ফের আলোচনায় সংখ্যালঘু নির্যাতন আর সহিংসতা

আবারো দেশের রাজনীতিতে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ বিষয়টি বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছেন। কেননা ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীসহ সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সেই অমানবিক নির্যাতন আবারো দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিয়ে ১৪ দলের নেতারা বলছেন, বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসলে ২০০১ সালের চেয়েও ভয়াবহ সময় ঘনিয়ে আসবে। এমনকি নির্বাচনের আগেও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ আসতে পারে উল্লেখ করে তাদের সতর্ক থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন।

একাত্তরের পর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, গণলুণ্ঠন এবং ব্যাভিচারের ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই ঘটনাকে ওই সময় দেশবরেণ্য সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদ এবং এবিএম মূসা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলে উল্লেখ করে এর বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে এটা সম্ভব হয়নি।

তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ঘটনার বিচারের জন্য ২০০৯ সালে গঠিত হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। এই কমিশন নির্যাতন, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও গণধর্ষণসহ সাড়ে ৩ হাজারের বেশি সহিংসতার ঘটনার প্রমাণ পায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনকে বিএনপি পক্ষপাতদুষ্ট এবং একতরফাভাবে তাদের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করে। সেসব সহিংসতার কথা উল্লেখ করে আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে দলীয় নেতাকর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছেন আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলীয় জোটের নেতারা। তবে বিএনপি এই ঘটনাকে দেশের ভোটারদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভাগ করে ফায়দা লোটার অভিনব চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছে।

২০০১ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে ১৪ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসলে দেশে ১৯৭৫-এর ইন্দোনেশিয়ার মতো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। ওইসময় ইন্দোনেশিয়ায় ১০ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এক প্রতিক্রিয়া বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর চরম নির্যাতন করেছিল। আবার যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে প্রথম দিনেই ১ লাখ মানুষকে হত্যা করবে। আপনারা কেউ বাড়িঘরে থাকতে পারবেন না। এ কথাগুলো আপনাদের মনে রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ২০০১ সালের পরে আমি নিজের চোখে দেখেছি বিএনপির নেতাকর্মীরা মায়ের সামনে মেয়েদের ধরে এনে পাশবিক অত্যাচার করেছে। বাড়িঘরে থাকতে পারেনি মানুষ। নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য পানির ভেতরে নেমে পালিয়েছে, সেখান থেকে উঠিয়ে হিন্দু মা-বোনদের ওপর বিএনপি অত্যাচার করেছে। যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসে প্রথম দিনেই ১ লাখ লোক হত্যা করা হবে। কেউ ঘরে থাকতে পারবে না।

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা তুলে ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর মতো সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসার পর পরই সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নেমে এসেছিল। সংখ্যালঘু নারীরা ধর্ষিতা হয়েছিলেন। এরা আবারো ক্ষমতায় গেলে আপনাদের জন্য অতীতের চেয়েও ভয়াবহ রক্তাক্ত সময় ঘনিয়ে আসবে।

বর্তমান সরকারকে ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীবান্ধব’ হিসেবে অভিহিত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপনাদের আপনজন ছিলেন। এখন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাদের আপনজন। যদি নিজেদের আত্মমর্যাদা, সম্মান ও অধিকার রক্ষা করতে চান, তা হলে আপনাদের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অশুভ সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে পরাজিত করার শপথ নিতে হবে।

তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আঘাত হেনে ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সুসম্পর্ক নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রিজভী আহমেদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেয়া এ বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, দেশের ভোটারদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভাগ করে ফায়দা লোটার অভিনব চক্রান্ত শুরু করেছে আওয়ামী নেতা ও মন্ত্রীরা। ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে’ আকস্মিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতার এই বক্তব্য অশুভ চক্রান্তের ইঙ্গিতবাহী।

রিজভী আরো বলেন, আবহমান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে নেমে পড়েছেন ওবায়দুল কাদের সাহেবরা। জনসমাজে সাম্প্রদায়িক ঐক্য যখন অটুট বন্ধনে গ্রোথিত, তখন ওবায়দুল কাদের সাহেবের আচমকা সাম্প্রদায়িকতা টেনে আনা দেশের মানুষকে পরিকল্পিত বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়ার এক গভীর চক্রান্ত।

মানবকণ্ঠ/এএএম