‘বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তো ফাজলামি করা যায় না’

মহিউদ্দিন পলাশ, দুবাই থেকে :
হঠাৎ করেই এশিয়া কাপ ক্রিকেট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জন্য কঠিন এক আসর। কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ ৪০ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা। প্রতিটি ম্যাচ খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের দিতে হচ্ছে কঠিন পরীক্ষা। ইনজুরির আশঙ্কা থাকছে প্রতি ম্যাচেই। গতকাল টিম হোটেলে বসে বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিককে বলেছেন অনেক কথা। তার সেই সাক্ষাৎকার মানবকণ্ঠের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

আপনার ১৭ বছরে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়াারে শারীরিক কিংবা কন্ডিশনের দিক দিয়ে কি এটাই সবচেয়ে কঠিন আসর?
মাশরাফি: এটা তো সত্যি কথা। শরীর এক পর্যায়ে গিয়ে চলছে না। কারণ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চারদিনে তিনটা ম্যাচ খেলা কঠিন । যে পরিমাণ পানি শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, সেটা আসলে রিকোভারি হচ্ছে না। এ ধরনের টুর্নামেন্টে প্রতি ম্যাচের আগে অন্তত একদিনের বিশ্রাম থাকে। কোথাও কোথাও দুই দিনের বিশ্রামও থাকে।

বাংলাদেশে তো গরমে খেলেন, এখানে কোন ধরনের বিষয়গুলো প্রতিকূল বলে মনে হয়?
মাশরাফি: সমস্যা হচ্ছে পেশীতে ক্র্যাম্প হয়ে যাচ্ছে। আমার যেমন ব্যাক ক্র্যাম্প করছিল, মোস্তাফিজের যেমন পিঠে ক্র্যাম্প করছিল। এসব জায়গায় ক্র্যাম্প করলে আপনি তো বোলিং করতে পারবেন না। যখন বোঝা যাচ্ছে শরীর সাপোর্ট করছে না, তখন অন্য কিছু খুঁজে বের করতে হয়। খুঁজে বের করতে গেলে ওটাও ঠিকমতো হচ্ছে না। ক্রিকেট তো পুরোটাই সাইকোলজিক্যাল গেম। যখন সবকিছু একসঙ্গে মিলে ঠিক থাকতে তখনোই সেরাট আসবে।

শেষ ম্যাচটা জেতার পর নিজেদের রিদম ফিরে পেলেন কি?
মাশরাফি: এর ভেতরে কিছু কথা আছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে ওই ম্যাচে আমাদের কারোই প্রস্তুতি ছিল না। আমাদের পরের ম্যাচটা (ভারতের বিপক্ষে সুপার ফোরের প্রথম ম্যাচ) আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মোস্তাফিজ, মুশফিক খেলেনি। সাকিব খেলবে কি খেলবে না এমন কনফিউশন থাকলেও শেষ মুহূর্তে খেলানো হয়েছে। সবকিছু এলোমেলো হয়েছে। আফগানিস্তানকে অনেকে দুর্বল দল ভাবছে। ওদের দু’জন বোলার আছে যারা এই বছর সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তারপরও কিন্তু কখনো কখনো বড় বড় জয়ের চেয়ে এমন জয় টিমকে অনুপ্রেরণা যোগায়। জয় তো জয়ই, হার তো হার। আফগানিস্তান ও ভারতের বিপক্ষে হারকে আপনারা হার হিসেবেই দেখছেন। আমরা আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়টাকে জয় হিসেবেই দেখছি।

ইমরুলকে ছয়ে খেলানোর গল্পটা শুনতে চাই?
মাশরাফি: দলে আমরা একটা কালচার তৈরি করতে যাচ্ছি, আমরা যাকে নিব, তাকে বেকআপ করব। এই মুহূর্তে শান্ত (নাজমুল হোসেন) তরুণ। ওকে আমরা বেকআপ করেছি। কারণ কখনো যেন শান্ত নিরুৎসাহিত না হয়। আমাকে প্রোপার সুযোগটা দেয়া হচ্ছে না। যেটা এর আগে পরে হয়ে আসছে। ওয়েস্টইন্ডিজ সিরিজ পর্যন্ত যদি দেখেন আটটা ওয়ানডের মধ্যে সাতটাতে বিজয় (এনামুল হক) খেলেছে। বিজয় কিন্তু এখন বলতে পারবে না তাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। লিটনকে আমরা বেকআপ করছি। আমাদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সঠিক দৃষ্টান্ত সেট করা। যেন কোনো খেলোয়াড় নষ্ট না হয়ে যায়। যেন কোনো খেলোয়াড় হুট করে না হারিয়ে যায়। এরা ভালো খেলোয়াড়। এদের তো তৈরি করতে হবে। ওই জিনিসটা চেঞ্জ করা ওখানে বেকআপ করা হয়েছে। ইমরুলকে খেলানোর আইডিয়া ছিল ছয় নম্বরে। যেহেতু রশিদ এবং মুজিবকে ইমরুলকে নেটে খেলার অভিজ্ঞতা আছে। বলতে পারেন ইমরুলকে কখনো ছয় নম্বরে ব্যাটিং করেনি। ওই মুহূর্তে আমরা যদি ওপেনারকে বেকআপ করি, ওকে তিনে খেলানো যেত। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তো ফাজলামি করা যায় না। প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই পেছনে একটা যুক্তি থাকতে হয়। আমরা মুজিবকে ঠেকানোর জন্য মিঠুন আর মুশফিককে সেট করেছিলাম,। রশিদকে ঠেকানোর জন্য সাকিব আর ইমরুলকে সেট করেছিলাম। সøগে ফিনিশটা করার জন্য রিয়াদকে (মাহমুদউল্লাহকে) সঙ্গে রেখেছি। এখন টপে আমাদের ক্লিক করেনি। তবে বটমে কিন্তু ক্লিক করেছে। ট্যাকটিস কিন্তু এভাবেই করা। এটা কিন্তু হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া নয়। এর জন্য অনেক কিছু ভাবতে হয়েছে।

