বহুমাত্রিক কোন্দল নিয়েই নির্বাচন যাত্রা শাসক দলের

আওয়ামী লীগের ‘ঐতিহ্যগত’ কোন্দল রয়েছে অন্তত ৩০ জেলায়। দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ কোন্দল ছড়িয়েছে সারাদেশে। সেসময় প্রার্থী বাছাইয়ে- বাণিজ্য আর স্বজনপ্রীতি করে ত্যাগী নেতাদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছেন জেলা-উপজেলার নেতা ও স্থানীয় এমপিরা। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে দশম সংসদে প্রথমবারের মতো হওয়া এমপি, সঙ্গে বেশ কয়েক পুরনো এমপিরাও দলে কোন্দল সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন স্থানে। তারা নিজ দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সঙ্গে নিয়েছেন অনুপ্রবেশকারীদের।

নতুনদের পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের থেকে। এসব তৃণমূল নেতা এখন দল বিমুখ। সবশেষ, আগামী নির্বাচনের মনোনয়ন ঘিরে অর্ধেকের বেশি আসনে একরকম স্নায়ুযুদ্ধ চলছে সম্ভাব্য প্রার্র্থী ও বর্তমান এমপিদের মধ্যে। এর মধ্যে এখনো বাকি আছে শরিকদের আসন ছাড়ের বিষয়টি। এদিকে, প্রথমবারের মতো বিভাগভিত্তিক দায়িত্ব পাওয়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের মতদ্বৈততাও দেখা দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন বহুমুখী কোন্দলে দলের হাইকমান্ডও অনেকটা অসহায়। ক্ষমতাসীন দলের নীতি নির্ধারকরা বলছেন, সব কোন্দল মীমাংসা করা সম্ভব হবে না। এর মধ্য দিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও আহ্বানে নির্বাচনের আগে এসব কোন্দল কমে আসার একটি সম্ভাবনা রয়েছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন কোন্দল মিটিয়ে ফেলতে কেন্দ্র তোড়জোড় করছে; তখন নতুন করে আসছে নির্বাচনী কোন্দল। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। একই নির্বাচনী আসনে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাশায় চাপা কোন্দলও বিরাজ করছে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে। প্রভাবশালী সম্ভাব্য প্রার্থীরা জানান দিয়ে এলাকায় যাচ্ছেন; গণসংযোগ করছেন। তবে মারকুটে এমপিদের ক্ষেত্রে এ হিসাব একটু ভিন্ন। এমন সব আসনে বর্তমান এমপির রোষানলে পড়ার ভয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় যাচ্ছেন সতর্কতার সঙ্গে। ঢাকায় বসে ফোনে এমপি বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে সখ্য রাখছেন। হয়রানির ভয়ে তারা প্রকাশ্যে জনসংযোগে নামছেন না।

ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা কুমিল্লার মতো জেলা মর্যাদার মহানগর ইউনিটগুলোতে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল রয়েছে বরাবরের মতো। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী অঞ্চলের অন্তত ৩০টি জেলার কোন্দল-গ্রুপিং একরকম ‘চলমান প্রক্রিয়ার’ মতো। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কেন্দ্রের চাপে ক্ষণিকের জন্য হাত আর বুক মেলালেও আওয়ামী লীগের এ কোন্দল একরকম ‘ঐতিহ্যগত’। এ ছাড়া বড় দল হিসেবে সারাদেশেই রয়েছে দলটির কিছু ‘টুকটাক’ কোন্দল (নেতাদের ভাষ্য)। এর সঙ্গে এবার যোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রার্থীদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দল আর মনোনয়ন লাভের স্নায়ুযুদ্ধ। এর আগে প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সারাদেশে মনোনয়ন বঞ্চিতদের একটি ক্ষোভ রয়ে গেছে স্থানীয় মনোয়ন বোর্ডের দায়িত্বে থাকা থানা ও জেলার নেতা এবং এমপিদের ওপর। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগে এখন বহুমাত্রিক কোন্দল লক্ষ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

