ফেক নিউজের প্রভাব : গণমাধ্যমে বিশ্বাস কমছে পাঠকের

‘বর্তমান গণমাধ্যম যে খবর প্রকাশ করে তার উল্টোটা বিশ্বাস করলেই সঠিক অবস্থা বোঝা যাবে। টাকা খেয়ে দিনকে রাত আর রাতকে দিন করাই সাংবাদিকদের কাজ। আমরাও এখন সচেতন। তারা যা লেখে আমরা তার উল্টোটা ধরে নেই।’ কথাগুলো বলেই উচ্চশব্দে হেসে ওঠেন পঞ্চাশোর্ধ্ব লোকটি। পাশের সিটে বসা আরেক কোট-টাই পরা ভদ্রলোকও মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন দেন। যুক্ত করেন তার পরিচিত একজন কীভাবে এক সাংবাদিকের রোষানলে পড়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন সেই ঘটনা। এ গল্পে উপস্থিত প্রায় সবারই আগ্রহ ছিল বেশ। পাশ থেকে হুঁ, হাঁ শব্দে সমর্থন দেয়ার মানুষও কম ছিল না। সম্প্রতি একটি লেগুনায় কচুক্ষেত থেকে শেওড়াপাড়া যাওয়ার সময় এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করি। অবশ্য এর আগেও যে কারো মুখে এমন কথা শুনিনি তা নয়। ওই লেগুনার কেউই জানতেন না আমি নিজেও একজন গণমাধ্যমকর্মী। তবে জেনেও অনেকে দু’চার কথা শোনাতে ছাড়েন না। তখন হয়তো পরিস্থিতি বুঝে সাধ্যমতো বোঝানোর চেষ্টা করি সব গণমাধ্যম এক নয়। সব সাংবাদিকও এক নয়। যারা মিথ্যে সংবাদে মানুষকে হয়রানি করে তারা মূলধারার সাংবাদিক নয়। নামধারী বা কার্ডধারী সাংবাদিক। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সরকারি নিয়ম তথা এথিক্স মেনেই সংবাদ পরিবেশন করে। কিন্তু পরবর্তী প্রশ্নের জবাব আর দিতে পারি না। এই নামধারী বা কার্ডধারী সাংবাদিকদের তৈরি করে কারা বা তাদের চিহ্নিত করে কেন শাস্তি দেয়া হয় না এমন প্রশ্নে খেই হারিয়ে ফেলি। আসলে উত্তর জানা আছে বলেই বেশি বিব্রত হই। অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মূল ধারার সাংবাদিকের হাত দিয়েই তো এসব কার্ডধারী সাংবাদিকরা গণমাধ্যমে ঢুকে পড়ে। একইসঙ্গে মানুষকে হয়রানি করে বিশ্বাসের জায়গা নষ্ট করে পুরো গণমাধ্যম থেকেই। আবার অনেক মূলধারার সাংবাদিকও পক্ষপাতদুষ্টে দুষ্ট হয়ে ফেক নিউজ করেন। হয়তো বুঝতে চেষ্টা করেন না, তার এ নিউজের কারণে পুরো গণমাধ্যম জগতের প্রতিই তৈরি হবে অনেক পাঠকের নেতিবাচক ধারণা। যা প্রভাব ফেলবে পরবর্তীতে অন্য কোনো সংবাদ পরিবেশনের সময় আবার এসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্য অনেক কপি-পেস্টনির্ভর গণমাধ্যমের হাত ধরে। অনেকে যাচাই-বাছাই না করেই সংবাদটি প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ নিয়ে কিছুদিন আগে মানবকণ্ঠে ‘মূলধারার গণমাধ্যমে কপি-পেস্টের প্রভাব’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সেখানে উল্লেখ করেছিলাম, কীভাবে আমাদের বিশ্বস্ত গণমাধ্যমগুলোও এ দুষ্টে দুষ্ট হচ্ছে। ফেক নিউজ ছড়ানোর আরেকটি কারণ উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার। একটি বা দুটি কম্পিউটার নিয়ে কপি-পেস্ট করতে পারে এমন দু’একজন মিলেই খুলে বসে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম। যেখানে থাকে বিভ্রান্তভরা সংবাদ এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। ফলে বলাই যায়, তথ্য-প্রযুক্তির প্রসারের যুগে মুহূর্তে যেমন খবর ছড়ায় তেমনি মুহূর্তেই ছড়ায় যত বিভ্রান্তি বরং বর্তমানে খবরের চেয়ে অ-খবরই বেশি ছড়ায়-বলা যায়। আর এসব অ-খবরের মধ্যে বা বিভ্রান্তিকর খবরের মধ্য থেকে সঠিক খবর বেছে নেয়ার ক্ষেত্রেও আমরা আশ্রয় খুঁজি ‘মূল ধারার সাংবাদিকতা’ বিশেষণের কাছে। দেশে গণমাধ্যম অনেক থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র গণমাধ্যমে আমার বিশ্বাস আছে। কোনো খবর ছড়ানোর আগে দেখি মাধ্যমটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচুর খবর ভাসে। কোনো কোনোটি বিশেষ আকর্ষিত হলেও তাতে ক্লিক করার আগে সচেতন পাঠক প্রচারমাধ্যমটি আগে দেখে নেন। দেশে বর্তমানে কমপক্ষে পাঁচ হাজার অনলাইন সংবাদমাধ্যম রয়েছে সারাদেশে অনুমোদিত প্রিন্ট পত্রিকা রয়েছে কমপক্ষে তিন হাজার। টেলিভিশন রয়েছে প্রায় ৩০টি। প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ১১টি। এফএম রেডিও-কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন রেডিও-টেলিভিশন তো আছেই। এই বিশালসংখ্যক নামসর্বস্ব গণমাধ্যম রয়েছে। এর অধিকাংশই স্পষ্ট করে বললে হয়তো ৯৯ শতাংশ গণমাধ্যমই তথ্যবহুল খবরের চেয়ে কপি-পেস্ট খবর প্রচারেই বেশি ব্যস্ত। সাধারণের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। এর মধ্যেও যারা একটু সচেতন তারা ওই ‘মূল ধারার গণমাধ্যম’ ট্যাককৃতদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো খবর কানে ভাসলে আগে দেখে নেয় বিশ্বস্ত ‘মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো’ কী বলে? ফেক নিউজ যাচাইয়ে আপাতত এটকেই প্রধান কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ পাঠক। কিন্তু যখন সচেতনতাও বিভ্রান্ত করে তখন আর বিশ্বাসের জায়গা থাকে না। মূল ধারার গণমাধ্যমও যখন বিদ্বেষমূলক খবর প্রচার করে, বিশেষ গোষ্ঠীর তৈলমর্দনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বা বিশেষ কোনো কারণে মূল সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকে তখন লেগুনা বা গণপরিবহনে রপ্ত হওয়া ‘বর্তমান গণমাধ্যম যে খবর প্রকাশ করে তার উল্টোটা বিশ্বাস করলেই সঠিক অবস্থা বোঝা যাবে।’ সূত্রে বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় থাকে না। – রনি রেজা

Leave a Reply

Your email address will not be published.