এই কন্ডিশনে আপনি কিভাবে টানা বোলিং করে যান?
মাশরাফি: ৩৩ ওভারের সময় মোস্তাফিজকে যখন এনেছি তখন কিন্তু মোস্তাফিজকে আমরা পাঁচটা ওভার করানোর ইচ্ছা ছিল। মোস্তাফিজ দুই ওভার বল করেই আমাকে বলল ভাই আর পারছি না। তখন তো খুব স্বাভাবিক আমার জন্য শকিং, টিমের জন্যও শকিং। বাট আপনি তো একজন খেলোয়াড়কে ইনজুরি করে দিতে পারেন না। মোস্তাফিজ যখন পারেনি, তখন আমিই শুরু করলাম। আমার ইনজুরি এখন মেটার করবে না। আফগানিস্তানের বিপক্ষে (গ্রুপ পর্বের ম্যাচে) ৪৪তম ওভারে ৬ ওভার করে চলে যেতে পারতাম, গিয়েছিলামও। কিন্তু রুবেল ওখানে তিনটা চার খাওয়ায় রুবেলকে নিয়ে ভেবেছি, মোরালি ডাউন হয়ে কালকের (সুপার ফোরে ভারতের বিপক্ষে) ম্যাচে না আবার খারাপ খেলে। এই কারণে আমি বল হাতে নিয়েছি। ওই সময় তো মিরাজকে দিয়ে করাতে পারতাম। আসলে অনেক কিছুই মাথায় চলে আসে। কিন্তু এমন গরমে মাথা অনেক সময় কাজ করে না। সবকিছুর সঙ্গে সবকিছুর রিলেশন আছে। আপনি যেটা বললেন আমি আসলে ইনজুরি নিয়ে ভাবি না।

শেষ ওভারে মোস্তাফিজকে বল দিয়েছিলেন। নিজের ভেতর কি আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল?
মাশরাফি: শতভাগ আত্মবিশ্বাস ছিল ওর উপর আমার। কারণ ওরে মারতে গেলে আউট হওয়ার সুযোগ আছে। ওর সাথে খালি আমার আলাপ এটুকু হয়েছে যে, তুই কাটারটা যে মারবি ঠিক জায়গায় মারিস। যেটা তুই আগে মারতি। আর কিছু ভাবার দরকার নেই।

অধিনায়কত্বের সময় ভাগ্যের কতটা বিশ্বাস করেন?
মাশরাফি: আমি অনেকবার বলেছি, আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। আমার জীবনটাই ভাগ্যের উপর দিয়ে। শুধু খেলা না, ভাগ্য ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই সম্ভব না।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে আপনি ২৫০ উইকেট পেয়েছেন। কিভাবে দেখছেন এমন বড় অর্জনকে?
মাশরাফি: (হাসি)…..সত্যি কথা বলতে কি, আমি যতদিন ক্রিকেট খেলছি, আমি প্রত্যেকটা ম্যাচকে কেন্দ্র করে খেলছি। আমি সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করেছি মাঠে। এমনকি আমার শরীর যখন ফিফটি-ফিফটি তখনো শতভাগ দিতে চেষ্টা করেছি। যেমন শেষ ম্যাচে আমার শতভাগ সুযোগছিল যে কোনো কিছু হয়ে যাওয়ার। কোমর যখন আমি সোজা করতে পারছিলাম না তখন আমি বুঝতেছি যে সামথিং গোয়িং রং। তখন আমি এক ওভারের জন্য বাইরে যাই। এসব মুহূর্ত বর্ণনা করা কঠিন। এখনই আমি কিছু বিষয় নিয়ে সংগ্রাম করছি। শেষ ম্যাচে ৩০টা বল আম্পায়ার আমাকে সাবধান করেছে, ভেরি ক্লোজ টু নো বল। আম্পায়ার যে সাবধান করছে আমার মাথায় কিন্তু এখন ওটাই ঘুরছে। বল করতে গিয়ে ভাবতে হচ্ছে, আমার যেন নো বল না হয়। এভাবে বোলিং করাও কঠিন। এটা ঠিক করা দুই দিনের কাজ। সেই সুযোগটা আমি পাচ্ছি না। এসব ছোট-খাট জিনিস সামলেই এই পর্যন্ত আাসতে হয়েছে। এখনো সমস্যা নিয়ে চলছি।