‘ফেক নিউজ’ বৃত্তান্ত

সকাল থেকেই মাথায় ফেক নিউজ নিয়ে বিভিন্ন ভাবনা। দীর্ঘ একমাস পর আজই অভ্রকে নিয়ে বের হলাম স্যারদের বাসায়। রুম ভর্তি আমরা মায়েরা। হঠাৎ এক ভাবী বলে বসলেন, জ ই মামুন মারা গেছে শুনেছেন। আরেক ভাবীও বললেন। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। উনাকে কখনো দেখিনি, গণমাধ্যম ব্যক্তি হিসেবে যেটুকু চেনার জানার তাই চিনি জানি। মৃত্যুর এক নির্মম সত্যের নাম। তবুও কিছু মৃত্যু অনেক কষ্টের। সকাল থেকে টিভির সংবাদ দেখিনি। দৈনিক সকাল ৭টা দুপুর ২টা, সন্ধ্যা ৭টা ও রাত ১০টার নিউজ দেখি নিয়মিত। এখন দুপুর ২টা। সকালে ও দেখিনি এখনো দেখা হলো না।
তাদের মুখে কথাটা শুনেই ফেসবুক নিউজফিডে যাই। পরপর নিউজ ফিড দেখতে থাকি। না কেউ এমন পোস্ট দেয়নি, উল্লেখ্য আমার ফেসবুক লিস্টে অনেক লেখক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ব্যক্তিরা আছেন। কারো পোস্ট না দেখে যাই এটিএন নিউজের প্রভাষ আমিন ভাইয়ের টাইম লাইনে। চোখ শুধু জ ই মামুনের ছবি খোঁজে। উনার পোস্টে একটা ছবি দেখি, কিন্তু সেটা অচেনা হওয়ায় পোস্ট পড়িনি। গুগুলে জ ই মামুন লিখে সার্চ দিই, কিছুই পাইনি এমন। ভাবছি গণমাধ্যমের কাউকে কল দিব। স্যার রুমে আসায় আর হলো না। এখান থেকে গেলাম অভ্রকে নিয়ে আর্ট একাডেমিতে। একজন বলেন, জ ই মামুন নয়, অন্য এক মামুন মারা গেছেন। তিনিও সাংবাদিক। সঙ্গে সঙ্গে আবার প্রভাষ আমিন ভাইয়ের টাইমলাইনে যাই, পোস্ট পড়ে জানতে পারি ইটিভির সিনিয়র রিপোর্টার মামুন আর নেই। সিনিয়র হলেও বয়স ৩৫-এর আশপাশে হবে। বাসায় ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হলে দ্রুত তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেয়া হলে ডাক্তাররা জানান, আগেই সে মারা গেছেন। মামুনের খবরটা শুনে সত্যি অনেক খারাপ লাগল। এত অল্প বয়সে আপনজনদের ছেড়ে চলে যাওয়া, এই শোক কীভাবে সইবে প্রিয়জনরা। হয়তো এটা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘ফেক নিউজ’ নয়, হয়তো তারা বুঝতে ভুল করেছেন, কিন্তু এমন ভুলগুলো অনেক সময় বিশাল ক্ষতি টেনে আনে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেসব ক্ষতিকর কন্টেন্ট থাকবে তাদের তার দায় বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে ফেসবুক ও ইউটিউব বারবার বলেছে, তারা শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম। তারা যুক্তি দেখান যে, তাদের সার্ভিসে ব্যবহারকারীরা যেসব উপাদান পোস্ট করেন তার জন্য তারা দায়ী নন। নিজেদের শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘোষণা করে দায় এড়াতে পারে না সামাজিক যোগাযোগবিষয়ক কোম্পানিগুলো। তারা প্রযুক্তিবিষয়ক কোম্পানি। তাদের সাইটে যেসব কন্টেন্ট আছে তাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই এমন ভূমিকা তাদের হতে পারে না।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেয়ার আগেই এক প্রশ্নের জবাবে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদক জিম অ্যাকোস্টাকে ট্রাম্প বলে বসেন, ‘আপনি ফেক নিউজ’! এরপর টুইটারে বারবার এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন তিনি। কিছুদিন পর ‘ফেক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষণা করেন তিনি। এরপর থেকেই ‘ফেক নিউজ’ প্রত্যয়টি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং নতুন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগের সঙ্গে সম্পর্ক রচনা করে। বর্তমান সময়ে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর একটি গণতান্ত্রিক সংকট। দিনের পর দিন চলতে চলতে এর ক্ষতিকর দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটছে।
