বঙ্গবন্ধু রাজনীতির মহাকবি

১৫ আগস্ট। শেষ শ্রাবণের কলঙ্কিত রাত সেটি। ঘুটঘুটে অন্ধকারের জাল ভেদ করে মানব পৃথিবীর বঙ্গীয় বদ্বীপে আছড়ে পড়েছিল জোছনা ঝলকানি অশনি আলোকরশ্মি। সেদিন নিস্তব্ধ রাতের নিঃসঙ্গ প্রকৃতি নিরুপায় নিয়তির কাছে হার মেনেছে। রাজধানী শহরের অলিগলিতে হেঁটে চলা বেওয়ারিশ কুকুরগুলো দিকভ্রান্ত পথিকের মতো এদিক-সেদিক ছুটে বেড়িয়েছে। বিপদ ভয়ঙ্কর অপকর্ম আঁচ করতে পেরে মহাপ্রলয়ের অপূরণীয় যন্ত্রণায় কাতর কুকুররা তুলেছিল দুঃখ খুই। নির্জন শহরের প্রাণী-পতঙ্গ নিশাচরেরা অচেনা ভাষায় জানিয়েছে প্রতিবাদ। দুঃখ সইতে না পেরে আকাশের ছাইবর্ণা উড়ন্ত মেঘমালা বৃষ্টি হয়ে ঝরেছে ব্যথিত বাংলার রাজধানী পথে। শহরের যত্রতত্র ঘুরে ফেরা উন্মাদ আওলাকেশী ছিন্নবস্ত্রে আবৃত্ত ধুলোবালি বসনের পাগলিনী প্রাণটাও বকেছে অস্থির প্রলাপ। শুধু ব্যতিক্রম মনুষ্য পরিচয়ধারী ওই নরপশুর দল। তখন বন্দুক বুলেটে সজ্জিত বর্বর বাহিনী এগিয়ে চলেছে স্থপতি বাংলা বধের ঘৃণ্য মানসে। বাঙালি, বাংলা তখন গভীর ঘুমে অচেতন।

বঙ্গরাজ্যের কী সর্বনাশ যে হতে যাচ্ছে কেমনে টের পাবে সদ্য স্বাধীনতায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া মুক্ত বাঙালি। তাদের ভরসাবিগ্রহ মুক্তির মহামানবকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার হীনউদ্দেশ্যধারী বাঙালি কুলকলঙ্ক গোষ্ঠী ইতিহাসের মর্মন্তুদ অপকর্ম সাধনের জন্য সেই রাতের নির্জননিশি লগ্নটাকেই বেছে নিয়েছিল। ঘুমন্ত বাংলাদেশ তখন নিশিবসানের নিদ্রিত প্রতীক্ষায় নিঃশ্বাস ফেলছে। কেউ কি জানত তাদের ঘুমে রেখেই হত্যা করা হবে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। না, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাঙালি কখনো আঁচ করতে পারেনি এমনটি।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নীরবনিশির শেষলগ্নে বিদ্ঘুটে বুলেট শব্দে প্রকম্পিত হয় ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বরের আকাশ-বাতাস। জলপাই রঙা সেনা রাইফেলের বুলেটবারুদ ঝাঁজড়া করে দেয় রাজনীতি, শান্তি, স্বাধীনতা, মুক্তি ও মানবতার মহাকবি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা সমৃদ্ধ বঙ্গবক্ষ। নিমিষেই নেতিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। হু-হু করে কেঁদে ওঠে মানবতা, স্তম্ভিত হয়ে পড়ে রাত সমাপন মুহূর্তের শীতল প্রকৃতি পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো। সন্তানের প্রাণবধ বেহায়াপনা বেদনায় শোকের অতলে নিমজ্জিত নির্বাক বঙ্গমাতা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। ততক্ষণে রক্তলাল ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটি। রক্তবীভৎস হোলি খেলায় উন্মাতাল নিকৃষ্ট বদেরা বিকৃত উল্লাস আর অমার্জিত বাহানায় বেরিয়ে পড়ে রক্তমাখা বঙ্গবন্ধুর নিস্তেজ দেহ ফেলে।

