‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে কোন অনিয়ম হয়নি’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণের মানে কোন হেরফের হয়নি বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা সরাসরি প্রত্যাখান না করলেও মানতে নারাজ বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।

একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভুতুড়ে কাণ্ড’ শীর্ষক প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতেই এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রবিউল হাসান, ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের মহাব্যবস্থাপক জি এম আবুল কালাম আজাদ, কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী ও ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক সুলতান মাসুদ আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শুল্প গোয়েন্দার প্রতিবেদন তাদের নিজেদের। তবে তদন্ত চলাচালীন সময়ে আমাদের সঙ্গে তাদের বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধিতা ছিলো। তখন আমরা তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে স্বর্ণের মান পরীক্ষা করাতে আণবিক শক্তি কমিশনের নাম প্রস্তাব করি। তবে তাতে সংস্থাটি রাজি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী পরিচালক এস এম রবিউল হাসান বলেন, শুল্প গোয়েন্দার বরাত দিয়ে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে তা সঠিক নয়, বস্তু নিষ্ট নয়। তবে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূতি নষ্ট হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দৈনিকে প্রতিবাদ পাঠানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা ধাতু বদলে যাবার কোন সুযোগ নেই। তবে এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত পরিচালনা করে। ওই সময় তাদের সঙ্গে আমাদের বিরোধ হয়। সংস্থাটি ভাড়া করা মেশিন নিয়ে স্বর্ণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে আসে। ফলে এটি তাদের নিজস্ব প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠিয়েছেন। আমরা তার প্রতিটি অংশ ব্যাখ্যা করে জবাব দিয়েছি। গত ১১ জুলাই তা এনবিআর চেয়ারম্যানকে পাঠানো হয়েছে। স্বর্ণের মান পরীক্ষার পদ্ধতির কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ম্যানুয়ালি স্বর্ণের মান পরীক্ষা করে শুল্প গোয়েন্দাকে স্বর্ণ গ্রহণের প্রত্যয়পত্র দেওয়া হয়। তবে সেখানে কিছু ক্লারিক্যাল মিসটেক ছিলো। আমাদের নিজস্ব স্বর্ণকার স্বর্ণ পরীক্ষা করে ৪০ শতাংশ স্বর্ণ বলে মত দেন। তবে সেটি ভুলে প্রত্যয়নে ৮০ শতাংশ লেখা হয়। পরে বিষয়টি বেরিয়ে আসে। তখন শুল্প গোয়েন্দার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাদের এ সংক্রান্ত প্রত্যয়পত্রও দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকারও পরে সেটি সংশোধন করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বলছে, শুল্প গোয়েন্দা একটি ভাড়া করা মেশিন দিয়ে স্বর্ণের মান পরীক্ষা করিয়েছে। আমরা এটি আমলে কেন নেব। সেটি তাদের ব্যাপার। তবে তারা আমাদের প্রস্তাবে তৃতীয় কোন পক্ষের কাছে যেতে রাজি হয়নি। রাষ্ট্রের জিম্মাদার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে কোন অনিয়ম হয়নি।

এদিকে শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টমস হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি স্বর্ণের চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত স্বর্ণের রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণ হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। তবে দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) স্বর্ণ পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ স্বর্ণ (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শুল্প গোয়েন্দারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বর্ণের মান পরীক্ষা করে জমা করতে আসেন। তবে আমরা ম্যানুয়ালি করি। তবে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। জাপান থেকে একটি মেশিন ৪ কোটি টাকা দিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেটি অনেক সময় ভুল প্রতিবেদন দিচ্ছিলো। তাই মেশিনটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাচিত স্বর্ণকার আছেন। তিনি যাচাই বাছাই করে স্বর্ণের মান নির্ধারণ করে দেন। কেন একজন স্বর্ণকারের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য এর আগে এমন পরিস্থিতি হয়নি। এখন বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা হবে। তবে শুল্প গোয়েন্দা প্রতিবেদন কতটা গ্রহণযোগ্য সেই বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের নিজস্ব কোন মেশিন নিয়ে তারা আসেনি। আমরা আণবিক শক্তি কমিশনে সব স্বর্ণ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এতে শুল্প গোয়েন্দা সারা দেয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ভল্ট খুবই সুরক্ষিত। সেখানে ৬ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চাইলেই কেউ ঠুকতে পারে না। এমনকি গভর্নরও প্রবেশ করতে পারেন না। একটি চাবি দিয়ে ভল্ট খোলা যায় না। তাই প্রতিবেদনে প্রকাশের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়গুলো স্পষ্ট করা যেতো।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