অবাক হলেও সত্যি এটাই যে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মেসিডোনিয়ার ছোট্ট শহর ভেলেসে শুধু ভুয়া খবর তৈরি করে সেখানকার তরুণ-তরুণীরা মাসে হাজার হাজার ইউরো আয় করেছেন। ভেলেস শহর থেকেই সংবাদভিত্তিক প্রায় ১০০ ওয়েবসাইট প্রকাশিত হতো। ট্রাম্পপন্থি ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া সংবাদ প্রচার করত এসব ওয়েবসাইট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ত এসব ভুয়া খবর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রায় ১৪০টি ভুয়া খবরের ওয়েবসাইটের হদিস পাওয়া যায়। আর এসব ভুয়া খবরই বেশি ছড়িয়ে পড়ত ফেসবুকে। যত বেশি মানুষ ওই সব খবরে ক্লিক করত, তত বেশি আয় হতো ওয়েবসাইটগুলোর। কারণ ক্লিক যত বেশি, ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের পাল্লাও তেমন ভারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এখন ভয়ঙ্কর ফাঁদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। ফেসবুকে ভুয়া তথ্য দিয়ে অনেকে মজা পেলেও প্রতারণার শিকার কেউ কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত পর্যন্ত হচ্ছেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ফেসবুকই একদিকে যেমন বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট করছে, তেমন একে ব্যবহার করে কেউ কেউ স্বার্থ হাসিল করছে। প্রতারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে ফেসবুককে। ফেসবুকের যে আইডিগুলোয় ব্যবহারকারী তার নাম, পরিচয়, লিঙ্গ, ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য, কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনার স্থানসহ কোনো কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে ভুয়া বা মিথ্যা তথ্য দেয়, সেগুলোকে ফেক আইডি বলা হয়। তথ্য ও যোগাযোগ খাতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) বলছে, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৬ লাখ। এর মধ্যে ১১ লাখই ভুয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ‘ফেক নিউজ’ সংকটটি মূলত গণতান্ত্রিক বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারা। তারা ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজনৈতিক ডাটা কোম্পানি ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার কেলেঙ্কারি নিয়ে পর্যবেক্ষণে এমন একটি মন্তব্য করেছেন বলে জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘আরাদর.কম’।
এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারের বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, ফেসবুক ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া সংবাদে মানুষের আস্থা সবচেয়ে কম। এই পরিপেক্ষিতে গুগল ও ফেসবুক ভুয়া খবর ঠেকাতে জোরেশোরে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই মাঝে জার্মানিতে ১ জানুয়ারি ২০১৮ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভুয়া খবর ও অবৈধ বিষয়বস্তু সরিয়ে নিতে একটি আইন জারি হয়েছে। এই আইন ভঙ্গ করলে বিপুল পরিমাণ অর্থ জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।
থাইল্যান্ড এরই মধ্যে ভুয়া সংবাদ প্রচার রোধে কারাদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাস করেছে। রোহিঙ্গা সংকটে ফেক নিউজের অজুহাত তুলে রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে ঢুকতেই দিচ্ছে না অং সান সু চির সরকার। এখন পর্যন্ত সেখানে আটক করা হয়েছে ২৯ সাংবাদিককে।
মালয়েশিয়ায় ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ ছড়ানোর অপরাধে প্রস্তাবিত একটি আইনে তৈরি করে। ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ ছড়ালে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১৩০,০০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গত ২৬ মার্চ ২০১৮ (সোমবার) মালয়েশিয়ার সংসদের আইনটি উত্থাপন করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে- পত্র পত্রিকায় ছাপা বা রেডিও-টিভি অনলাইনে প্রচারিত খবর বা তথ্য যদি আংশিকও ভুল হয় তাহলে তাকে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আইনে আরো বলা হয়, মালয়েশিয়া বা মালয়েশিয়ার কোনো নাগরিক সম্পর্কিত কোনো খবর বিদেশে প্রচারিত হলেও সেটি আইনের আওতায় আসবে। বিদেশি মিডিয়ায় মালয়েশিয়া সম্পর্কিত কোনো খবরকে ভুয়া খবর হিসেবে বিবেচনা করা হলে ওই সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম কর্তৃপক্ষ মালয়েশিয়ায় ঢুকলে তার বিরুদ্ধে এই আইনের আওতায় মামলা করা যাবে। (২৬ মার্চ ২০১৮ বিবিসি নিউজ)
