বন্ধ হওয়ার পথে ফরেনসিক বিভাগ!

নানা সমস্যায় বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। মাত্র ৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে বিভাগীয় প্রধানসহ প্রথম ৩ জনের পদই শূন্য। কর্মরত ৩ জনের মধ্যে ১ জন আবার সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক না। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অপরদিকে পোস্টমর্টেম এবং ভিকটিম পরীক্ষার কাজ চালাতে গিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। স্বয়ং কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ জামান চৌধুরী বললেন, এভাবে চললে বিভাগটি ধরে রাখা কঠিন হবে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ সূত্র জানায়, কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক বিভাগের দুটি কাজ। একটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আরেকটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের কাজটি হলো, কলেজে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো পোস্টমর্টেম, ভিকটিম পরীক্ষাসহ এ সংক্রান্ত কাজগুলো করা। এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বরাদ্দ নেই। পোস্টমর্টেম, ভিকটিম পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কে দেবে? মর্গকে প্রস্তুত করার খরচ কে দেবে? আর যে লাশ কাটে সেই ডোমের বেতনই বা কে দেবে? এসব কাজ বর্তমানে করতে হচ্ছে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ যে যখন থাকেন তিনি বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নেন। কিন্তু অফিসিয়াল এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো বাজেট নেই।

অপরদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের কাজটি হলো কলেজে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো। কিন্তু পড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই কলেজে। নেই ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদও। মাত্র তিনজন প্রভাষক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি চালানো হচ্ছে এখন। এই তিনজনের মধ্যে একজন আবার এই বিভাগের চিকিৎসক নন। ফলে তিনি পোস্টমর্টেম কিংবা ভিকটিম পরীক্ষা করেন না।

বাধ্য হয়ে কলেজে ক্লাস করানোর পাশাপাশি এই দুটি কাজও করতে হয় মাত্র দু’জন প্রভাষক দিয়ে। বর্তমানে এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান করা হয়েছে গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. পি কে বালাকে। অথচ ইচ্ছে করলে এই বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন সুলতানাকে প্রমোশন দিয়ে অথবা চলতি দায়িত্ব দিয়েও যদি সহকারী অধ্যাপক করা হতো তাহলে তিনি ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান হতেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই প্রভাষকের একটি পদ শূন্য হতো। ওই শূন্যের জায়গায় আরেকজন নিয়োগ পেতে পারতেন। তাহলে বিভাগে কিছুটা হলেও গতি পেত।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, আমাদের ফরেনসিক বিভাগটি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ৬ শিক্ষকের মধ্যে তিন পদ শূন্য। তাও আবার অধ্যাপক, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকের মতো পদ শূন্য। ৩ জন প্রভাষকের মধ্যে একজন এই বিভাগে পড়াশোনা করেননি। যার কারণে বছরে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পোস্টমর্টেম ও অর্ধহাজার ভিকটিম পরীক্ষা আমাদের দুই চিকিৎসককে করতে হয়।

এ বিভাগে আমাদের সরকারি ছুটি নামে থাকলেও কাজে নেই। এমনকি ঈদের দিনেও আমাদের কাজ করতে হয়। এ জন্য আমাদের কোনো ওভারটাইম তো নেই-ই, উপরন্তু আমাদের বিভিন্ন সময় আদালতে যেতে হয়। এ জন্য নেই কোনো প্রণোদনাও। ডা. শারমিন আরো বলেন, আমরা সাক্ষী দিতে গিয়ে সব সময়ই নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগী। এ জন্য আমাদের পরিবারও উদ্বেগে থাকে। ন্যূনতম কোনো সাপোর্টও আমরা পাই না। এ জন্যই এ বিভাগে শিক্ষক কম। সরকারকে এ বিভাগে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। একইসঙ্গে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ জামান চৌধুরী বলেন, ফরেনসিক বিভাগের অবস্থা কেমন একটি উদাহরণ দিলেই আপনি বুঝবেন। গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. পি কে বালাকে আমি ফরেনসিক বিভাগের চিফ করেছি। গাইনি বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক বিভাগের কিছু বুঝবে না, তারপরেও করেছি। কারণ একজন প্রভাষককে তো আর আমি বিভাগের প্রধান করতে পারি না। এই বিভাগে অধ্যাপক, সহযোগী এবং সহকারী অধ্যাপক পদে কেউই নেই।

সুতরাং কী দিয়ে আমি বিভাগটি সচল রাখব বলেন। ফরেনসিক বিভাগের নানা সমস্যা এবং কিছুটা অনিয়ম পরোক্ষভাবে স্বীকার করে এই চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ বলেন, লিখে দিতে পারেন যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে কুমেকের ফরেনসিক বিভাগ! কারণ হিসেবে তিনি জানান, ফরেনসিক বিভাগের শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর কাজটি হলো আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। আর সব কাজ হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু এ জন্য তাদের কোনো বরাদ্দও নেই। অনেক কষ্ট করে আমাকে এ খরচগুলো বহন করতে হয়। এ বিভাগে বছরে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। এখানে ভিকটিম পরীক্ষা করতে হয় এবং ময়নাতদন্ত করতে হয়। যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ। এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ আছে কিন্তু টাকা দেয়ার কেউ নেই।

ফরেনসিক বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ শুধু মাত্র প্রভাষক দিয়ে কীভাবে চলে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ জামান চৌধুরী বলেন, জোড়াতালি দিয়ে চলে। বারবার উপরে এ বিষয়গুলো লিখছি। এখনো কোনো কাজ হয়নি। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়।

মানবকণ্ঠ/এএএম