বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল ওই সময়ে ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন ‘যেহেতু আপনি আওয়ামী লীগে নাই সেহেতু আপনি আমার ব্যক্তিগত দূত হয়ে লন্ডনে অবস্থান নেন স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য।’ যেতে গিয়েও আমি তখন যেতে পারিনি ঢাকা এয়ারপোর্ট পাকিস্তান এয়ারফোর্সের দখলে চলে যাওয়ায়। শেষ পর্যন্ত ৩ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া, আগরতলা ও কলকাতা হয়ে ১৭ এপ্রিল লন্ডনে পৌঁছি।

বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ৯ জানুয়ারি লন্ডনে আসেন তখন আমি লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের তিন তলার একটি কামরায় বাস করি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণের দিন থেকে আমি ভীষণ উৎকণ্ঠিত ছিলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। পাকিস্তানের জেলে আটকে থাকা বঙ্গবন্ধুর অবস্থান নিয়ে জনমনে ও ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমে তখন নানারকম জল্পনা-কল্পনা চলছিল। অনেকের মনে ভয় ছিল পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ শেষে না তাকে হত্যা করে। ভয় কিছুটা কাটল যখন ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমে খবর এলো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কারাগারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আলাপ-আলোচনা করেছেন। তখন থেকে আশায় বুক বেঁধে আছি বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাওয়ার। ৯ জানুয়ারি ভোর পাঁচটায় টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরতেই পেলাম আমার জীবনের বড় সুসংবাদ। বঙ্গবন্ধু সেই মুহূর্তে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে। খবর পেলাম বিলেতের সংবাদ মাধ্যম থেকে। আমি তক্ষুনি বিছানা ছেড়ে প্রস্তুতি নিলাম হিথরো এয়ারপোর্টে যাব বলে। ভিআইপি লাউঞ্জে গিয়ে দেখা পেতে হলে এমন কেউ সঙ্গে থাকা দরকার যার কারণে সিকিউরিটি বেষ্টনী পার হওয়া যায়। ফোন করলাম লেবার পার্টির এমপি ও প্রাক্তন মন্ত্রী Peter Shore -কে। তাকে ফোনে না পেয়ে ফোন করলাম লেবার পার্টির আরেক এমপি Bruce Douglas Mann -কে। তিনি বললেন ‘এক্ষুনি গাড়ি করে রওনা দিচ্ছি আপনাকে পিক আপ করে হিথরোতে যাওয়ার জন্য।’ তিনি আসার আগেই টেলিফোনে খবর এলো ‘Sheikh Mujib has left Heathrwo for Claridge’s Hotel’। Bruce আসার পর তাকে সঙ্গে করে চলে গেলাম লন্ডনের অভিজাত হোটেল Claridge এ। গাড়িতে যেতে যেতে মনে পড়ল সেই দিনটির কথা যখন এই লন্ডনেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৯৬৩ সালে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আলাপ-আলোচনা। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার পথে আপনারা আপনাদের মতো করে এগোন আমি আমার মতো করে এগোবো।’ আবারো মনে পড়ে সেইদিনের কথা যখন বঙ্গবন্ধু আগরতলা ‘ষড়যন্ত্র মামলা’ থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদও তখন ইউরোপ (খুব সম্ভব ইতালি) থেকে লন্ডনে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। তখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়েছে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে যা তিনি এখনো মনে রাখেন এবং কখনো দেখা হলে সে সম্পর্কে আমাকে লিখতে বলেন।

লন্ডনের সবচেয়ে বনেদি হোটেল হলো Claridge ও Savoy। এদের বয়সকাল ১০০ বছরের ওপর। বিলেতের সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর প্রিয় হোটেল। দুরু দুরু বুকে হোটেলের যে suite -এ বঙ্গবন্ধু অবস্থান করছিলেন সেখানে গিয়ে দেখি দরজার বাইরে একজন নিরস্ত্র পুলিশ দাঁড়িয়ে। পাশেই দাঁড়িয়ে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাকিস্তান হাইকমিশনে কর্মরত প্রাক্তন কাউন্সিলর রেজাউল করিম। সে দিন-দশেক আগে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সার্ভিস ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের কার্যালয় ‘বাংলাদেশ মিশনে’ যোগ দেয়। বঙ্গবন্ধু এই সময়ে লন্ডনে অবস্থানকালে সে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। তখন ভোর ছয়টা আর কেউ কোথাও নেই। একেবারে নিরিবিলি পরিবেশ। হোটেল স্যুটের ভেতরে ঢুকতেই দেখি বেশ বড় পরিসর কামরায় একটি চেয়ারে বঙ্গবন্ধু বসা। আমি, ব্রুস ও সুরাইয়া (লন্ডনে মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রমের একজন একনিষ্ঠ কর্মী) কামরায় ঢুকতেই বঙ্গবন্ধু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের উভয়ের চোখে বেদনা মিশ্রিত আনন্দের অশ্রু। সেই মুহূর্তের অনুভূতি এখনো আমার স্মৃতি পটে সমুজ্জ্বল। Bruce ও সুরাইয়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে চলে গেল। আমি তখন একা বঙ্গবন্ধুর স্যুটে (Suite)। ভোর তখন ৭টা কি সাড়ে ৭টা, এমন সময় স্যুটের শোবার ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল।

