বদনামের বদিই আওয়ামী লীগের ভরসা, বিএনপিতে শাহজাহান

এই আসনটিকে বলা হয় সৌভাগ্যের আসন। এই আসনে যে দল জয়লাভ করে সেই দলই সরকার গঠন করে। বারবার সরকারি দলের এমপি পাওয়া বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের আসনটিতে উন্নয়নও হয়েছে চোখে পড়ার মতো। রোহিঙ্গা, ইয়াবা ও মানব পাচারের মতো বিষয় নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে আলোচিত উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ আসনটি।

দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-৪ আসনের মোট ভোটার ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জন। এতে টেকনাফ উপজেলায় ভোটার রয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৫৭ জন ও উখিয়া উপজেলায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৩২২ জন।

১৯৯১ সালে এই আসনে জয়লাভ করেছিলেন বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীকে পরাজিত করে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শাহজাহান চৌধুরীকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির তাহা ইয়াহিয়াকে পরাজিত করে পুনরায় নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বদি।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি বিষয়ের জন্য সবচেয়ে আলোচিত কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসন। ইয়াবা ও মানব পাচারের স্বর্গরাজ্য হিসেবে সারাদেশে আলোচিত এই অঞ্চলটি। সেই বদনাম ঘুচাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সম্প্রতি কক্সবাজারে একটি জনসভায় ইয়াবার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সভানেত্রীর এই হুঁশিয়ারি থেকেই অনেকে ধারণা করছেন উখিয়া-টেকনাফ আসনে আওয়ামী লীগে পরিবর্তন আসতে পারে। সেই হিসেবে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে চষে বেড়াচ্ছে প্রায় অর্ধডজন সম্ভাব্য প্রার্থী। তবে বিএনপি থেকে কোনো প্রার্থীর নির্বাচনীয় কর্মকাণ্ড দেখা যাচ্ছে না। যদিও নেতাকর্মীরা ওই আসনে প্রার্থী হিসেবে আপাতত সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীকে দেখছেন।

রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন হারালেও এই আসনে জামায়াত থেকে শক্তিশালী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করছে সচেতন মহল। সে ক্ষেত্রে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা শাহজালাল চৌধুরী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অথবা সতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন। জাতীয় পার্টি থেকে গেল নির্বাচনে অংশ নেয়া তাহা ইয়াহিয়াও পুনরায় লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আগামী নির্বাচনে চারটি আসনই দাবি করার অধিকার রয়েছে আওয়ামী লীগের। এই দাবির যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে তাদের। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার টানা দুই মেয়াদে কক্সবাজারের যে উন্নয়ন করেছে অতীতের কোনো সরকারই তার অর্ধেকও করতে সমর্থ হয়নি। তবে টানা দুই মেয়াদে কক্সবাজারে যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নাধীন বা গৃহীত হয়েছে সেগুলো সামনে টেনে নিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবেন দলীয় এমপি। তাই কোনো ধরনের ব্যাঘাত ছাড়াই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধানের চাহিদা কক্সবাজারের চারটি আসনেই বিজয়ী হওয়া। এর মধ্যে দেশের শেষ সীমান্তের উখিয়া-টেকনাফ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই অঞ্চলের ইয়াবা ও মানব পাচারের বদনাম মুছতে দলীয় প্রধানের আগামী নির্বাচনে ভিন্ন চিন্তা রয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে এই আসনে প্রার্থী দিতে ভুল করবেন না দলীয় সভানেত্রী। নিজেই মনিটরিং করবেন আসনটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের আরেক শীর্ষ নেতা বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেই কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে জনসভা করে গেছেন। এ সময় তিনি জনগণের কাছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো তুলে ধরে জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন। ওই সময় তিনি নৌকাকেই প্রার্থী বলেছেন। আর নৌকার জন্যই ভোট চেয়েছেন। নৌকার প্রার্থী হিসেবে কাউকে পরিচয় করিয়ে দেননি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে মানুষের মনে নানা জল্পনা-কল্পনা বিরাজ করছে।

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান এমপি আব্দুর রহমান বদি, সাবেক এমপি ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, জেলা পরিষদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক মিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ্ আলম ওরফে রাজা শাহ আলম ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী।

এর মধ্যে শাহ আলম ওরফে রাজা ও হামিদুল হক চৌধুরীর জনসম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মোহাম্মদ আলী ও শফিক মিয়ার জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা থাকলেও বর্তমান এমপি আব্দুর রহমান বদির জনপ্রিয়তার কাছে ধরাশায়ী তারা। যদিও ইয়াবা চোরাচালান বিষয়ে সারাদেশে আলোচিত-সমালোচিত বদি। অনেকেই তাকে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা একমাত্র বদির পক্ষেই সম্ভব। কারণ ব্যক্তি কর্মকাণ্ডের জন্য বিতর্ক থাকলেও উখিয়া-টেকনাফের প্রতিটি মানুষের অন্তরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন আব্দুর রহমান বদি। এ কারণে অনেকেই দাবি তুলছেন পুনরায় ওই আসনে দলকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগ থেকে আব্দুর রহমান বদিকে মনোনয়ন দিতে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