ফুল চাষিদের জন্য আসছে সুখবর

ফুল চাষিদের জন্য দেরিতে হলেও আসছে সুখবর। একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে বিয়ে পার্বণ, ভালোবাসা দিবস পর্যন্ত ফুল ছাড়া চলে না। কিন্তু একটু এদিক-ওদিক হলে অর্থাৎ সঠিক সময়ে বাজারে সরবরাহ করতে না পারলে ফুল চাষিরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর ২০১৫ সালের ২৪ মার্চে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে আলোচনার পরে কৃষি মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসে। সঠিক পদ্ধতিতে ফুল চাষ করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ক্ষতির হাত থেকে চাষিদের রক্ষা করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের। ২০২২ সালের জুনে যশোরের ঝিকরগাছায় হবে ফুল গবেষণা কেন্দ্র। এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সৌখিন মানুষ বাড়ির আঙিনা, টব বা বাগানে মনের খোরাক মেটানোর জন্য ফুলের চাষ শুরু করলেও ধীরে ধীরে তিন দশকের ব্যবধানে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক রুপ নেয়। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি, বসন্ত উৎসব, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস থেকে শুরু করে বিয়ে সব ক্ষেত্রে ফুলের ব্যবহার বেড়ে গেছে। দিন বদলের হাওয়ায় সৌখিন মানুষ একুশে ফেব্রুয়ারিসহ কয়েকটি উৎসবকে কেন্দ্র করে শুধু যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ফুল বাজারে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়ে থাকে। দিন দিন এ চাহিদা বাড়ছে।

যশোরে আশির দশকে এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বা ৯০ হাজার বিঘা জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার কৃষক ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১০ লাখের বেশি লোকের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ফুল চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফুলের পাইকারি বাজার বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। খুচরা বাজারে তা বেড়ে ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তুলনামূলক কম পুঁজি বিনিয়োগ খাত হওয়ায় ফুল চাষ একটি লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে। অনেক চাষি ঝুঁকছেন এ পেশায়। তাই ঝিকরগাছার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারিত হচ্ছে ফুলের বাণিজ্যিক চাষ।

বর্তমানে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, ঢাকার সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নাটোরসহ দেশের প্রায় ২০ জেলায় চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করছেন। এরফলে দেশে ব্যাপকভাবে ফুলের চাষও বেড়েছে। কিন্তু ফুলের উন্নত জাত, উৎপাদনের কলাকৌশল ও সংগ্রহের প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়েনি। সঠিক সংগ্রহ ব্যবস্থাপনার অভাবে ঋতুভেদে প্রায় ১০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত ফুল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ফুল চাষিদের কথা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোর জেলায় আরো বেশি করে ফুল চাষে উৎসাহ প্রদানের জন্য একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেন। তা আমলে নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় সচিবকে বলা হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ ফুল চাষ উন্নয়ন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাতেও গুরুত্ব দেয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এবং গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্য এক সভায় ফুলের ওপর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। তা আমলে নিয়ে যশোর জেলার ঝিকরগাছায় ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর সার্বিক উদ্দেশ্য হচ্ছে- ফুল গবেষণার মাধ্যমে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে ফুল ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদের উৎপাদন ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং ফুল জাতীয় পণ্যের সংগ্রহ ক্ষতি ১৫ শতাংশ কমানো। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে- একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুযোপযোগী ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা। যাতে সারা বছর ফুলের উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি গ্রিন হাউজ স্থাপন করা হবে। আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন গবেষণা মাঠ ও অন্য অবকাঠামো তৈরি করা হবে। ফুলের ১০টি উন্নত জাত ও ২০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও সুবিধাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রেনিং কমপ্লেক্স স্থাপন।

যেখানে গবেষণা, উৎপাদন, সম্প্রসারণ ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৩ হাজার ব্যক্তিকে প্রশিক্ষিত করা হবে। এসব কাজ শেষ করতে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তা যাচাই-বাছাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করায় সংশোধন করে কৃষিমন্ত্রণালয় থেকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে খুব শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