বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

হালখাতার আপ্যায়ন ও খাতা :
হালখাতা! বছর শেষে আগের সব হিসাব চুকিয়ে নিয়ে ব্যবসায়ীদের নতুন করে শুরুর আনুষ্ঠানিক উদ্যোগই হাল খাতা। এ উপলক্ষে নিমন্ত্রণপত্র ছাপানো হয়। এ নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক ও শুভার্থীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। এদিনে আগত অতিথিদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। এতে ব্যবসায়ী ও অতিথিদের মধ্যে নতুন যোগসূত্র স্থাপন হয়। গ্রামের হালখাতা আর শহরের হালখাতার মধ্যে একটু ভিন্নতা দেখা যায়। গ্রামের হালখাতাতে ব্যবসায়ীরা বৈশাখের প্রথম দিনে সকালে এসে দোকান পরিষ্কার করে কাগজের ফুল দিয়ে সাজান বর্ণিল সাজে। দোকানের সামনে কারিগরকে দিয়ে তৈরি করান নানা রকমের মিষ্টান্ন। যেমন- গরম জিলাপি, বাতাসা, সন্দেশ, কদমা, দানাদার ইত্যাদি। বড় দোকান হলে রসগোল্লা, চমচম, কালোজামের ব্যবস্থাও থাকে। এগুলো দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় খদ্দেরকে। কেউ বা খদ্দেরকে আপ্যায়ন করান দই-চিড়া-মিষ্টি বা বুন্দিয়া দিয়ে। বর্তমানে হালখাতা অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের মাত্রা কমে গেছে। এখন হয়তো হালখাতার অতিথিদের সেইভাবে অ্যাপায়ন করা হয় না। তবে বাঙালি ঐতিহ্যের একটা অংশ যে ধরে রাখা হয়েছে, সেটাই বা কম কিসে। হালখাতা শব্দটা শুনলেই মনে হয় একটা লাল রঙের মোটা খাতা। কিন্তু শুধু একটা খাতাতে হালখাতা শব্দের মাহাত্ম্য শেষ হয়ে যায় না। হালখাতা একটা ঐতিহ্য। হালখাতা একটা রেওয়াজ। হালখাতা একটা উৎসব। সেই সম্রাট আকবরের আমল থেকে ব্যবসায়ীরা এই হালখাতা পালন করে আসছে। অতীতে মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় আড়তদার, সবার একটা বাকির খাতা থাকতো।
বছরের প্রথম দিন সবাই সেই বাকি চুকিয়ে খাতার হিসাব বন্ধ করতো। আর নতুন হিসেবের খাতা খুলতো। এই হালখাতা রেওয়াজ শুধু বাকি পরিষদ বা দেনা পাওনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হালখাতার এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়তো। দেনাদার পাওনাদারের মধ্যে টাকার হিসেবের বাইরের যে সম্পর্ক তারই বহিঃপ্রকাশ এই হালখাতা।

বলীখেলা
বলীখেলা চট্টগ্রামের একটি লোকক্রীড়া। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই লোকক্রীড়াটি কবে শুরু হয়েছিল তার সঠিক তথ্য জানা যায় না। অনেকের মতে মুঘল আমলে এ খেলা শুরু হয়েছিল এবং মুসলিম আমলেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘মল্ল’ বা ‘বলী’ উপাধিতে ভূষিত বহু হিন্দু-মুসলমান পরিবারের অস্তিত্বই তার প্রমাণ। বিত্তবান ভূস্বামীরা তখন নিরাপত্তা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য বেতনভোগী নামিদামি কুস্তিগির রাখতেন। তাদের দৈহিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হতো বলীখেলার মাধ্যমে। বিজয়ীরা ‘বলী’ (বলবান) হিসেবে নন্দিত হতো। বলীখেলার স্বর্ণযুগ ছিল প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কাল পর্যন্ত। সে সময় চট্টগ্রাম জেলার সর্বত্র চৈত্র থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে বলীখেলার আয়োজন করা হতো। তখন ওই অঞ্চলের অনেকেই ছিলেন ইয়াংগুন তথা মায়ানমার প্রবাসী। তাদের বলা হতো ’রেঙ্গুইন্যা’। রেঙ্গুইন্যাদের হাতে ছিল প্রচুর অর্থ এবং তারাই ছিল বলীখেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পরবর্তীকালে রেঙ্গুইন্যাদের ছাড়াও দেশের অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বও বলীখেলার প্রচন্ড সমঝদার ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজল বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে বলীখেলার আয়োজন করতেন। পাকিস্তান আমলের জনৈক মন্ত্রী একে খানও যৌবনে বলীখেলায় অংশ নিতেন বলে জানা যায়। ঢাকার নবাব আবদুল গনিও ছিলেন বলীখেলার একজন সমঝদার পৃষ্ঠপোষক। তিনিও ঢাকার শাহবাগে একাধিকবার বলীখেলার আয়োজন করেছিলেন। পৃষ্ঠপোষকের অভাবে বর্তমানে বলীখেলার ধুমধাম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামে বর্তমানে যে খেলা প্রচলিত আছে তার প্রবর্তন করেন আবদুল জববার সওদাগর ১৯০৯ সালে। তার লক্ষ্য ছিল বিট্রিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুব সমাজকে সংগঠিত করা।

বাঙালির চৈত্রসংক্রান্তি
‘বছরের শেষ দিন, চৈত্রের শেষ রেখো না দুঃখ-স্মৃতি, কষ্টের লেশ ভুলে যাও দ্বিধা লাজ আর যত ভয় খুঁজে নাও সুখ-স্মৃতি, করে নাও জয়।’ একই সঙ্গে দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্র্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ। এক সময় চৈত্র থেকে বর্ষার শুরু পর্যন্ত সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ থাকতো। সূর্যের সেই তেজ প্রশমন ও বৃষ্টি লাভের আশায় কৃষিজীবীরা চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতেন। সনাতন শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পূণ্যজনক বলে মনে করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তির এই উৎসব জুড়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান আকর্ষণ চড়ক গাজন। এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরি সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত ও দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরির সঙ্গে নেচে চলে। এদিনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে লোকৎসবের আসর। মেলা, গান-বাজনা ও যাত্রাপালাসহ নানা আয়োজনে উঠে আসে লোকজ সংস্কৃতির নানা সম্ভার। বায়াস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা থাকে সেখানে। বাঙালি যেদিন চৈত্রসংক্রান্তি পালন করে সেদিন আদিবাসী সম্প্রদায় পালন করে তাদের নিজস্ব বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান- বৈসাবি। রয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পানি উৎসব ও গড়িয়া নৃত্যসহ মনোজ্ঞ প্রদর্শন ও সাপখেলা।