বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে মিথ্যে শঙ্কা

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যখন অসামান্য উন্নতি ঘটাচ্ছে তখন পশ্চিমা তাত্ত্বিকেরা আমাদের গণতন্ত্র নিয়ে ‘চিন্তিত’ হয়ে পড়েছেন। জার্মানির বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশন তাদের ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সে (বিটিআই)‘নতুন’ একনায়কতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গে স্থান হয়েছে লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাহগুয়া এবং উগান্ডার। বিটিআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের জন্য এক সময়কার বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশটি নতুন করে একনায়কতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে।’

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে বাংলাদেশ ছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বার্ষিক প্রবৃদ্ধি যখন পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেল তখন বেশিরভাগ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ এটাকে ‘হঠাৎ’ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বলে ব্যাখ্যা করলেন। তবে এখন যখন বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপির প্রবৃদ্ধি বছরান্তে পাকিস্তানের চেয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে ওই পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। এ বছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বাৎসরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১ শতাংশ যা পাকিস্তানের ২ শতাংশের চেয়ে বেশ নিচে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি হারে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির এই রূপান্তরের মূলে রয়েছে সামাজিক নানা খাতের অগ্রগতি। নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই এর শুরু। নারীর এই ক্ষমতায়নের ফলে শিশু স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় এসেছে গতি। বাংলাদেশের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। সেখানে ভারতের গড় আয়ু ৬৮ বছর, পাকিস্তানের ৬৬ বছর।

১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে দেশটিতে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। ২০০৮ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। সেবার দলটি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আর এর পরই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগের গত আট বছরের শাসনে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিস্ময়কর উন্নতি করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে এ সরকারের এ অর্জন অসামান্য। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এই রাজনৈতিক সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে শায়েস্তা করার জন্য নানা চেষ্টা করেছে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে তার ইচ্ছেমাফিক কাজ করতে না দেয়াটাই ছিল শেখ হাসিনার অপরাধ।

বাংলাদেশে ২০১৪ সালের জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো শঙ্কা প্রকাশ করে যে, এ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক আদর্শ যথাযথভাবে অনুসৃত হয়নি। এখন কেউ কী তাদের এ প্রশ্ন করতে পারে যে, কে তখন বিএনপি আর তার মিত্রদের ওই নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছিল? যে কোনো বিচারে ওই নির্বাচনে তাদের জয়ী হওয়ার কথা ছিল। সংসদ নির্বাচনের আগে কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির কাছে আওয়ামী লীগের হারের কথা মাথায় রাখলে সেটাই মনে করতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের পথ না মাড়িয়ে খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমান বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে হিংসাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার পথ বেছে নেন। এতে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার কিছু সমর্থন ছিল। বিএনপির এ ধরনের সহিংসতা কিন্তু নতুন নয়। আওয়ামী লীগের আগে ক্ষমতায় থাকার সময় এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে দলটি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগের অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়েছে বিএনপির আমলে। প্রকাশ্য জনসভায় নিহত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাংসদ ও জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার। সন্ত্রাসবাদী ঘটনাপ্রবাহ তুঙ্গে ওঠে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েক নেতাকর্মী নিহত হন। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দেশ। এই দলটিকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়ার এসব প্রচেষ্টা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হত্যার শামিল বলে মনে হয়নি। ২০০৪ সালে যে হামলা করা হয়েছে সেটি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। পশ্চিমা বিশ্ব কিন্তু ২০০৪-এর হামলা বা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি আমলে বিরোধী দল নির্মূল অভিযানকে কখনো অগণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করেনি। কিন্তু গণপরিবহনে পেট্রলবোমা ছুড়ে বা রেললাইন উপড়ে ফেলে শত শত মানুষকে দগ্ধ ও হত্যা করার দায়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের যখন ধরা হয় বা তাদের বিচার তখন পশ্চিমা বিশ্বের মায়াকান্না শুরু হয়। ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর (যাদের বেশিরভাগই ছিল বিদেশি নাগরিক) পুলিশ যখন অভিযান চালায় বা সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করে পশ্চিমারোদন তখন প্রকট হয়। বাস্তবতা হলো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাফল্য দেশটির আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির মতোই প্রশংসা পেয়েছে। এমনকি পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরাও এসবের প্রশংসা করেছেন।

কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক কারণে ঢাকার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখাটা ভারতের জন্য জরুরি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমাদের চাপের মুখে দিল্লির কখনোই উচিত হবে না তাদের চটকদার কথায় কান দেয়া বা তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলানো। আমাদের গণতন্ত্রের নানা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু তাকে পুঁজি করে পশ্চিমাদের কেউ যেন আমাদের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) সম্প্রতি এক গবেষণা করেছে। বিরাটসংখ্যক নমুনা নিয়ে দলভিত্তিক আলোচনার উপাত্ত ভিত্তি করে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এমন দলটির নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার কারণেই এ অবস্থান দলটির।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের সঙ্গী জামায়াত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের জন্য চলতি বছরের বিভিন্ন নির্বাচনে বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। তবে এই গবেষণার ফল হয়তো বাংলাদেশের বিরোধীদের আবারো নির্বাচনবিমুখ করবে। নির্দলীয় তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের অজুহাতে হয়তো হবে আবার নির্বাচনবর্জন। দলীয় সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভারতে যদি নির্বাচন হতে পারে, বাংলাদেশে তা হবে না কেন?

লেখক: সাংবাদিক; বিবিসি, বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ ও মিয়ানমারের মিজিমায় কাজ করেছেন।

মানবকণ্ঠ/এএএম