স্তব্ধ কীর্তিজনকের স্বল্পায়ু প্রাণ: অসহায় বত্রিশ নম্বরে তখন পিনপত্তন নীরবতা। চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল মুয়াজ্জিনের পবিত্র আজান ধ্বনি। একদিকে আল্লাহর ঘরের শুচিশুদ্ধ আওয়াজ অন্যদিকে স্থপতিহারা ধানমণ্ডির শোকার্ত সুর একত্রিত হয়ে এক করুণকলঙ্কিত আবহের সৃষ্টি হয়। যন্ত্রণার অসহনীয় পীড়নে শ্রান্ত রাতটি প্রভাতে পরিণত হলে সন্তানশূন্য বঙ্গমাতার হৃদয়পিষ্ট আর্তনাদ শোকের হিম হাওয়ায় ভর করে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। জনকহারা জীর্ণ খবরে স্তম্ভিত বাংলাদেশ, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে বাঙালি। শিশুর মতো চিৎকারী সুরে কেঁদে ওঠে বঙ্গীয় বদ্বীপ। মানবতার মহীয়ান মূর্তি বঙ্গবন্ধুর বিয়োগান্তক খবরে আঁতকে ওঠে মানবতাবাদী দুনিয়া। নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বঙ্গবন্ধুর বুলেটবিদ্ধ যন্ত্রণা কোটি বাঙালি ও বিশ্বনেতৃত্বের ন্যায়নিষ্ঠ মানুষগুলোকে স্পর্শ করলেও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব বিশালতা দমাতে পারেনি খুনিচক্রের রাইফেল বাঁট।

অর্জনে অবিস্মরণীয় মানবতার মহাদুর্গ ও মুক্তির মহাদূত বঙ্গবন্ধুর সশরীরী অবয়বটুকু অবলোকনে একটু সময়ের জন্যও কাঁপেনি শত্রুপক্ষের মারণাস্ত্র তাক করা হাতখানি। গভীর মমতা ও জীবন ঝুঁকির ইস্পাতকঠিন ভালোবাসায় আগলে রাখা বাঙালির বিবেচনাশূন্য অবিবেচক বিপথে পতিত গুটিকয়েক ক্ষমতালিপ্সু অমানুষ পরিচয়ভুক্ত মানুষেরাই হত্যা করল শতাব্দীর সেরা মানুষটিকে। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। দেখে দেখে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সব সদস্যকে। জাতির জনকের কনিষ্ঠ শিশুপুত্র রাসেলও রেহাই পায়নি রক্তপিপাসু চক্রের রোষানল থেকে। দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই তনয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বিশ্ববুকে এমন নৃশংস নজির জন্ম দিতে পারেনি আর কোনো জাতিগোষ্ঠী। যা করে দেখাল বঙ্গবন্ধু অতিশয় প্রিয় বাঙালি জাতির চক্রান্তকারী দস্যুদল। বাঙালির মুক্তি স্বাধীনতায় অবিচল বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুভয়ের যমযন্ত্রণাও মাথা নত করাতে পারেনি। কিন্তু সেদিন অস্ত্রহাতে হিংস্র পশুত্বপনার অসহিষ্ণু শক্তির অন্যায্য অনাচারে তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। তারপরও সাহসের অগ্নিমূর্তি বঙ্গবন্ধু মৃত্যুপূর্ব শত্রুসেনাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কী চাস তোরা?’ সাহস স্বনির্ভরতায় পূর্ণ বঙ্গবন্ধু উদার মনের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় জানতে চেয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্য, ইচ্ছার কথা। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত কালকেউটে পাল আর সময় নেয়নি, কিছু বুঝে ওঠার আগেই বঙ্গবন্ধুর গায়ে বসিয়ে দেয় মরণকামড়। ব্যস, এখানেই স্তব্ধ কীর্তিজনকের স্বল্পায়ু প্রাণ। ইতিহাসের নৃশংসতম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একটি সফল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

