ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বানানো হচ্ছে তুলা

ব্যবহারের পর পুরনো প্লাস্টিকের বোতল যেখানে সেখানে ফেলে দেবেন না। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি, অন্যদিকে মূল্যহীন ভাবলেও সেটা এখন আর মূল্যহীন নয়। এই খালি বোতলের চাহিদাও এখন কম নয়। সম্ভব হলে জমিয়ে রাখুন। ভাবছেন কেন? কারণ এই পুরনো বোতল দিয়েই তৈরি হবে তুলা। আর রিসাইকেল পদ্ধতিতে এটা এখন সম্ভব হচ্ছে বাংলাদেশেই। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পানিয়াশাইলে চীনা প্রযুক্তিতে মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কারখানায় প্লাস্টিকের বোতল থেকে তৈরি হচ্ছে তুলা। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি যা বিদেশে রফতানি করেও আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশে এই ধরনের চিন্তা প্রথম মাথায় আসে মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের এমডি আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসার।

সেটাও আবার ডিস্কোভারি টিভি চ্যালেন দেখতে দেখতে। সেখানেই তিনি প্রথম দেখেন- প্লাস্টিকের বোতল থেকে তুলা তৈরির পদ্ধতি। চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ অল্প কয়েকটি দেশে এই প্রদ্ধতিতে তুলা তৈরি হলেও বাংলাদেশে তখনো পর্যন্ত কেউ তা করেনি। সাহস করে সেই কাজটিই শুরু করলেন মূসা। খোঁজখবর নিয়ে, কয়েকবার চীন গিয়ে সরেজমিন দেখে, সেখানকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলেন তিনি এটা করবেন…।

তবে এই পথ চলা মোটেই সহজ ছিল না। এতে একদিকে যেমন ঝুঁকি ছিল। তেমনি ছিল বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাও। প্রথমে কেউ তো তার কথা বিশ্বাসই করতে চাননি। কি ব্যাংক লোন নিতে গিয়ে, কি মন্ত্রণালয়ে! সবাই বলেছে- প্লাস্টিক থেকে তুলা! এটা কি করে সম্ভব! কিন্তু সেই অসম্ভব কাজটিই করে দেখিয়েছেন মূসা। সবাইকে বুঝিয়েছেন। চীনের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে তাদের দেখিয়েছেন হ্যাঁ, এটা সম্ভব। আমরা করছি তোমরাও পারবে। কারণ এখানে প্রচুর কাঁচামাল রয়েছে। পরে অবশ্য সবাই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আগ্রহের সঙ্গেই পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ মেট্রিক টন তুলা তৈরি হয় মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্যাক্টরিতে। সেখানে প্রতিদিন কাজ করছেন প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক।

মঙ্গলবার সরেজমিনে মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখা যায়- সংগ্রহ করা পুরনো বোতল ছোট করে কেটে ফ্লেক্স তৈরি করা রাখা হচ্ছে। এরপর গরম পানি দিয়ে সেই ফ্লেক্স ধোয়া হয়। উচ্চ তাপ ও চাপে সেই ফ্লেক্স আট ঘণ্টা বায়ু নিরোধক ড্রামে রাখা হয়। ভ্যাকুয়াম ড্রামে তাপ দেয়ার পর তৈরি হয় পেস্ট। সেই পেস্ট স্পিনারেট দিয়ে স্নাইবার করা হয়। এরপর তা সূক্ষ্ম সুতার আকারে বেরিয়ে আসে। ওই সুতা আবার বিভিন্ন আকারে কাটিং করে মেশিনে ঢোকানোর পর পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ) হিসেবে সাদা ফাইবার বেরিয়ে আসে। উৎপাদিত ফাইবার বাজারে বিক্রি করা কার্পাস তুলার মতোই মোলায়েম ও মসৃণ। প্লাস্টিক বোতল থেকে তুলা তৈরির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর রফতানির উদ্দেশ্যে মেশিনেই তা প্যাকেজিং করা হয়। এ থেকে সুতার মতো যে বর্জ্য বের হয় সেটিও আবার রিসাইকেল পদ্ধতিতে ফাইবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

এই পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে রিসাইকিলিং পদ্ধতিতে। এখানে শুধু পুরনো বোতল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে রিসাইকেল্ড ক্লেইম স্ট্যান্ডার্ড- আরসিএস (জবপুপষবফ ঈষধরস ঝঃধহফধৎফ -জঈঝ) সার্টিফিকেটও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মঙ্গলবার এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কন্ট্রোল ইউনিয়ন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল ইসলাম খান প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিসেস নুসরাত জাহান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসার কাছে এই সার্টিফিকেট প্রদান করেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামানসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর মাধ্যমে মেসার্স মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক উৎপাদিত পণ্য পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ)-এর রফতানি বাজার ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও জাপানসহ অন্যান্য দেশে উন্মোচিত হবে বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জানানো হয়।

এদিকে বর্তমানে পেট বোতল ফ্লেক্স রফতানিতে ১০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। আবেদনের পেক্ষিতে মুমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকেও ১০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুগ্ম সচিব এ এইচ এম শফিকুজ্জামান। তবে পরিবেশ ও দেশীয় শিল্পের কথা বিবেচনা বরে এই খাতে ২০ শতাংশ রফতানি ভর্তুকির সুযোগ আশা করেন আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসা। তিনি বলেন, আমাদের উৎপাদিত ফাইবারের চাহিদা বিদেশে থাকলেও দেশে এখনো সে ধরনের চাহিদা তৈরি হয়নি। ফলে যথাযথ মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকার রফতানি ভর্তুকি দিলে সম্ভাবনাময় এই শিল্প খাতের বিকাশ ঘটবে। এতে ফেলে দেয়া বর্জ্য ব্যবহার করে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে, নতুন কর্মসংস্থান হবে। আবার পরিবেশের দূষণ রোধ করবে। একই সঙ্গে আগামীতে এই পুরনো প্লাস্টিকের বোতল থেকে আরো বেশি কিছু পোডাক্ট তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান মূসা।

মানবকণ্ঠ/এএএম