বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারায় উন্নয়নশীল দেশ ও জাতীয়তাবাদ সুরক্ষা

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এ দিনটি মানবসভ্যতার জঘণ্যতম ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের কালিমালিপ্ত বেদনা বিধুর এক শোকের দিন। বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক কিংবদন্তী পুরুষ, বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ৫টা ২০ মিনিটে কাকডাকা ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কিছু কর্মকর্তা দেশী-বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে ও নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে স্বপরিবারে হত্যা করে।

তিনি বাঙালিকে পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিতে একযুগের চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাপ্রকোস্টে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কিছুক্ষণ পর খুনিচক্র সকাল বেলা রেডিও স্টেশন দখল করে এবং বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয় বলে প্রচারণা চালায়। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যকে হত্যা করে নিজের পথ সুগম করে খুনিচক্রের নৈপথ্যের নায়ক সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী জেনারেল জিয়া।

১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তযোদ্ধা ক্যাপ্টেন কামাল, দ্বিতীয় পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেল, নবপরিনীতা পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও বঙ্গবন্ধুর ভগ্নীপতি কৃষককুলের নয়নমনি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্ণেল জামিলসহ ১৯ জনকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি প্রেতাত্মা নরপিশাচরূপী ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি হত্যার বিচারের পথ চিররুদ্ধ করতে ঘৃণ্য ইনডেমনিটি আইন পাস করেছিল। ৭৫’ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের আদর্শবিরোধী জিয়ার সামরিকচক্র মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের সরকারি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সেনাবাহিনীতে অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দুই বছরের সিনিয়রিটি দিয়ে পদোন্নতি করে সুবিধামত স্থলাভিষিক্ত করা হয়।

১৯৭৮ সালে ছয়জন রাজাকারকে জিয়ার মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভূক্ত এবং স্বাধীনতার ঘোরবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে বাঙালি জাতির ললাটে কলঙ্ক লেপন করে। বাঙালি জাতির শত্রু গোলাম আজম পাকিস্তানি পাসপোর্ট সম্বল করে ১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই বাংলাদেশে ঠাঁই পায়। জেনারেল জিয়া প্রাথমিকভাবে তিন মাসের ভিসা দিলেও পরবর্তীতে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালে গণভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে জিয়ার সামরিক চক্র রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অবস্থা ফিরিয়ে আনে। পাকিস্তানের নিকট বাংলাদেশের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা আদায়ের প্রশ্ন ধামাচাপা দিয়ে, পরাজিত পাকিস্তান থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি না করে বাংলাদেশে স্থাপিত এগারোটি বৃহৎ শিল্প-কলকারখানা দুর্বিনীত পাকিস্তানি মালিকদের ফিরিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নবায়ন করে।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের বিপ্লবী স্লোগান ‘জয় বাংলা’র বিরোধীতা পাকিস্তানপ্রীতির আরেকটি লক্ষণ। জিয়া বলেন, হিন্দুর লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও পতাকা পরিবর্তন করা হবে। বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের অনুকরণে রেডিও বাংলাদেশ করা হয়। বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা এবং ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন না করে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। জিয়ার সামরিক চক্রের সকল কর্মযজ্ঞ ছিল বাংলাদেশ চেতনা পরিপন্থি ও পাকিস্তানপ্রীতির। ৩০ লাখ শহীদের আত্মহুতি ও ২ লাখ কন্যা-জায়া-জননী’র সম্ভ্রমহানী ভূলণ্ঠিত হয় ’৭৫-উত্তর স্বৈরশাসনামলে।