দলের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দৃশ্যমান দৌড়ঝাঁপ ও সাংগঠনিক হুমকির কারণে তৃণমূলে কোন্দল কিছুটা চাপা পড়েছে। তবে নেতারা এও মনে করছেন, সাময়িকভাবে ঢাকায় ডেকে এনে কোন্দল কিছুটা চাপা দেয়া গেলেও নির্বাচনে এর স্নায়ু প্রভাব পড়তে পারে। অনেক জেলায় নিজ দলের নেতারা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ নাও করতে পারেন। এক্ষেত্রে তারা সর্বশেষ কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত বৃহত্তর ফরিদপুরে এসব দলীয় কোন্দল নির্বাচনে তেমন প্রভাব না ফেললেও অন্যান্য জায়গার চিত্র তার উল্টাটা হতে পারে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোন্দল নিরসনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাও সবক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় না। অনেক দিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রতি বিভাগে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আট সাংগঠনিক সম্পাদক আর চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ময়মনসিংহসহ আট বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলের নেতারা বলছেন, শুরুতে নতুন এ বিষয়টিকে দলের নেতারা ভালোভাবে নিলেও; এখন বিষয়টি জটিলতা বাড়াচ্ছে। অনেক ইস্যুতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কয়েকটি জেলায় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে ছাড়াই বর্ধিত সভা করেছেন সাংগঠনিক সম্পাদকরা। কোন্দল নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা উপজেলা ইউনিটকেও ঢাকায় ডাকছেন। বিষয়টি নিয়ে খোদ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ রয়েছে। গত মাসে সম্পাদকমণ্ডলীর এক বৈঠকে যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রহমান এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া কোন্দলপূর্ণ জেলাগুলোর বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। সম্প্রতি একটি উপজেলার কোন্দল নিরসনের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। সাংগঠনিক সম্পাদকদের কেউ কেউ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সময় দিচ্ছেন সপ্তাহের পর সপ্তাহ। দু’একজনের নিজের নির্বাচনী মাঠও বেশ অনুকূলে না; তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মনোনয়ন ধরে রাখার দৌড়। সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ আর আহমদ হোসেন নিজেরাই আছেন মনোনয়নের দৌড়ে। বরিশাল বিভাগে এখনো হয়নি বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন। জানা যায়, সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনয়ন ধরে রাখতে নিজ নির্বাচনী এলাকায় সময় দিচ্ছেন অনেক। এ ছাড়া সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় রদবদল না হওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিভাগ পরিবর্তন হয়েছে। আগে প্রত্যেকে নিজ বিভাগে ছিলেন। এখন নতুন বিভাগের রাজনীতি আঁচ করতে যেমন সময় লেগেছে। গুছাতেও লাগছে সময়।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের পর ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক কোন্দলের ভয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে হাত দেননি। দলের নেতারা বলছেন, নারায়নগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, ফরিদপুর অঞ্চল আর ঢাকা মহানগরের যেখানে হাত দেবে সেখানেই কোন্দল; তাই কোন্দল চাঙা করার চেয়ে দূরে থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন নতুন সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যরিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি। যেখানে দলের সাধারণ সম্পাদকের বারংবার নির্দেশের পর এখনো হয়নি ঢাকা মহানগরের থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি।

এদিকে, প্রথমবারের মতো যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব বণ্টন প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে অনেক কেন্দ্রীয় নেতার। তারা বলছেন, আগে প্রতিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল ছিল। যার নেতৃত্বে থাকতেন দলের সভাপতিমণ্ডলী ও উপদেষ্টা পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতারা। মূল সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকতেন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এ প্রক্রিয়ায় দলের প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতার সংশ্লিষ্টতা থাকত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায়। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় অনেক নেতা কাজ ছাড়া ‘অবসর’ যাপন করছেন। অনেক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্য দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন দলীয় কার্যালয়ে কর্মীদের সঙ্গে আড্ডায়। প্রচার, পরিবেশ কিংবা দফতরের মতো কয়েকটি বিষয়ভিত্তিক সম্পাদক ছাড়া অন্য পদধারী নেতারা সাংগঠনিক কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারছেন না। তবে ব্যক্তি সম্পর্ক ও এলাকাভিত্তিক কারণে তাদের অনেকে বিভিন্ন জেলার বর্ধিত সভা ও বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পান। এতেই যা তুষ্টি।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