বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কি?

বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক এখন আসলে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে? আজ মানে ১১/৯ তারিখে মিডিয়া খুলে দেখি সর্বত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির ছবি জ্বলজ্বল করছে। ভারত আমাদের বিশাল প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকা সবদিক থেকে জরুরি। কারণ নেহরুর ভারত আর আজকের ভারতে অনেক তফাৎ। এখনকার ভারত এক পরাশক্তিও বটে।

কিন্তু এটাও মানতে হবে একাত্তরের ভারত আর আজকের ভারত এক না। ফুলে ফেঁপে বলশালী দেশটির রাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তন। সেদেশের সরকারে এখন বিজেপি। বিজেপি হিন্দু দল। সেটা বলতে বা বলায় তাদের কোনো লজ্জা নাই বরং মোদির নেতৃত্বে ভারতের যে অগ্রগামী ভূমিকা সেটা এখন বিশ্বেও স্বীকৃত। আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়টা বিজেপি আমলে ব্যাহত হতে পারে এমন ধারণা বদ্ধমূল ছিল। কারণ কংগ্রেস আর আওয়ামী লীগ একাত্তরে এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি ইন্দিরা মুজিব সম্পর্কও ছিল দু’দেশের ভালোবাসার সূত্র।

সময়ে আজ তারা যেমন নাই কংগ্রেসও হীনবল। রক্তের উত্তরাধিকার ভারতের রাজনীতি বেশিদিন মানেনি। তারা ফিরে এসেছে তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনায়। জাতীয়তাবাদ নানাভাবে, নানা কারণে তার চেহারা বা আদল ঠিক করে। রাষ্ট্র, সমাজ, ভাষা এমনকি ধর্মের ভিত্তিতেও জাতীয়তাবাদের বিস্তার হয়। এখন যে জাতীয়তাবাদ ভারতকে একত্রিত করে রেখেছে তার পেছনে ধর্মভিত্তিক পরিচয় প্রধান। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে মোদির আমলে সাম্প্রদায়িকতা বা তেমন কিছু ততটা বেগবান হতে পারেনি। বহুমত ও পথের সমন্বয় কিংবা ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যই হয়তো তাদের জায়গাটা ধরে রাখে। যা আমরা পারি না।

ভারত যেমন রক্তের উত্তরাধিকার ছেড়ে আসতে পেরেছে আমরা পারিনি। বলছিলাম আমাদের মিডিয়াজুড়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে গুণগান তা মিথ্যা হয়তো নয়, কিন্তু এটাও সত্য ভারতবিরোধিতা এখনো আমাদের রাজনীতির এক বিষফোঁড়া। এর জন্য কে, কতটা দায়ী সেটা সবাই কম-বেশি বোঝেন। বুঝি না যেটা সেটা হচ্ছে, কী কারণে ভারতবিরোধিতা আর সাম্প্রদায়িকতা সমার্থক? আওয়ামী লীগ বেশ বুঝতে পারে এই বিশাল প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ করে লাভ হবে না।

আমেরিকার কথাই ভাবুন। পাশের দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মনোহর না বরং আছে নানা সমস্যা। এমনকি জলসীমায় বিদ্যুৎ দিয়ে লোকপাচার বন্ধ করার মতো কাজও হয় সেখানে। আছে কাঁটাতার। কিন্তু ফেলানী আছে কিনা সেটা জানি না। যে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের দেশ ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বৈরীতা সেগুলো নিয়ে রাজনীতির মাথাব্যথা নাই বরং তাকে জিইয়ে রাখাই যেন আমাদের কাজ।