অবজ্ঞা-অবহেলায় পতিত বঙ্গবন্ধুর শবদেহ : অবাক স্তব্ধীভূত খবরে ভোর আলোয় হারিয়েছে নিন্দিত রজনী। বাঙালি বাংলাকে অভিভাবকশূন্য করে হন্তারক দল ফিরে গেছে তাদের আপন গন্তব্যে। প্রাণশূন্য বঙ্গবন্ধু তখনো পড়ে আছেন বত্রিশ নম্বরের রক্তাক্ত মেঝেতে। অবশেষে জাতির জনকের নিথর দেহটি কড়া প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ার দুর্ভাগাপল্লীতে। শোকে স্তব্ধ আলো-বাতাসের নিঃশব্দ কান্নায় ভারী টুঙ্গিপাড়ার মৃত্তিকা-ময়দানে নামানো হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর বিপন্ন দেহ। তখন অযত্ন-অবহেলার চরম বাস্তবতা দেখে টুঙ্গিপাড়ার মাটি প্রকৃতি। বাংলার মাটি মানুষের কল্যাণে প্রাণ উৎসর্গকারী শুচিশুদ্ধ আত্মার দীর্ঘদেহী মানুষটির সঙ্গে বাঙালির নিম্নশ্রেণিভুক্ত ঘৃণ্য গোষ্ঠীর অসহনীয় আচরণে মানবতার দেবী মুখ লুকিয়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করেন। পরাধীন বাংলা ও মুক্তিকামী বাঙালির জন্য নিজেকে আজন্ম সঁপে দেয়ার অপরাধ এবং মুক্ত স্বাধীন ভূমের বিধ্বস্ত বাংলায় শান্তিসুখের চিরস্থায়ী কল্যাণ কামনান্তে ব্যতিব্যস্ততার অপরাধই হয়তো বঙ্গবন্ধুকে দস্যুপনার দুর্দান্ত প্রতিযোগিতায় প্রাণ বলিদান করতে হয়েছে।

অস্ত্র হাতের প্রাণহরণকারী মহড়া শেষে শবদেহ সৎকারে ধর্মীয় বিধানের পবিত্র ক্রিয়াদি সম্পন্নেও ছিল হায়েনা শক্তির অশুভ দাম্ভিকতা। মুর্দা মানুষটিকে কবরস্থ করার পূর্ব আত্মা শুচিতায় যা করার কথা ছিল তার কিছুই করতে দেয়া হয়নি। ভীতসন্ত্রস্ত টুঙ্গিপাড়ার স্থানীয় কয়েকজন ডেকে এনে লাশ দ্রুত মাটিচাপা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর বুলেট বিকৃত দেহ দেখে ভয়াতুর স্থানীয় দু’একজন মৃত মানুষটির সৎকারপূর্ব রীতি-নিয়ম রক্ষার অনুরোধ জানালে তার অনুমতি মেলেনি বরং দ্রুত কাজ সম্পাদনের তাগিদ দেয়া হয়। এভাবেই সম্পূর্ণ অবজ্ঞা-অবহেলার অযাচিত অপকর্মে চিরশায়িত হন স্বাধীন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি বাংলাদেশের জন্য অজস্র অবদানের পাহাড়সম খ্যাতিচূড়ায় আরোহিত মানুষটির কোনো দিকই টলাতে পারেনি অস্ত্রহাতে দানবীয় রূপধারণকারী খুনিবাজ পাষাণী হৃদয়। কত বড় অপরাধে অপরাধী হলে একজন মানুষকে এমন কঠিন পরিণতি বরণ করতে হয়। সেটা কেবল সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করতে পারবেন। জানি না কোন অপরাধে ইতিহাসের বর্বরোচিত কালো অধ্যায়ের জন্ম দিল বাঙালি বীভৎসবাদীরা।

