বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন শঙ্কা : ফেঁসে যাচ্ছেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন শঙ্কা : ফেঁসে যাচ্ছেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা

মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলে সেখানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় বয়ে যেতে পারে। কারণ, দেশটির সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিকারকদের ১০ সদস্যের একটি সিন্ডিকেট এই শ্রমবাজার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। এই কাজে সহযোগিতা করেছেন মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েক বাংলাদেশি জনশক্তি ব্যবসায়ী।

জানা গেছে, দেশটিতে মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এবং সেখানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করায় সিন্ডিকেটের এসব সদস্য আত্মগোপন করেছেন। এতদিন সেখানে বাংলাদেশের শ্রমবাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করত সেই সিন্ডিকেটের হাতে এখনো প্রায় ৫০ হাজার ভিসা রয়ে গেছে। ফলে সিন্ডিকেটের এসব সদস্য যদি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকেন, তাহলে এই ৫০ হাজার ভিসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। অথচ এই ৫০ হাজার ভিসার জন্য বাংলাদেশের কর্মীদের কাছ থেকে যে হাজার কোটি টাকা অগ্রিম নেয়া হয়েছে তার কী হবে তা চিন্তার কারণ। এ ছাড়া দেশটির নতুন সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সিন্ডিকেটের এসব সদস্য গ্রেফতার হলেও কর্মীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলে জনশক্তি রফতানিকারকরা নতুন করে হিসাব কষছেন। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নেয়ার পরপরই ১০ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে হুংকার ছুড়েছেন বাংলাদেশের প্রায় এক হাজার জনশক্তি ব্যবসায়ী, যারা এতদিন এই সিন্ডিকেটের কাছে ছিলেন অসহায়। মালয়েশিয়ায় নিয়োগকারী কোম্পানি ও শ্রমিকের মধ্যে এই সিন্ডিকেট গড়ে ওঠায় কর্মী প্রেরণে দ্রুত খরচ বৃদ্ধি পায়। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে জনপ্রতি ৪০ হাজার টাকা বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হলেও তারা নিয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। এসব টাকা আবার মালয়েশিয়ায় হুন্ডিতে পাচার করে দেয়া হয়েছে সেদেশে অবস্থানরত সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনও বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। এর আগে কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার গত সরকারের কাছে দেয়া হয়েছিল এবং সব এজেন্টকে কাজের সুযোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও তা উপেক্ষা করে ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেটকেই কর্মী নিয়োগের দায়িত্ব দেয় দেশটি। এ নিয়ে বাংলাদেশের হাইকোর্টে মামলা করা হয়। কিন্তু কর্মী নিয়োগের অধিকার যেহেতু মালয়েশিয়ার সরকারের তাই এ ধরনের মামলায় প্রতিকার পায়নি দেশের প্রায় এক হাজার এজেন্সি।

তবে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, প্রতারণা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অমানবিকতা বিভিন্ন সময়ে ছিল আলোচনায়। সাগর পথে, স্থলপথে জঙ্গল দিয়ে লোক এনে বন্দি করে রাখা, জিম্মি করে দেশে ফোন করে টাকা আদায়, অনেকের হাত-পা কেটে ফেলা এবং মেরে ফেলার অসংখ্য ঘটনার জš§ দিয়েছেন জনশক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন যেসব গড ফাদারের উদয় হয়েছে শাসক শ্রেণির সঙ্গে নিবিড় যোগসাজশে, তাদের অনেকে এখন মালয়েশিয়ায় বড় ব্যবসায়ী। অনেকে লোক নিয়োগের দালালি করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়োগ যেন অর্থ আয়ের অবাধ উৎস। মালয়েশিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা মাহাথিরের ক্ষমতা ত্যাগ করা থেকে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এই ১৫ বছরের ইতিহাস এমনই অমানবিক। এ সময়ের মধ্যে মাই ইজি, কেরিকম, সিনারফ্লাক্স, এফসিএমডব্লিউ, এসপিপিএ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি শ্রমিক প্রক্রিয়াকরণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছিল ওপেন সিক্রেট। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করতে হলে বিগত সরকার ঘোষিত সোর্স কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশের নাম বাদ দিতে হবে বা সেক্টর সীমিত করতে হবে। তবে সেদেশের কারখানাগুলোর প্রথম পছন্দ বাংলাদেশি কর্মী হওয়ায় নতুন সরকার সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে করছেন জনশক্তি বিশেষজ্ঞরা।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.