একটা বিষয় আমরা সবাই জানি, ভারতের নিন্দা বা তার নামে গায়ে জ্বালা ধরলেও আমাদের মানুষরা ভারতভ্রমণে রেকর্ড করেন। কয়েকবছর ধরে সেদেশে যাওয়ার হিড়িক এবং সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ। নানা কারণে যেতে হয় বৈকি। বিশেষত চিকিৎসা আর কেনাকাটার জন্য ভারত এখনো প্রিয়। চিকিৎসা বিষয়টা বড় গোলমেলে। আমাদের সমাজে মেধাবী ডাক্তার কিংবা চিকিৎসকের কমতি নাই। কমতি সেবার। আমাদের চিকিৎসাসেবা মুখে যাই বলি এখনো মান্ধাতা আমলের। সঙ্গে আছে বাণিজ্য। একেকটা বড় বড় মেডিকেল সেন্টার বা নার্সিংহোম যেন ফাইভস্টার হোটেল। এর ভেতরে-বাইরে ফকফকা বটে কাজের বেলায় ঘোড়ার ডিম। মনে হবে আপনি আরামে শুয়ে থাকার জন্য সেখানে যাচ্ছেন।

না আছে সেবা না চিকিৎসা। ফলে এগুলো গরিবের রক্ত চুষলেও মধ্যবিত্ত আর ধনীদের নাগাল পায় না। খেয়াল করবেন বড় বড় মানুষ নামে পরিচিতজনরা কিছু হলেই ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপে চলে যান। এমনকি দেশের রাষ্ট্রপতিও। তাহলে যে সেবা, যে চিকিৎসায় রাষ্ট্রপতির আস্থা নাই, সাধারণ মানুষ সেখানে আস্থাশীল হবেন কী করে? ভারত হলো এ জায়গায় নিম্ন মধ্যবিত্ত, বড়জোর মধ্যবিত্তের টার্গেট। এটা এড়ানোর উপায় নাই। আর আছে কেনাকাটা। পূজা তো বটেই ঈদের আগে আপনি কলকাতায় হাঁটতে গেলে যার সঙ্গে ধাক্কা খাবেন তিনিই বাংলাদেশি।

বাণিজ্যের এমন রমরমা বাজার ভারত কেন হাতছাড়া করবে? তাই তারা রাজনৈতিকভাবে এমন সব কথা বলে মনে হয় পরম দোস্ত। আজ মিডিয়ায় এও দেখলাম মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন তিনি আবার আসবেন যখন শেখ হাসিনা ফের সরকার গঠন করবেন। এটা তার মুখের কথা না মনের কথা জানি না তবে এমন বক্তব্য সন্দেহজনক। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিতে কে সরকার গঠন করবে আর কাকে জনগণ নির্বাচিত করবেন সেটা তিনি বলে দিতে পারেন না। এর মানে কি এই অন্য কেউ গদিতে এলে তিনি আসবেন না? এই ভদ্রমহিলা বাম রাজত্বে সাধারণ নামে পরিচিত নেতাদের পোশাকে বা জুতায় চটিতে হারিয়ে দিলেও সরকারিভাবে সেখানে এক নায়কত্ব কায়েম করেছেন।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী লেখক গায়ক সবাই তাকে এমনভাবে বন্দনা করেন মনে হয় লজ্জায় কান কাটা যায়। কিছুদিন আগে নচিকেতার মতো প্রতিবাদী গায়ক বলেছেন, মমতার ভেতর নাকি লেনিনের ছায়া আছে। আগে জানলে লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলার দরকার পড়ত না। তিনি নিজে লজ্জায় ভেঙে পড়তেন। লিঙ্গভেদ ভুলে যাওয়ার মতো স্তাবকতা হয় সেখানে।

সেগুলো আমাদের বিবেচ্য নয়। আমাদের কথা হচ্ছে যে, তিস্তার পানি বণ্টন মমতার কারণে হয়নি বলে বাজারে চালু সে ব্যাপারে তার কী বক্তব্য? না এ বিষয়ে কিছু বলেন না কেন তিনি? বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নাজুকতা তো সেখানে। নাজুক সম্পর্ক সীমান্তে। আমাদের বিরোধী দলগুলোও আসলে এক ধরনের চামচামিতে ব্যস্ত। বিএনপির যত ভোট আর সমর্থন তার পেছনে এই ভারতবিরোধিতা। সেটা বুঝতে পেরে খালেদা জিয়া কী করেছিলেন? সেদেশের রাষ্ট্রপতি বাঙালি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দিন, তারিখ ঠিক করেও দেখা করেননি। সে দেখা না করার পাপ বা ভুল তাকে কী শাস্তি দিয়েছে তা আমরা সবাই জানি।