বাঙালি বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু : বাঙালি এমনটি করতে পারে তা কখনো বিশ্বাসই করতেন না মানবতার বিস্ময় বঙ্গবন্ধু। তার সাহস, প্রজ্ঞা, বীরত্বের কাছে চিরশত্রু পাক ভুট্টো-ইয়াহিয়া ও বৈশ্বিক শক্তিধর ক্ষমতা মাথানত করলেও কেবল বাঙালি ঐ সারমেয় শাবকেরাই বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত নজির স্থাপন করল। হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে বঙ্গবন্ধু বাঙালির জন্য যে শাশ্বত মুক্তির ভিত রচনা করেছিলেন সেই কৃতজ্ঞতাবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমগোত্রীয় জাতির অকৃতজ্ঞ অসুরেরা বিশ্বাস ভালোবাসার সুপরিপক্ব ভিতকেই নাড়িয়ে দেয়নি চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে একটি জাতি তথা মানববিশ্বের মহামহিম বাংলা গড়ার অন্যতম কারিগর নিপুণ মানুষটিকে। যার কোমল মনের বিস্তৃত অঙ্গনে শুধু বাঙালির বসতই ছিল না, আপন অস্তিত্বে তিনি শোষিত বাংলার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বপ্নই সর্বদা লালন করে গেছেন।

বাঙালির আস্থা, বিশ্বাস, ভরসার প্রতিদানও দিয়েছিলেন নিজেকে মৃত্যুর অগ্নিকুণ্ডলীতে ছুড়ে দিয়ে। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় রেখে শত্রুপক্ষের প্রতি একটি অনুরোধের কাতর উক্তি তুলে ধরে মৃত্যুমুখী বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলে দাও বাধা নেই, তবে মৃত্যুর পর লাশটা আমার বাঙালির কাছে পৌঁছে দিও।’ একটি জাতিকে কতখানি ভালোবাসলে, কতটুকু বিশ্বাস করলে, কতটুকু আপন ভাবলে একজন নেতা এমন কথা বলতে পারেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে বিশ্বাস করেছিলেন বলেই প্রাণবধের চতুর চক্রান্তবিষয়ক বিদেশি গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও প্রাণপ্রিয় জাতিকে অবিশ্বাস করা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বিশ্বাস, ভালোবাসা ও প্রগাঢ় মমত্ববোধের আস্থাশীল অঙ্গনে আবদ্ধ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি বাসভবন ছেড়ে নিরাপত্তাহীন নিজস্ব বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এমন সাদামাটা জীবনযাপনে বিস্মিত ভিনদেশি সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, এখানে যে আপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সরকারি বাসভবন ছেড়ে আপনি এখানে কেন? বাঙালিপ্রিয় বঙ্গবন্ধু দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের নেতা, নিরাপদ চৌকিতে থাকলে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে সাধারণ মানুষ সহজে আমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। এমন পরিবেশই আমার উপযুক্ত স্থান।’

মোর ব্যথিত প্রশ্ন পিতা : পিতা তুমি আজ নেই। তোমার অবর্তমানে পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্যবিড়ম্বিত এক বঙ্গযুবকের ব্যথিত প্রশ্ন- বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হলো? জবাব দে, খুনিচক্রের হে অসুরাত্মা! হয়তো দম্ভ করে বঙ্গবন্ধুবিরোধী বিকৃত প্রলাপ বকবে। যা করে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুবিনাশী শক্তির আদর্শে বিশ্বাসী একটি ধূর্ত মহল। তারা এক তর্জনী ইশারায় একত্রিত বাঙালির বীরত্বপনায় সাহস-শক্তি ও নেতৃত্বের দুর্লভ ক্ষমতা প্রদর্শনকারী বঙ্গবন্ধু নির্মিত স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করেও জাতির জনকের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে পারছে না। কেন তাদের এই স্ববিরোধী আচরণ? তাহলে কি বঙ্গবন্ধু এই অন্যায্যধারীদের ভালোবাসার বৃন্তে আটকাতে পারেননি। না, বিশাল মনের অধিকারী সুকর্মের পথিকৃৎ বঙ্গবন্ধু শত্রুমিত্র সবাইকে বুকে টেনে নেয়ার ক্ষমতা রাখেন। আজকে যারা শোকাচ্ছন্ন পনেরো আগস্টে মোমবাতি জ্বেলে মিষ্টিমুখের আয়োজন করেন তাদের রাজনৈতিক জননীর বেদনাশ্রিত অতীত কাব্যের ভাগ্যকথা সেই মানবতাবাদী বঙ্গবন্ধু নিজ হাতেই লিখেছিলেন। যা ইতিহাসের পাতায় আজও লিপিবদ্ধ আছে। এক বিভ্রান্ত, বানোয়াট ও মিথ্যাবাদী মাতার অসহায়ত্ব ঘুচিয়ে নতুন জীবনের সূচনাকারী বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবরণের মর্মন্তুদ দিনটিতে এসব বেহায়াপনা কিসের ইঙ্গিত বহন করে? শুধু তাই নয়, তাদেরই সাঙ্গোপাঙ্গ অলীক চরিত্রগুলো তুচ্ছতাচ্ছিলতায় বঙ্গবন্ধুকে বারবার অসম্মান করে যাচ্ছে। ধিক্ তাদের ধিক্।

