ফ্রিজ এসি ও কম্প্রেসর তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার দাবি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক:
রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার এবং এসি উৎপাদনে নীতি সহায়তা শেষ হবে আগামী অর্থবছরের জুনে। তবে এখনো এ শিল্প নীতি সহায়তা ছাড়া প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি। বিশেষ করে সম্প্রতি রফতানির বাজারে প্রবেশ করেছে এ শিল্প। এ অবস্থায় আগামী জুনে মূসক অব্যাহতির সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে বিশাল সম্ভাবনা। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদে এ সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি করেছেন উদ্যোক্তারা।
এদিকে দেশে তৈরি কম্প্রেসরের ক্ষেত্রে আরোপিত ভ্যাট ও শুল্ক বৈষম্য এ শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে কম্প্রেসর উৎপাদনে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার এবং কাঁচামাল আমদানিতে ভারসাম্যমূলক শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বিগত কয়েক বছর ধরে ফ্রিজ এবং এসি উৎপাদন খাত আশানুরূপ উন্নতি সাধন করেছে। মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ জোগান দিচ্ছেন স্থানীয় উৎপাদকরা। ফ্রিজ এসি উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়সম্পূর্ণ; আমদানি না করলেও চলে। এমনকি এসব পণ্য এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ রফতানিও হচ্ছে। ২০২০ সাল নাগাদ ১০০ মিলিয়ন ডলারের রফতানির টার্গেট রয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে কিছু স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা এবং সরকারের নীতি সহায়তার কারণে। ভ্যাট অব্যাহতি এবং অন্যান্য শুল্ক সহায়তা এ খাতকে বিকশিত করছে। তবে পূর্ণাঙ্গ বিকাশে দরকার বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু আগামী জুনের পর এই সহায়তা নাও থাকতে পারে। কারণ সবশেষ দুই বছরের জন্য প্রদেয় সুবিধা আগামী জুনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত বিকাশমান এ খাতকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে সরকারের এই সহায়তা অব্যাহত রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
উদ্যোক্তাদের মতে, এক সময় ফ্রিজ ও এসির বাজার ছিল পুরোটাই আমদানি নির্ভর। এখন দেশেই এসব পণ্য তৈরি করছে ওয়ালটন, মিনিস্টার, প্রাণ, যমুনার মতো কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’খ্যাত ফ্রিজ, এসি রফতানি হচ্ছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সম্প্রতি, স্যামসাং এলজিসহ কিছু বহুজাতিক ব্র্যান্ড এ দেশে ফ্রিজ, এসি কারখানা স্থাপন করেছে।
বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, স্থানীয় ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন খাতের বিকাশ চলমান রাখতে বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখা জরুরি। শিল্পবান্ধব শুল্ক ও নীতি সহায়তায় আকৃষ্ট হয়েই দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন। পূর্ণাঙ্গ বিকাশের লক্ষ্যে নতুন প্রোডাকশন লাইন স্থাপন, লেটেস্ট প্রযুক্তি সংযোজন, পণ্য গবেষণা ও উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণসহ এ শিল্পের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান শুল্ক সহায়তা অব্যাহত না থাকলে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ আসবে না। উদ্যোক্তারা দ্বিধায় রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন শিল্পে আগামী জুন পর্যন্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা রয়েছে। উদ্যোক্তারা চাইছেন, এ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা ঘোষণা করুক সরকার। তা হলে বিনিয়োগ বাড়বে, রফতানিবাজার বাড়বে।
এদিকে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছেন দেশের কম্প্রেসর উৎপাদকরা। তারা জানান, বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি কম্প্রেসর আমদানিতে সর্বসাকল্যে ৫ শতাংশ শুল্ক এবং অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। অথচ দেশে যারা কম্প্রেসর উৎপাদন করছেন তাদের দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। আবার কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক দিতে হচ্ছে ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। তার মানে, সম্পূর্ণ তৈরি কম্প্রেসর আমদানি শুল্কের চেয়ে দেশীয় উৎপাদিত কম্প্রেসরে শুল্কের পরিমাণ বেশি। অর্থাৎ উৎপাদনের চেয়ে আমদানি লাভজনক। এই অসম ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোকে স্থানীয় কম্প্রেসার উৎপাদন শিল্প বিকাশের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের দাবি, স্থানীয় উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হোক এবং ভারসাম্যমূলক শুল্ক আরোপ করা হোক। সূত্রমতে, ২০১৭ সালে সারা দেশে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২৩ লাখ ফ্রিজ। যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখের মতো ছিল দেশীয় ব্র্যান্ডের। চলতি বছর ২৭ লাখের মতো ফ্রিজ বিক্রি হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যার প্রায় ২৪ লাখ বিক্রি হবে দেশীয় ব্র্যান্ডের। এসব ফ্রিজে যদি আমদানির পরিবর্তে দেশে তৈরি কম্প্রেসার ব্যবহার করা হয়, তা হলে সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। অন্যদিকে এসব পণ্য রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের নীতি সহায়তা কাজে লাগিয়ে শিল্পোদ্যাক্তারা এ খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি সাধন করেছেন। ক্রেতারাও দেশে তৈরি মানসম্পন্ন ফ্রিজ, এসি পাচ্ছেন সাশ্রয়ী মূল্যে। স্থানীয় উৎপাদন শিল্পের দ্রুত বিকাশ আকৃষ্ট করেছে বিদেশি বিনিয়োগকেও। তাই দ্রুত অগ্রসরমান এ খাতের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ নিশ্চিত করতে শুল্ক ও নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখা সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.