বাংলাদেশে ভুয়া খবরের মাধ্যমে গুজব ছাড়ানোর প্রবণতা আছে। সেটা করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়া যান ১৩ অক্টোবর ২০১৭ সালে রাতে। স্বাভাবিকভাবে পরের দিন তার এই বিদেশ যাওয়ার খবর সব দৈনিক পত্রিকা গুরুত্ব দিয়ে ছাপে। ওইদিন বাংলাদেশের পাঠকপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলোর এই বিষয়ে সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘আমি বিব্রত’, বিদেশ যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি’ আর এটা প্রধান শিরোনাম ছিল না। প্রথম পৃষ্ঠার অষ্টম কলামের শীর্ষ খবরটি ছাপা হয়। কিন্তু প্রথম আলোর নামে যে খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তার শিরোনাম হলো, ‘সরকারের চাপের মুখে প্রধান বিচারপতির দেশত্যাগ।’ প্রথম আলোর মাস্টহেড ব্যবহার করে কম্পিউটারে মেকআপ করে প্রতারকরা ওই শিরোনাম প্রধান শিরোনাম করে তার স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
ুভুয়া সংবাদ বা ‘ফেক নিউজ’ সম্পর্কে মন্তব্য
পয়েন্টার ইনস্টিটিউটের ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্কের পরিচালক আলেক্সিওস মান্টজারলিস বিবিসিকে বলেন, ‘সঠিক সংবাদের চাহিদা কমাতে পারেনি ভুয়া সংবাদ। একদিক থেকে বলা যায় যে ভুয়া খবরের বিস্তৃতি অনেক বেশি। কিন্তু এর প্রভাব বেশি গভীরে যেতে পারেনি। ভুয়া খবরের ভিত্তিতে আদৌ পাঠকরা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন কি না বা কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিনা, সেটি নিশ্চিতভাবে বলার সময় এখনো আসেনি। ভুয়া সংবাদ আমাদের গণতন্ত্রকে বিষাক্ত করে তুলছে কিনা, সেটি বলার জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন।’
ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, ভুয়া খবরের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর তার প্রতিষ্ঠান। গুগল ও ফেসবুক-দুই প্রতিষ্ঠানই ভুয়া খবরের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য অসংখ্য কর্মী নিয়োগ দেবে। বাজফিডের সম্পাদক ক্রেইগ সিলভারম্যান বিবিসিকে বলেন, ‘এ দুই প্রতিষ্ঠান কীভাবে পর্যালোচনার কাজটি করবে, তা দেখতে আমি আগ্রহী। মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো এখন অনেক শক্তিশালী। খেয়াল রাখতে হবে যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ভুয়া খবর আটকাতে গিয়ে আবার মত প্রকাশে বাধা না দেয়।’
সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর গণমাধ্যমে অনেক আলোচনা আসে। জনগণের ভেতরে একধরনের আতঙ্ক কাজ করতে থাকে। এটাকে আবার কিছু অসাধু সাংবাদিক পুঁজি করে ‘ফেক নিউজ’ ছড়াতে চেষ্টা করে। এই ঘটনার প্রায় মাস ছয় পরে হঠাৎ শুনতে পাই সাভারের আরেকটা মার্কেটে ফাটল। (মার্কেটের নাম বললাম না) সাভারে মায়ের বাসা বলে যোগাযোগ নিয়মিত। খবর শুনে সঙ্গে সঙ্গে কল করি মাকে, তিনি কিছু বলতে পারেননি। কল করি বোনকে, অতঃপর জানতে পারি আশপাশের কোনো এক সাংবাদিক সেই মার্কেটে যান, কোনো এক বিষয় নিয়ে মালিকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি। একপর্যায়ে সেই সাংবাদিক মার্কেট মালিককে হুমকি দেন, তিনিই প্রচার করেন এই ‘ফেক নিউজ’। ঘটনা বেশি ছড়ানোর আগেই মীমাংসা হয়।
বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো মাঝে মধ্যে ‘ফেক নিউজ’ দেয় আর যাচাই-বাচাই না করে সে নিউজ কপিপেস্ট করে অন্য চ্যানেল। কিছুদিন আগে অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুর নিউজটি ফেক ছিল আবার সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ছাত্রদের আন্দোলনে ফেক ভিডিও প্রচার করে অভিনেত্রী নওশাবা। তাকে আটক কথা হয়, ঈদুল আজহার রাতে তাকে জামিন দেয় আদালত। এই ধরনের ফেক নিউজ সমাজে অনেক প্রভাব ফেলে, যা কখনোই আমাদের কাম্য নয়। – রহিমা আক্তার মৌ