আমি টেলিফোন ধরতেই টেলিফোন অপারেটর আমাকে বলল ‘Mrs Indira andhi is on the line. She wants to talk to the President।’ আমি বললাম ‘Madam please hold on for a moment. ও am passing the telephone to the President’ -এই বলে আমি কামরা থেকে বেরিয়ে গেলাম এই ভেবে যে, তাদের মধ্যকার আলাপ আমার শোনা শোভনীয় হবে না ভেবে।

ভোর ৮টা থেকে লোক জড়ো হতে শুরু করে হোটেল লাউঞ্জে। শেষাবধি শত শত বাঙালি বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে রাস্তায় ভিড় করে বঙ্গবন্ধুর দেখা পাওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু শোবার ঘরে Breakfast করার পরে একটু বিশ্রামে থাকলেন। ভোর ৯টার দিকে ভারতীয় হাইকমিশনার আমাকে অনুরোধ করলেন বঙ্গবন্ধুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর একটি জরুরি মেসেজ দিতে। মেসেজটি ছিল বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি স্পেশাল ভারতীয় প্লেন Heathrwo Airport-G standby থাকবে। বঙ্গবন্ধু দিল্লি হয়ে ঢাকায় গেলে উনি বাধিত হবেন। শোবার ঘরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মেসেজটি দিলে পরে তিনি আমাকে বললেন আমি ভেবে দেখি। তিনি শেষ পর্যন্ত ৯ তারিখ বিকেল ৫টায় ভারতীয় প্লেনে না গিয়ে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত এক স্পেশাল ফ্লাইটে করে ঢাকায় আসেন এবং দিল্লী শহরে না গিয়ে দিল্লি এয়ারপোর্টে ২ ঘণ্টা বিরতিতে ছিলেন। মিসেস গান্ধী এয়ারপোর্টে গিয়ে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। আমি মনে করি ব্রিটিশ প্লেনে আসার পেছনে একটি গূঢ় কূটনৈতিক ইঙ্গিত ছিল।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মিশনে টেলিভিশনের পর্দায় যখন দেখি সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ভারতের আঞ্চলিক সেনাপ্রধান জেনারেল অরোরার কাছে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করছে অথচ প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কোনো প্রতিনিধি কিংবা আমাদের মুক্তিবাহিনীর সেনাপ্রধান জেনারেল ওসমানী সেখানে নাই। তখন থেকে আমি শঙ্কিত মনে ভাবলাম আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রাম অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসাতে আমার মন থেকে সেই ঘোর কেটে যায়। স্বাধীনচেতা ও পর্বত সমান ব্যক্তিত্বের অধিকারী বঙ্গবন্ধুর কারণে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বেহাত না হয়ে পরিপূর্ণতা পায়। তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ ভারতের প্রবল চাপের মুখেও বঙ্গবন্ধুর ওআইসি (Organisation of Islamic Conference) সম্মেলনে যোগদান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ।

লন্ডনের হোটেলে অবস্থানকালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন টিভি সাংবাদিক David Frost আমাকে অনুরোধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকার করিয়ে দেয়ার জন্য। আমি বঙ্গবন্ধুকে কথাটা উত্থাপন করলে তিনি আমাকে বললেন, ‘David Frost! আমি তো তার একজন ভক্ত-দর্শক। ওকে আমার কামরায় নিয়ে আসেন।’ আমি উধারফকে শোবার কামরায় নিয়ে যাই। বঙ্গবন্ধু তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন ‘I invite you come to my country. I will give you exclusive interviwe over there’। David Frost কিছুদিনের মধ্যে ঢাকায় এসে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তার সাক্ষাৎকার নেন যা বিশ্বব্যাপী প্রচার লাভ করে।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে লন্ডন হয়ে বাংলাদেশে ফেরার সময় তার সফরসঙ্গী ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তাকে সঙ্গে করেই তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী Edward Heath এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ফিরে জনসমাবেশে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা আমার কাছে মনে হয়েছিল খুবই উদার মনের যুগোপযোগী প্রজ্ঞাময় বক্তৃতা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ যেমন জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল তেমনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে যে বক্তব্য জনসমাবেশে দিয়েছিলেন তাও জাতির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। কেন জানি না বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ আওয়ামী লীগ তুলে ধরে না। জাতির ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুকে আমরা ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি ফিরে পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু ব্যতিরেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অঙ্কুরেই খর্ব হয়ে যেত। ১০ জানুয়ারিতে তার প্রত্যাবর্তন শুধু ফিরে আসা নয়- এ ছিল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ সন্ধিক্ষণ।
লেখক : প্রকাশক, দৈনিক মানবকণ্ঠ

মানবকণ্ঠ/এসএস