গত ২৫ জুলাই পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ছকে একক সংঘাগরিষ্ঠতা পায়নি কোন দল। ইমরান খানের পিটিআই ১১৫টি আসন পেলেও সরকার গঠনে আরো ২২টি আসন প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে জঙ্গি আক্রমের প্রধান আসামি মাওলানা হাফিজ সাঈদকে মুক্তি দিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া হয়। সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০ মিলিয়ন পুরস্কার ঘোষণা করে। সন্ত্রাসী শিয়াবিরোধী নেতা আওরঙ্গজেবকে কারাগার থেকে বের করে নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়া হয়- যিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বলেন নির্বাচিত হলে পাকিস্তানি শিয়াদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে অথবা তাদেরকে হত্যা করা হবে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পাকিস্তান আমলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদ কর্তৃক বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করার অধিকার ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোন্নয়ন এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে নব উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালি যে স্বর্ণযুগ খুঁজে পেয়েছে, স্বাধীনতাপূর্ব তা কল্পনাতীত। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ধনতান্ত্রিক উন্নয়ন ও বন্টন ব্যবস্থার জন্য স্বাধীনতার সুফল শ্রমজীবী ও কৃষিকাজে নিয়োজিত জনসাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। স্বাধীনতার পর সংবিধানের চার মূলনীতির একটিও অবশিষ্ট ছিল না। বাংলাদেশের নাম ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি সুদীর্ঘ ২১ বছর দেশের ভৌগলিক সীমারেখায়।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কাবেরি-গঙ্গা বিধৌত এই ব-দ্বীপের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভৌগোলিক মানচিত্রের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে পতাকা ও জাতীয় সংগীত উপহার দিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে আমাদের সকলের আশা আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক এবং সত্তার প্রতিচ্ছবি। তিনি আমাদের ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন-মানসম্মানের সঙ্গে একাকার হয়ে আছেন। বাঙালির বীরত্বগাথা ’৫২’র ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ২১ দফা, ছাত্রলীগের ১১ দফা, বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা, ৭০’-এর জাতিসত্তার নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান ইতিহাসের প্রত্যক্ষ উজ্জ্বল সাক্ষী।

বঙ্গবন্ধু বিশ্বের একমাত্র নেতা, যাকে সরকার দু’বার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। একবার ৭৯ সালে ও আরেকবার মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানের কারাগারে থাকাবস্থায়। যুদ্ধকালীন সময়ে ৯ আগস্ট পাকিস্তানের আদালতে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির রায় কার্যকরের জন্য স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল, সেদিনই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ের সঙ্গে ভারতের সামরিক চুক্তি হয়। এই রায় স্থগিতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে সাবেক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ম্যাকব্রাইটের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী টিম পাকিস্তানে প্রেরণ করেন। ফলে পাকিস্তানের আদালতের সেই স্বাক্ষর স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, আজ হতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্বপাকিস্তান না, শুধুমাত্র বাংলাদেশ।

পবিত্র ধর্মের নামে এই অশুভ ও কলঙ্কিত সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি ও পাকিস্তানের পদলেহনকারী এদেশিয় দোসররা। স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রটি দীর্ঘ ২১ বছর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে যে, ক্ষমতায় গেলে মসজিদে আর আজান শোনা যাবে না, ভেসে আসবে হিন্দুদের উলুধ্বনি। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর স্বার্থক উত্তরসূরী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভালবাসায় সিক্ত ও আস্থাশীল হয়ে ’৯৬ সালে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার উদ্যোগসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রতিষ্ঠান ও সমর্থিত জনগোষ্ঠিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নানা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হলে নিয়মতান্ত্রিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে ঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেন। সকল ক্ষেত্রে এদেশকে নিয়ে যান এক অভাবনীয় ও অকল্পনীয় অধ্যায়ে।

আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থে দেশের অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নির্মাণাধীন। এত অল্প সময়ে বাংলাদেশকে তিনি নিয়ে গেছেন একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে। জাতিসংঘ তার অধিভূক্ত দেশগুলোকে বলেছে উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নকে অনুসরণ করতে। চার দশক পিছিয়ে থাকার পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ভারত পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মাথাপিছু আয় তাদেরকে ছাড়িয়ে যাবে। সম্প্রতি কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ২য় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবস্থান দখল করে।

সাম্প্রদায়িকতা নয়, মুুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধ। শেখ হাসিনার সরকার বিশ্বে প্রশংসিত। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে যা হবে অর্থনীতিকভাবে সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অসহায় গরীব-দুঃখি মানুষের মুখে ফুটানোই ছিল তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্ন। জাতির পিতা বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার কন্যা মানবতার পাশে মানবতার জননী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দারিদ্রকে জয় করে বিশ্বসভায় একটি উন্নয়নশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা কোন অপশক্তি দাবিয়ে রাখতে পারবেনা। আর উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রতিষ্ঠান ও জাতীয়তাবাদ সুরক্ষা এবং ২০৪১ সালের অনেক আগেই উন্নত দেশে উন্নীত হবে বাংলাদেশ।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

মানবকণ্ঠ/এফএইচ