কিন্তু যেটা বুঝি না এটাই যদি তাদের আদর্শ পয়েন্ট হতো তাহলে এখন তারা প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে ভারতের সমর্থনের জন্য মরিয়া কেন? একটা তো পরিষ্কার অবস্থান থাকতে হবে। ভোটের জন্য সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য আপনারা ভারতের সঙ্গে বৈরিতার ভাব দেখাবেন আবার সুযোগ বুঝে পায়ে ধরবেন এটা কেমন নীতি? ভারতের রাজনীতি তো বাঙালিরা নিয়ন্ত্রণ করে না। যারা করে তারা খুব ভালো জানে আমরা কী চাই আর কতটা দিলে আমাদের মেরুদণ্ড সোজা থাকে না। তাই তারা সেভাবেই খেলে। এই খেলার কারণে আজ অবধি আমাদের দেশে সুষ্ঠু বিরোধিতা কিংবা গঠনমূলক সম্পর্ক কোনোটাই গড়ে ওঠেনি।

উল্টো সেদিন খবরে দেখলাম ভিসা আবেদন এত বেশি যে ঢাকা শহরে তাদের একাধিক কেন্দ্র খুলতে হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে নির্ভরতা সেটা যতদিন সুষ্ঠু ও সমার্থক না হচ্ছে বিরোধিতা মুখের কথা হয়েই থেকে যাবে। শেখ হাসিনা এখন অনেক প্রাজ্ঞ। তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়ার কারণে অনেক কথা মুখের ওপর বলতে পারেন। বিশেযত সবকিছু কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণের একটা বিষয় আছে তার ভেতর। ফলে নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বৈষম্য কমানো আর নিজেদের চাওয়া বুঝে নিতে পারেন তিনি। কিন্তু সমাজ তা মানে না। সমাজে এখনো বদ্ধমূল ধারণা আওয়ামী লীগ ভারতকে সব দিয়ে দেয়। আর এই ধারণার ভুক্তভোগী নিরীহ সংখ্যালঘু আর কিছু উদারমনা মুসলিম জনগোষ্ঠী। যারা মূলত ভারতের কোনো আনুকূল্য পায় না। ব্যবসা আনুকূল্য যারা লাভ করে তাদের অন্তরেই ভারতবিরোধিতা প্রকট।

রোহিঙ্গা, তিস্তার পানি, সীমান্ত-এমন সব জটিল বিষয়ে একটা সমঝোতা বা ভারতের ন্যায্য ভূমিকা না থাকলে এই ধোঁয়াশা যাবে না এবং সেটা জনগণের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। নইলে কাগজে-কলমে চিকিৎসায় বা বেড়াতে যাওয়ার জন্য ভালো সম্পর্ক থাকলেও খেলার মাঠ কিংবা রাজনীতিতে ও সমাজে সম্পর্ক হবে সাপে-নেউলে। এটা কারো কাম্য নয়। বাড়িতে বাড়িতে ভারতীয় টিভির সিরিয়াল, ভারতীয় মুভি আর কথায় কথায় তাদের বিরুদ্ধাচারণের কারণগুলো খুঁজে বের করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু জানলেও তার সমাধান চাই না আমরা। জিইয়ে রাখতে পারলে রাজনীতির লাভ।

বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ইলিশ জামদানি কিংবা মৌখিক আশ্বাসের বাইরে পা রাখলে উভয় দেশের জনগণের লাভ। এটা মানতেই হবে প্রকৃতি বা নিয়তি আমাদের এমনভাবে রেখেছে কেউ কাউকে এড়াতে পারবে না। সঙ্গে আছে ঐতিহ্য আর পূর্বের ইতিহাস। তাই ভারতকে যেমন নমনীয় ও উদার হতে হবে আমাদেরও মেরুদণ্ড টান টান রাখা প্রয়োজন। এই আমলে কিছুটা হলেও এখনো আমরা পুরোটা পারিনি। বন্ধুত্ব হয় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই কথাটা যেন ভুলে না যাই আমরা। লেখক : সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএএম