বাংলামোটরে এক ছেলের মরদেহ ও আরেক ছেলেকে জীবিত উদ্ধারসহ বাবা আটক

বাংলামোটরে এক ছেলের মরদেহ ও আরেক ছেলেকে জীবিত উদ্ধারসহ বাবা আটক

রাজধানীর বাংলামোটরের এক বাড়ি ঘিরে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান শেষে নূর সাফায়েত নামে আড়াই বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় তার বড় ভাই সুরায়েতকে (৪) জীবিত উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তাদের ‘মাদকাসক্ত’ বাবা নুরুজ্জামান কাজলকে আটক করা হয়েছে।

বুধবার সকালে বাংলামোটরের লিংক রোডের খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের ১৬ নম্বর বাড়ির ভেতর এক বাবা তার দুই শিশুসন্তানকে ‘জিম্মি’ করে রেখেছেন— এমন সংবাদে বাসাটি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু বাসার ভেতরে রামদা নিয়ে অবস্থান নেয়ায় পুলিশের পক্ষে নুরুজ্জামানকে ধরতে বেগ পেতে হয়। ভেতর থেকে বাড়িটিতে প্রবেশের গেটে তালা মারা থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযান বিলম্বিত হয়। পরে পুলিশ কৌশলের আশ্রয় নেয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে র‌্যাব-২ এর কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম পরিস্থিতি বুঝতে কৌশলে বাড়িটির ভেতরের একপাশে যান।

ফিরে এসে তিনি জানান, একটি টি টেবিলের ওপর বাচ্চাটাকে কাফন পরিয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় তিনি মাদকাসক্ত ওই বাবার কাছে জানতে চান তার সহযোগিতা প্রয়োজন কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, কাউকে লাগবে না। আমি ১টার দিকে বের হয়ে আজিমপুর গিয়ে ছেলেকে দাফন করব। আপনাদের কে ডেকেছে? আপনাদের কাউকে লাগবে না। শহিদুল জানান, সকালবেলায় তিনি একজন মৌলভীকে ঘরে ডেকে নিয়ে গেছেন।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ৭টার দিকে নুরুজ্জামান তার আরেক ছেলে সুরায়েতকে কোলে নিয়ে একটি রাম দা হাতে বাসার সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেছেন। তার আগে পাশের মসজিদের মাইকে জানিয়ে দেন তার ছোট ছেলে মারা গেছে।

স্বজনদের দাবি, মাদকাসক্ত কাজলই তার ছোট ছেলে সাফায়েতকে খুন করে বড় ছেলে সুরায়েতকে জিম্মি করে বাড়ির ভেতরে ওই জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। তবে আটক হওয়ার পর কাজল পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, সাফায়াতের মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক শকে, তিনি তাকে হত্যা করেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেন, ছেলেটার গায়ে কোনো কাটা ছেঁড়া বা ক্ষত নজরে আসেনি। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে আমরা বলতে পারছি না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার আগে আমরা তার বাবা বা কাউকে দায়ী করছি না।

তিনি আরো বলেন, পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে ভাইবোনদের সঙ্গে নুরুজ্জামানের বহুদিনের দ্বন্দ্ব্ব ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই বাড়ি ঘিরে নাটকীয়তার সূচনা হয় বুধবার সকাল ৮টার দিকে। কাজল স্থানীয় এক মাদরাসায় গিয়ে বলেন, তার ছোট ছেলে সাফায়েত বিদ্যুত্স্পৃষ্টে মারা গেছেন। তিনি ছেলের মৃত্যুসংবাদ মাইকে ঘোষণা করতে অনুরোধ করেন এবং কুরআন খতমের জন্য মাদরাসা থেকে কাউকে বাসায় পাঠাতে বলেন। তার কথায় মাদরাসা থেকে একজন ওই বাসায় গিয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন। এদিকে কাজল তার ছেলেকে হত্যা করেছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এই খবর পেয়ে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা বাংলামোটরের ওই বাড়িতে উপস্থিত হন। বাবার হাতে ছেলে খুনের গুঞ্জনে কয়েকশ’ উৎসুক মানুষ ওই বাড়ির সামনে ভিড় করে। ছুটে আসেন সংবাদকর্মীরা। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন কাজল। ছেলেকে কোলে নিয়ে দা হাতে তিনি নেমে এসে সিঁড়ির কাছে কলাপসিবল গেট আটকে দেন। এ সময় নুরুজ্জামান কাজলের বড় ভাই নুরুল হুদা উজ্জ্বল কাজলকে শান্ত করে সুরায়েতকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও তাতে লাভ হয়নি। গোয়েন্দা পুলিশের এক সদস্য ওই বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করলে কাজলের দায়ের কোপে হাতে আঘাত পান।

র‌্যাব-২-এর উপপরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বেলা ১২টার দিকে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির বাবা বসে আছেন, তার পাশে একজন হুজুর বসে আছেন। শিশুটিকে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো একটি টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবাকে কোনো সাহায্য লাগবে কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাদের কারও সাহায্য লাগবে না। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা চলে যান। বেলা একটার দিকে আমি নিজে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে আমার ছেলেকে দাফন করব। নানাভাবে বোঝানোর পর বেলা ২টার দিকে পুলিশ কৌশলে নুরুজ্জামান কাজলকে নিচ তলার সিঁড়ির কাছে নিয়ে এলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার বড় ছেলে সুরায়েতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে ঘরের ভেতর থেকে ছোট ছেলে সাফায়াতের কাফনে জড়ানো লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

প্রতিবেশীরা জানান, কাজলদের পরিবার ওই এলাকার পুরনো বাসিন্দা। তার বাবা মনু মেম্বারও স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিত ব্যক্তি। কাজল নিজেই বাংলামোটর লিংক রোডের ১৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওই বাড়ির মালিক। কাজলের বাড়ির পাশে তার আত্মীয় স্বজন বেশ কয়েকজনের বাড়ি আছে। তবে মাদকাসক্তির কারণে কাজলের সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কও ভালো ছিল না।

আকিল জামান নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, কয়েক মাস আগে স্ত্রীকেও মারধর করেন কাজল। প্রতিবেশীরা এসে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। নির্যাতন সইতে না পেরে স্ত্রী চলে গেছেন। বাচ্চা দুটো বাবার সঙ্গে ছিল।

কাজলের বড় ভাই নুরুল হুদা উজ্জ্বল বলেন, ও (কাজল) সারাদিন নেশা করে, খায় আর ঘুমায়। এটা ওর নিজের বাড়ি। চাচার সঙ্গে গত ঈদের আগেও মারামারি করেছে। এতদিন আমরা সহ্য করছি, পুলিশ আনি নাই, শুধু ওই বাচ্চাগুলোর কারণে। এখন বাচ্চাটাকেই মেরে ফেলছে। কাজলের মার খেয়ে ওর বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। বাসায় দুই বাচ্চা নিয়ে ও থাকত। আজকে এই কাণ্ড করল।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, বড় ছেলেটার কথা চিন্তা করে আমরা একটু সময় নিয়ে অভিযান চালাতে চাই। পরে পুলিশ কলাপসিবল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাজলকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে। এক পর্যায়ে তাকে বলা হয়, জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে, সাফায়েতের জানাজা পড়াতে হবে। পুলিশের এ কথায় কাজল সিঁড়ির কাছে নেমে এলে পুলিশ সদস্যরা তাকে ধরে ফেলেন এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা সুরায়েতকে সরিয়ে নেন।

ওসি আবুল হাসান আরো জানান, শিশুর বাবা এর আগে মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাকে জেলেও পাঠানো হয়। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন। কাজলের আচার-আচরণের জন্য পরিবারের সদস্যরা তার ওপর বিরক্ত ছিলেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.