বঙ্গোপসাগরে বেপরোয়া জলদস্যুরা

চট্টগ্রাম ব্যুরো:
বঙ্গোপসাগর উপকূলের সন্দীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সোনাদিয়া চ্যানেলের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলারে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে জলদস্যুদের তৎপরতা। ইলিশ ধরার মৌসুমকে কেন্দ্র করে জলদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে ওঠায় বোট মালিক ও জেলে পরিবারে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়ে জেলেরা জলদস্যুদের কবলে পড়ছেন। জলদস্যুরা অতর্কিতে হামলা চালিয়ে জেলেদের জিম্মি করে মাছসহ বোট নিয়ে চলে যাচ্ছে অজ্ঞাত স্থানে। সেখান থেকে মালিকদের খবর দিয়ে টাকা আদায় করছে।
জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে এসব চ্যানেলে জলদস্যুরা মাছ ধরা ট্রলারে জেলেদের জিম্মি করে বোটপ্রতি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আদায় করছে। জেলেদের জীবন বাঁচাতে ও বোট ফিরে পেতে মালিকরা ডাকাতদের নগদ টাকা অথবা মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাচ্ছেন। জেলেরা প্রতিনিয়ত ডাকাতদের হাতে নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে বোট মালিকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ডাকাতির অভিযোগ করছেন না।
জেলেরা জানান, ২৮ জুলাই দুপুরে বঙ্গোপসাগরে ১৬ বিউ নামক স্থানে ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এফবি আল মদিনা নামে ফিশিং ট্রলারে জলদস্যুরা হামলা চালিয়ে ৫ জনকে গুলিবিদ্ধ ও প্রায় ২০ জনকে পিঠিয়ে আহত করে। পরে জেলেদের জিম্মি করে ফিশিং ট্রলারের সব সরঞ্জাম লুট এবং ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। জেলেরা আরো জানান, নিয়মিত মাসোহারা দিতে অপারগ হলে পরবর্তীতে এই ট্রলার সাগরে আর মাছ ধরার জন্য যেতে পারে না। তাদের অবাধ্য হওয়া কোনো ফিশিং ট্রলার সাগরে মাছ শিকারে গেলে ট্রলারের ইঞ্জিন, জাল, মাছ, তেল, বরফ, ব্যাটারি, টর্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি লুট করে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে খালি ট্রলারটি ফুটো করে সাগরে ডুবিয়ে দেয়। চট্টগ্রাম ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, সাগরে ইলিশ ধরার মৌসুমেই ফিশিং ট্রলারগুলো বেশিরভাগ ডাকাতের কবলে পড়ে। তাদের অভিযোগ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪টি প্রধান ডাকাত গ্রুপ সাগরে সক্রিয়। এদের অনেকগুলো শাখা গ্রুপ রয়েছে। এরা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ‘বাহিনী’ হিসেবেও পরিচিত। এ ছাড়া মহেশখালী, সোনাদিয়ার ডাকাত গ্রুপগুলোও বেশ সক্রিয়।
মহেশখালী উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, সাগরে জলদস্যুতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলে পরিবারগুলো চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। জলদস্যুদের দাপট বন্ধে কোস্টগার্ডসহ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি। কুতুবদিয়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কুতুবদিয়া উপকূলের তালিকাভুক্ত অর্ধশত জলদস্যুকে আটক করে কুতুবদিয়া থানা পুলিশ। বর্তমানে তাদের অনেকে মুক্তি পেয়ে আবারো সংগঠিত হয়েছে। তারা মহেশখালী, বাঁশখালী, পেকুয়া, আনোয়ারা, হাতিয়া, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা উপকূলের তালিকাভুক্ত জলদস্যুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দলবদ্ধ হয়েছে।
চট্টগ্রাম ফিশিং বোট মালিক সমিতির অফিস সেক্রেটারি সাব্বির আহমদ বলেন বলেন, প্রায় প্রতিদিনই মহেশখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলে ফিশিং ট্রলারে ডাকাতি হচ্ছে। কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং, মহেশখালী ও বাঁশখালী এলাকার সংঘবদ্ধ ডাকাত গ্রুপ বঙ্গোপসাগরের চ্যানেলে প্রতিনিয়ত ডাকাতি করে যাচ্ছে। প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে তারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি কৃঞ্চধর জলদাশ জানান, সাগরে যেভাবে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে গেছে তাতে মনে হয় কোনো জেলেরই নিরাপত্তা নেই। সাগরে প্রতিনিয়ত ডাকাতি হলেও থানাগুলো ডাকাতির মামলা নিতে চায় না। এ ব্যাপারে কুতুবদিয়া থানার ওসি মুহাম্মদ দিদারুল ফেরদাউস বলেন, কুতুবদিয়া উপকূলের তালিকাভুক্ত শতাধিক জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। বতর্মানে অন্য উপকূলের জলদস্যুরা জড়ো হয়ে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে ডাকাতি করছে। এ ব্যাপারে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন।