সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তবু থামেনি বাড্ডায় খুনোখুনি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপতৎপরতা। পবিত্র কোরবানির ঈদের পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরো হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ ১৮ জুন রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় মসজিদ থেকে জুমাতুল বিদার নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর সন্ত্রাসীদের গুলিতে ফরহাদ আলী (৫৫) নামে আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হন। নিহত ফরহাদ ছিলেন বাড্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নবগঠিত ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ আলী হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন দুই ‘ঘাতক’ নুরুল ইসলাম সানি ২৮ ও অমিত বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে দুটি পিস্তল ও কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এরা দু’জনই পেশাদার সন্ত্রাসী ও কিলার হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে দাবি ডিবির। এমন আরো অনেক পেশাদার কিলার বাড্ডায় রয়েছে। মাত্র ১০-১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্র বলছে, দক্ষিণ বাড্ডা এলাকায় ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবু। ওই এলাকার ডিশ ব্যবসা দখলে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সন্ত্রাসী ডালিম-রবিন গ্রুপ। ডালিম-রবিন গ্রুপের গডফাদার হলো মেহেদী গ্রুপ। মেহেদী আমেরিকায় থেকে বাড্ডা এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কলকাঠি নাড়ছেন। ডালিম-রবিন গ্রুপের প্রধান দু’জন মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখান থেকে বাড্ডার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি অংশ তারা নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার এই এলাকার বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে মেহেদী গ্রুপ। এসব গ্রুপের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক রাজধানীর বাড্ডা এলাকার খুনোখুনি বেড়ে গেছে। ৯ মে ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দক্ষিণ বাড্ডার জাগরণী ক্লাবে আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত একাধিক ঘাতক পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

এর আগে ২২ এপ্রিল বাড্ডার বেরাইদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখুকে স্থানীয় এমপির ভাগ্নে ফারুক আহমেদের গ্রুপ প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনেদুপুরে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে ঢুকে রবিন গ্রুপের নির্দেশনায় আবুল বাশার নামে আরেক সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কিলার নুরাকে অস্ত্রসহ আটকের পর পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

এর আগে ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট রাতে বাড্ডার আদর্শনগর পানিরপাম্প এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বাড্ডার ছয় নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা, ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ মানিক, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামা এবং যুবলীগ নেতা আব্দুস সালাম।

তারও আগে ২০১৪ সালের ৩ মে বাড্ডা জাগরণী ক্লাবের ভেতর বাড্ডা থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মোফাজ্জল হোসেন রাহিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর দিনদুপুরে গুলি ও বোমা ছুড়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মামুনকে। এ ছাড়া চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে গত ৫ বছরে বাড্ডায় খুন হন সাইদুর, মাসুম, আলা, রুবেল ও তাইজুলসহ আরো অনেকে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, বাড্ডায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেপথ্যের কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পেরেছে পুলিশ। ডিবির ডিসি বলেন, একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের কলকাঠি নাড়া হচ্ছে মালয়েশিয়া ও আমেরিকা থেকে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে জোরদার গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে চলছে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার অভিযান।

একই প্রসঙ্গে বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ ও ডিস বাবু ও কামরুজ্জামান দুখুসহ সাম্প্রতিক প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত অধিকাংশ আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এদের কেউ কেউ পুলিশের অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। প্রত্যেকটি মামলার তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি রয়েছে।

ওসি দাবি করেন, বাড্ডা এলাকায় পেশাদার ও ভাড়াটে কিলার থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে জোরদার পুলিশি অভিযান চালানো হচ্ছে। খুঁজে বের করা হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস। সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে কোনো কোনো সন্ত্রাসী এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.