তুমি মৃত্যুহীন এক শাশ্বত প্রাণ : পিতা তুমি অমর, অক্ষয়, চিরজাগ্রত বাঙালির মানসপটে। তুমি মঙ্গলালোকের মহীয়ান অমরাত্মা। তুমি অনাদিকালের অনুসরণীয় স্তুতিমুগ্ধ পথিকৃৎ। যশ-খ্যাতি-মর্যাদায় তুমি পৃথিবীশ্রেষ্ঠ, পিতা তুমি অবিনশ্বর। দুষ্ট চক্রান্তের হায়েনারূপী পশুত্বপনা হয়তো তোমার সজীব দেহটা বুলেটের বেয়োনটে ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু ওই মেঘালয়গিরির সুউচ্চ কীর্তির ঠায় দাঁড়ানো স্থির মহিমা মুছে ফেলতে পারেনি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হন্তারক গোষ্ঠী। বাংলার বহমান নদী, গাঢ় সবুজের বিস্তীর্ণ হাওর, ডানা মেলা বিহঙ্গ পাল, তরুলতা-বৃক্ষরাজি, বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা, অজপাড়াগাঁওয়ের মেঠোপথ, শহরের অলিগলি, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কিংবা বৈশ্বিক মর্যাদাশীল আসন সবখানেই সমহিমায় উদ্ভাসিত তুমি।

তুমি চিরঞ্জীব। তুমি যে বঙ্গবন্ধু। বাংলার অকৃতজ্ঞ পাপিষ্ঠ কিছু অর্বাচীন বিনে কৃতজ্ঞ বাঙালির সমগ্র চেতনায় তুমি সসম্মানে অধিষ্ঠিত। বাংলা মাও যে তোমার আত্মার শান্তি কামনায় আজও ব্রত পালন করে আসছেন। তোমায় কৃতজ্ঞ অনেক বাঙালি সন্তানেরা আজঅবধি অনশন পালন করে আসছেন। এই নৃশংসতার প্রতিবাদে কেউ খালি পায়ে হাঁটছেন, কেউ গায়ে জড়িয়েছেন শোকের কালো পোশাক, কেউবা তোমার দুই এতিম অনাথ সন্তানের জন্য জায়গা কিনে রেখেছেন, কেউবা তোমার ছবি বুকে জড়িয়ে সর্বদা কেঁদে চলেছেন। সত্যিই তুমি মৃত্যুহীন এক শাশ্বত প্রাণ।

বঙ্গবন্ধু জন্ম, কর্ম ও মৃত্যু : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর নামের পাশে বিশেষ কোনো বিশেষণের প্রয়োজন নেই। যিনি নিজে ইতিহাস এবং সৃষ্টি করে গেছেন অনেক কালজয়ী ইতিহাসের। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান, আর মা মোছাম্মৎ সায়েরা বেগম। পরিবারের প্রথম পুত্র সন্তান ছিলেন তিনি। ৪ বোন ও ২ ভাইয়ের মাঝে তৃতীয় ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ বছর বয়সে ১৯২৭ সালে শিক্ষার হাতেকড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। অল্প বয়সে শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয় ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে। পরবর্তীতে এই দম্পতি ৩ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।

১৯৪০ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ স্কুল পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে একটি দাবি নিয়ে তাদের সামনে হাজির হলো কয়েক ছাত্র। ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক তাঁর তহবিল থেকে অনুদান দিয়ে তাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখান। আর এই ছাত্রদের মধ্যে প্রতিবাদী নেতা ছিলেন চিপচিপে চেহারার ছেলেটি শেখ মুজিবুর রহমান। হালকা গড়নের ওই ছেলেটিই বাঙালি জাতিকে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতা। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান (কারান্তরীণ অবস্থায়) যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৩ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধুর বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে জেলের কালো প্রকোষ্ঠে।

অজপাড়াগাঁওয়ে বড় হওয়া সহজ-সরল এই ছেলেটিই একদিন হয়ে উঠবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে জানত। তিনি তাঁর মেধা, মনন, সাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে রূপান্তরিত হয়েছিলেন জাতির পিতায়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো বাঙালি জাতি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১, ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হয় প্রিয় বাংলাদেশ। হায়েনা মুক্ত হয় বাঙালি, বাংলার প্রতিটি অঞ্চল। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলা। কিন্তু এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রেই হত্যা করা হয় জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুকে।

পিতা মোরা অপরাধী : হে জনক মোরা অপরাধী! তোমার অসামান্য অর্জন ও জীবনবাজি ভালোবাসার যৎসামান্য প্রতিদানও দিতে পারেনি অধম বাঙালি। শোষণ বঞ্চনার বিকৃত বেহায়াপনায় বিপন্ন যে জাতিকে চিরমুক্তির সাধ পাইয়ে দিলে সেই জাতির নিমকহারাম সন্তানেরা বুলেটের বিষমাখা নিশানায় ক্ষত-বিক্ষত করল তোমার হার না মানা বিপ্লবী বুক। একটি জাতির দীর্ঘ যন্ত্রণা ঘুচিয়ে স্বাধীনতার সুখ চিনিয়ে আনার মহামানবতুল্য বিরল ক্ষমতাধর মানবতাবাদী মহত্বের মূল্যায়নটুকুও করতে পারিনি আমরা, ছি! ছি! ছি! চরম পৈশাচিকতা, বীভৎস বর্বরতা, নির্মম নষ্টামী ও অযাচিত অসভ্যপনায় ধ্বংস করে দেয়া হলো তোমার মানবতাবাদী দেহটি।

পিতা তুমি কত বড় অপরাধী! মহাপাপ করে বসলে তুমি! যাদের জন্য, যে ভূমির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেলে, সেই স্বাধীন ভূখণ্ডের মুক্ত জাতির বাঙালি বিপথগামী সন্তানেরাই মানবতাহীন মর্মস্পর্শী কায়দায় হত্যা করল তোমায়। নরকের নোংরা আস্তানায় পাপিষ্ঠ আত্মাকে কীভাবে শাস্তি দেয়া হয় জানিনে, তবে তোমার জীবন জয়ের বিশালতার পাওনাস্বরূপ যে প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দেয়া হলো তা নরককুণ্ডলীর বহ্নিশিখার ভয়াবহ উত্তাপ থেকেও পীড়াদায়ক। পিতা জুলুমবাজ পাক শত্রুরা তোমায় মৃত্যুকবরের ভয় দেখানো ছাড়া গিরিসম ব্যক্তিত্বের কাছে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে পারেনি সেখানে তোমারই সমজাতির কুপ্রবৃত্তিধারী কিছু উচ্চাভিলাষী বাঙালি প্রেতাত্মার নির্দয় আঘাতে নিঃশেষ তোমার তেজস্বী প্রাণ। এ জাতির কল্যাণ সাধনই যে ছিল তোমার অন্যতম ব্রত। শোষিত বাঙালির বিবর্ণ মুখে হাসি ফোটানোর মহামন্ত্রে ধ্যানমগ্ন মানুষটির পুণ্যময় প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত করা হলো বাংলাদেশকে। এ যেন পুত্র হাতে পিতা খুনের নজিরবিহীন বর্বরতা। পরপারে ভালো থেকো পিতা। কায়মনোবাক্যে তোমার সুমহান আত্মার শান্তি কামনা করছি।